গার্মেন্ট শিল্পে লোকসান চলছে

0
204
Print Friendly, PDF & Email

মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হওয়াতে সেই খরচ সামাল দিতে বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানার মালিকরা অন্য খাত থেকে অর্থ এনে যোগান দিচ্ছেন। ওদিকে উচ্চ মূল্যের কারণে অনেক ক্রেতা বেঁকে  
 বসছে। ফলে গত বছর রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ্যাপারেল চেইনগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য যে আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে তা করতে মালিকদের হাতে সামান্য অর্থই থাকছে। এমন দাবি গার্মেন্ট মালিকদের। কিছু ক্রেতা চেইনের দাবির প্রেক্ষিতে গত বছর ডিসেম্বরে শ্রমিকদের মজুরি শতকরা ৭৯ ভাগ বাড়িয়ে মাসে সর্বনিম্ন বেতন চাপিয়ে দেয় ৬৮ ডলার। এতে ওয়াল-মার্ট, জারা’র মতো স্টোরগুলোর জন্য যে পোশাক তৈরি হয় সেক্ষেত্রে উদীয়মান একটি বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টে বিক্রি কমে গেছে। ঢাকাভিত্তিক পোশাক তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান সিমসো গ্রুপের চেয়ারম্যান মুজাফ্‌ফর সিদ্দিকী বলেন, মজুরি বৃদ্ধির আগে তার নিট লাভ ছিল শতকরা ২ ভাগের সামান্য বেশি। এখন অর্ডার সরবরাহ দিতে গিয়ে তাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতি ৫টির মধ্যে চারটিতে এমন লোকসান হচ্ছে চীনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তৈরী পোশাক সরবরাহকারী এ দেশটির।
মুজাফফর বলেন, পশ্চিমা এক ক্রেতার কাছে আমি মূল্য বাড়ানোর প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। জবাবে সেই কোম্পানি বলেছে, এটা তোমাদের ব্যবসা। তোমাদেরকে এটা ম্যানেজ করতে হবে। এটা তোমরা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পার না। তবে মুজাফফর পশ্চিমা ওই ক্রেতা সংস্থার নাম প্রকাশ করেন নি। প্রায় এক বছর আগে ঢাকার সাভারে আট তলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা ধসে পড়ে। তাতে ১১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। তারপর থেকে বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি বৃদ্ধির হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসেছে। কিছু বায়ার এরই মধ্যে তাদের অর্ডার সরিয়ে নিয়েছে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশে। এর কারণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, উচ্চ বেতন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের ইতিহাসে যেসব ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি রানা প্লাজা ধস। এ ঘটনার পর পশ্চিমা কিছু ক্রেতা সংস্থা শ্রমিকদের উচ্চ বেতন ও তাদের উন্নততর মানদ- বজায় রাখার বিষয়ে তদবির করেছে। পাশাপাশি তারা বিনিয়োগকারীদের সচেতন করেছে যে, তাদেরকে এর জন্য মূল্য দিতে হবে কম লাভে করার মাধ্যমে। ঢাকার একটি গার্মেন্ট কারখানা ব্যাবিলন গ্রুপ। তারা বলছে, তারাও বিশ্বের বড় বড় খুচরা ক্রেতার জন্য পোশাক তৈরি করে। তবে এখন বাড়তি খরচ সামাল দিতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের। এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর ফলে ক্রেতাদের পোশাক তৈরি করতে গিয়ে তাদেরকে লোকসান দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি অর্ডারে এই কোম্পানিটি বিক্রয়মূল্যের শতকরা ২.৪২ ভাগ নিট লোকসান করেছে। এসব তথ্য রয়টার্সকে দেয়া তথ্যে পাওয়া গেছে। বেতন বৃদ্ধির আগে একই রকম অর্ডারে তাদের শতকরা ২.৬৯ ভাগ লাভ থাকতো। ইউরোপীয় দু’টি ভিন্ন খুচরা ক্রেতা রয়টার্সকে যেসব ডকুমেন্ট দিয়েছে তাতে অর্ডারের ক্ষেত্রে একই রকম পরিস্থিতি পাওয়া গেছে। ব্যাবিলনের পরিচালক এমদাদুল ইসলাম। ওই ক্রেতাদের নাম তিনি প্রকাশ করতে পারবেন না। কারণ, তার আশঙ্কা এতে তিনি কাজ হারাতে পারেন। এমদাদুল বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য যে প্রচেষ্টা তার ওপর প্রভাব ফেলবে বেতন বৃদ্ধির চাপ। তিনি বলেন, বিদেশী খুচরা ক্রেতারা তাদের অর্ডারের বিপরীতে খুব সামান্য বাড়তি অর্থ দিতে রাজি হয়েছে। এক্ষেত্রে যে হারে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে বর্ধিত বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে তা পর্যাপ্ত নয়। এমদাদুল বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে লভ্যাংশ প্রান্তিক পর্যায়ে হলেও পুনঃস্থাপনের পরিকল্পনা করছে ব্যাবিলন। তিনি বলেন, কর্মীদের উৎসাহিত করতে তারা বোনাস দেয়ার প্রস্তাব করছেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অলস বসে গল্পগুজব করে সময় নষ্ট না করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেছেন, তার কোম্পানি নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়। তাদের রয়েছে অগ্নিকা- পে্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। রানা প্লাজা ধসের পর বৈশ্বিক ক্রেতাদের তরফ থেকে তদন্তের যে দাবি ওঠে, সেই তদন্ত তার কোম্পানিতে হয়েছে। যদি তদন্তকারীরা কোন সমস্যা ধরতে পারে তাহলে ‘আমরা সে বিষয়টি মাথায় নিয়ে অবশ্যই তা সমাধানের চেষ্টা করবো’। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে বিনিয়োগ কাজ চলছিল। ঢাকা থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে অবস্থিত ইমপ্রেস গ্রুপ। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ঢালি। তিনি বলেন, প্রতি পিস কাপড়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্রেতারা ৫ থেকে ১০ সেন্ট করে বেশি অর্থ দিচ্ছে। বর্ধিত বেতন সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র অর্থ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্রেতা সংস্থাগুলোর নাম প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করেন। মোশাররফ বলেন, অব্যাহতভাবে লোকসান দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হলো উৎপাদন শতকরা ২০ ভাগ বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে তারাও শ্রমিকদের উৎসাহ বোনাস দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। যাতে শ্রমিকরা দ্রুততার সঙ্গে পোশাক তৈরি করেন।
২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এর পরই বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ক্রেতারা দল গঠন করে  নিরাপত্তার মানদ- বাড়াতে ও নিয়মিত কারখানাগুলো পরিদর্শনের আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এলায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি বলেছে, তাদের সদস্যরা বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য ১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ডলার ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে মাত্র তিনটি কারখানা কাগজপত্র চূড়ান্ত করেছে। এ সংস্থার ইন্ডিপেন্ডেন্ট চেয়ার ইলেন টশার ই-মেইল বার্তায় বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ঋণের জন্য আরও আবেদন আসবে বলে আমরা ধারণা করছি। এ সংস্থার বাংলাদেশভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ রবিন। তিনি বলেন, নির্বাচিত ৭২০টি কারখানার মধ্যে ৪০০টিতে তারা তদন্ত করেছেন। জুলাই মাসে এ বিষয়ে পর্যালোচনা সম্পন্ন হলে তবেই তহবিল ছাড়া হবে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর গঠন করা হয় দ্য বাংলাদেশ একর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি। তারাও যেসব কারখানার মান আধুনিকায়ন করার দরকার তাদের জন্য অনির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা করছে। রয়টার্সের এক প্রশ্নের জবাবে ই-মেইল মারফত এ সংস্থার মুখপাত্র জোরিস ওলডেনজিয়েল বলেছেন, নিরাপত্তার মানদ- যাতে মেনে চলতে পারে কারখানাগুলো সে জন্য অর্থনৈতিকভাবে উপযুক্ত করতে খুচরা ক্রেতারা সরবরাহকারীদের পর্যাপ্ত অর্থ দেবেন বলে তারা প্রত্যাশা করেন। সুইডেনে পোশাকের খুচরা ক্রেতা সংস্থা হেনেস অ্যান্ড মরিৎস। এটি সংক্ষেপে এইচ অ্যান্ড এম নামে বেশি পরিচিত। তারা গত ২৭শে মার্চ বলেছে, এশিয়ায় মজুরি বৃদ্ধির ফলে তাদের সামান্য লাভেও আঘাত হানবে। বৃটেনের সুপারমার্কেট অপারেটর সংস্থা টেসকো পিএলসি। বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে তারা পোশাকও বিক্রি করে থাকে। তারা রয়টার্সকে একটি বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে বর্ধিত বেতনের জন্য তারা তদবির করেছে এবং তারা সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখবে, যাতে এক্ষেত্রে সব ব্যবস্থা উন্নত হয়, এবং কর্মঘণ্টা কম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাপ ইনকরপোরেশন বলেছেন, তারাও বর্ধিত বেতনের জন্য চাপ দিয়েছে। তারা সরবরাহকারীদের চাপ দিয়েছে আইনগত সর্বনিম্ন বেতন নিশ্চিত করতে অথবা স্থানীয় কারখানার মানদ- অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে, যা অনেকটা বেশি।
বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রপ্তানি গত চার মাসে অনেকটা কমে গেছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এই কমে যাওয়া বেড়েছে শতকরা ৭.১ ভাগ। বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শহিদুল আজিম বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর পরই রপ্তানিতে অর্ডার দ্রুত পড়ে যেতে থাকে। এ বিষয়ে বেশকিছু গার্মেন্ট মালিকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে রয়টার্স। তারা বলেছেন, প্রতিপক্ষ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের কাছে তারা অর্ডার হারাচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরী পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তান। ফলে জানুয়ারি মাস থেকে তারাও অর্ডার লুফে নিচ্ছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কম মূল্য নির্ধারণের একটি চাপ রয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের ইতিহাসে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০১২ সালে ঢাকার বাইরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকা-ে অনেক শ্রমিক পুড়ে মারা গেছেন। ব্যাবিলন গ্রুপের এমদাদুল বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এ শিল্পে বিরাট এক ফারাক সৃষ্টি করে। যেমনটা হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর। এমদাদুল এ ব্যবসায় আছেন ২৭ বছর। এর মধ্যে প্রথমবার তিনি এক কাস্টমারের ফোনকল পেয়েছেন। ওই ফোনে তিনি অর্ডারের আকার কমিয়ে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেটি একটি ফরাসি কোম্পানি। তারা আগে ১ লাখ ৩০ হাজার শার্টের অর্ডার দিয়েছিল। সেই অর্ডার কমিয়ে তারা ৬০ হাজার শার্ট নিতে চায়। তবে ওই ক্রেতার নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান এমদাদুল। তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকা-ের পর বায়াররা অনেকটা সাবধানী হয়েছিলেন। কিন্তু রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এ খাতে ৯/১১’র মতো বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

শেয়ার করুন