সরকার বন্ধু, জনগণ শত্রু গোলাম মোর্তোজা

0
433
Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়া ডটকম। গত ৯ সেপ্টেম্বর চীনের সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ৪৫ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়ে। পামপোস্ট নামক ভারতীয় ভূ-খণ্ডে এসে ক্যাম্প তৈরি করে। ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বাহিনী পামপোস্ট এলাকায় যায়। জানতে চায় কেন তারা ভারতীয় সীমান্তে ঢুকেছে। তারপর চীনা বাহিনী এলাকা ছেড়ে চলে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর চীন-ভারত বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়।

১.
উপরেরের সংবাদটি কেন লিখলাম, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দিকে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে চাইছি।

বাংলাদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি যখন তুঙ্গে, আমাদের বেড়ে উঠা সেই সময়কালে। নানা রকমের গল্প শুনেছি। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের সব সম্পদ নিয়ে গেছে’। ‘ভারত কখনো বাংলাদেশের ভালো চায় না’- ইত্যাদি গল্প ছিল মানুষের মুখে মুখে। বোঝার বয়স থেকে দেখছি, গল্পগুলোর অধিকাংশই রং লাগানো। একটু সত্যের সঙ্গে, অনেকটা অসত্য জোড়া দিয়ে গল্পগুলো তৈরি করা হয়েছে।

১৯৭৫ সালের পরে সামরিক শাসকদের রাজনীতি করার জন্যে এমন ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করা সম্ভবত জরুরি ছিল। ভারত যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত বড়ভাবে সহায়তা করেছে, বঙ্গবন্ধুর অনুরোধের প্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী যে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিলেন, এসব গল্প তেমন একটা শোনা যেত না। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় সৈন্য ফিরিয়ে নেয়াটা যে ইতিহাসের কত বড় ঘটনা, তা সেভাবে আলোচনা হয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রকৃত সহায়তা, ভারতীয় সৈন্যদের আত্মদান, এক কোটিরও বেশি মানুষকে আশ্রয়দান, ইতিহাসের অনেক বড় ঘটনা। এই ঘটনাগুলো সেভাবে বাংলাদেশের শাসকরা মনে রাখেনি। জনগণ মনে রাখুক তাও চায়নি। তারা অনেকটা পাকিস্তানি মনোভাব নিয়ে দেশ চালিয়েছে। দেশের ভেতরে ভারত বিরোধী রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে। এই প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ কথা বলেছে।

যারা কথা বলেছে, তাদের মধ্যে আমরাও আছি। দুঃখিত যে নিজেদের কথা নিজেদের বলতে হচ্ছে। যখনই ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার প্রসঙ্গ এসেছে, হইচই করা হয়েছে ‘সার্বভৌমত্ব গেল’বলে। ট্রানজিট দেয়ার সঙ্গে যে সার্বভৌমত্ব যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই, এ কথা লিখেছি, টেলিভিশনে বলেছি।

ভারতের সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলোর বিদ্রোহীদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে, আমরা এর বিরোধিতা করেছি। শুধু আমাদের কারণেই নয়, বাংলাদেশের মানুষও বাস্তবতা বুঝতে পেরেছেন। শাসকদের ভারত বিরোধী রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ড ধরে ফেলেছেন। ফলশ্রুতিতে আস্তে আস্তে ভারত বিরোধী রাজনীতি গুরুত্ব হারিয়েছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের চাওয়া অনুযায়ী বাংলাদেশ সহায়তা করেছে। ভারতকে নানা নামে বাংলাদেশের উপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে ভারতের যা করার কথা, তার কতটা করেছে, কীভাবে করেছে- তা নিয়ে বড় আকারের প্রশ্ন নতুন করে তৈরি হয়েছে। যেমন-

ক. ভারত ট্রানজিট সুবিধা নিবে, কিন্তু ফি দিবে না। শুরুতে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রানজিট ফি এক্ষেত্রে পাবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষকে আমরাও বলেছিলাম, ট্রানজিটের বিনিময়ে যে ফি পাবে বাংলাদেশ, তা দিয়ে লাভবান হওয়া যাবে। বাস্তবে ভারত প্রথম দিকে ফি ছাড়া সুবিধা নিয়েছে। তারপর এখন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে টনপ্রতি ১৯২ টাকা।

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ফি নির্ধারণের যে কমিটি করেছিল, তাতে সর্বশেষে ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার টাকার কিছু বেশি। কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে, কোনো যুক্তি না দিয়ে, দেশের ভেতরে কোনো আলোচনা না করে ১৯২ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

খ. প্রশ্ন হলো ফি এত কম নির্ধারণ করার দায় তো ভারতের না। দায় বাংলাদেশের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ মনে করেন, বৃহৎ দেশ হিসেবে ভারতের উচিত ছিল বাংলাদেশের স্বার্থের দিকটি দেখা। যা ভারত দেখেনি। যেহেতু ভারতীয় সমর্থন নিয়েই বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে, ফলে ভারতের সঙ্গে দর কষাকষির মতো অবস্থানে সরকার নেই। ভারত এই সুযোগটি পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাচ্ছে।

গ. অবকাঠামো নির্মাণের জন্যে কঠিন শর্তে দেয়া ঋণের প্রতিশ্রুতিও ঠিক মত বাস্তবায়ন করেনি ভারত। তিস্তা চুক্তি করেনি।

ঘ. সীমান্তে প্রায় প্রতিদিন বিএসএফ গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করছে। যারা গরু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদেরকেই গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। ‘হত্যা করা হবে না’- রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও ভারত তা রাখছে না।

ঙ. এসব কারণে বাংলাদেশে নতুন করে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট তীব্র আকার ধারণ করছে। ভারত বিষয়ে মানুষের ক্ষুব্ধতা আলোচনায় প্রকাশ ঘটছে। যদিও গণমাধ্যমে তার তেমন একটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মানুষ মনে করছেন, যেহেতু বাংলাদেশ ছোট দেশ, আর্থিক-সামরিক কোনো দিক দিয়েই ভারতের সঙ্গে তুলনাই চলে না, সে কারণে বাংলাদেশকে ভারত গুরুত্বের মধ্যেই ধরছে না।

ভারতের ভাব এমন যে, বাংলাদেশের আবার মতামত কি, যা বলব তাই শুনবে। বাংলাদেশের মানুষ যখন চীন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, আর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক মিলিয়ে দেখে, তখন তার এই ধারণা আরও পোক্ত হয়।

২.
এবার আসি লেখার শুরুর সংবাদ প্রসঙ্গে। ঘটনাটির তাৎপর্য লক্ষণীয়। ভারতের ৪৫ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেছে চীন। ৪ দিন অবস্থান করেছে ক্যাম্প করে। ভারতীয় বাহিনী সেখানে গেছে। পতাকা বৈঠক করেছে। গুলি করেনি! কেন?

কারণ চীন শক্তিশালী দেশ। গুলি করলে পাল্টা গুলি খেতে হবে, তা ভারত খুব ভালো করেই জানে। ভারত একই আচরণ করছে কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তানের সঙ্গেও। ১৮ জন সৈনিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পরও পাকিস্তানে আক্রমণ করছে না। আর বাংলাদেশ সীমান্তে কী করছে?

পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। বাংলাদেশের বিজিবি সীমান্ত অতিক্রম করছে না, গুলি করার তো প্রশ্নই আসে না। সাধারণ দরিদ্র মানুষ সীমান্তে যায়, কখনো কখনো সীমান্ত অতিক্রম করে ব্যবসা বা চোরাচালানের কারণে। এই চোরাচালানের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ, বিজিবি, ভারতের মানুষ, বিএসএফ সবাই জড়িত। গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে শুধু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের।

বাংলাদেশের বিজিবির যদি পাল্টা গুলি করার ক্ষমতা থাকত, বিএসএফ কোনোদিন এভাবে গুলি করার সাহস করত না। যেভাবে সাহস করে না চীন, পাকিস্তান সীমান্তে। সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, নাগরিক হত্যার প্রতিবাদ করার সামর্থ্যও বাংলাদেশ সরকার হারিয়ে ফেলেছে।

৩.
ভারত বন্ধুত্ব করেছে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে নয়। জনগণকে শত্রুতে পরিণত করেছে। ফলে এখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দৃশ্যমান যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক, তা টেকসই নয়। এক ধরনের জবরদস্তিমূলক সম্পর্ক। আমরা চাই বহু কষ্টে অর্জিত বন্ধুতা দৃঢ় হোক। ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট এদেশে আবার তৈরি না হোক। বাংলাদেশের বর্তমান পদ্ধতির সরকারের কাছে এবিষয়ক কোনো প্রত্যাশা রেখে লাভ আছে বলে মনে হয় না। ভারত যদি বাংলাদেশের মানুষের সেন্টিমেন্ট বোঝে এবং গুরুত্ব দেয়, হয়ত পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে।

নেপাল সরকার ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারছে কেন? কারণ ভারত দীর্ঘ বছর ধরে নেপালিদের হৃদয়ে ক্ষুব্ধতা তৈরি করেছে। একই কারণে শ্রীলঙ্কানরা ক্ষুব্ধ ভারতের উপর। বাংলাদেশের মানুষের ভেতরেও সেই ক্ষুব্ধতাটা জমাট বাঁধছে। ভারত সরকার বা বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারছে না বা চাইছে না।

ভারতের গণমাধ্যম বা মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন, তারাও বিষয়টি নিয়ে সচেতন নয়। ভারত কর্তৃক সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম বা মানবাধিকার কর্মীদের তেমন একটা সোচ্চার হতে দেখা যায় না।

৪.
ভারতের যে গণতান্ত্রিক কাঠামো, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, তার উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ,তা একেবারেই মানানসই নয়।

গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
[email protected] com

শেয়ার করুন