এরশাদ-রওশন দ্বন্দ্ব

0
219
Print Friendly, PDF & Email

দশম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ এবং তার স্ত্রী ও পার্টির সংসদীয় দলের প্রধান বেগম রওশন এরশাদ। কে মনোনয়ন দেবেন, সেটির চেয়েও বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে দু’জনের পছন্দের ক্ষেত্রে। এরশাদ যেসব নারীকে এমপি হিসেবে মনোনয়ন দিতে চাচ্ছেন, তাদের বিষয়ে প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে রওশনের। ঘনিষ্ঠজনদের তিনি বলেছেন, এরশাদ যাদের এমপি করতে চাচ্ছেন-তাদের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক পরিচয়ের চেয়ে অন্য বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। আর এরশাদ বলছেন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নয়, এখানে দলের কর্তৃত্বের প্রশ্ন জড়িত।

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আজ সোমবার সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাত্কার নিতে যাচ্ছেন এরশাদ। তার বনানী কার্যালয়ে শুক্রবার থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ৮০টিরও বেশি ফরম বিক্রি হয়েছে। আজ সকাল ১১টায় তিনি তাদের সাক্ষাত্কার নেবেন। দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের ছাড়া আর কাউকে সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠানে ডাকেননি এরশাদ। জানা গেছে, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংখ্যার আনুপাতিক হারে ৫ থেকে ৬টি সংরক্ষিত আসন পাবে জাপা।

এরশাদের মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও প্রার্থীদের সাক্ষাত্কার গ্রহণের ব্যাপারে সায় নেই রওশন ও তার সঙ্গে থাকা জাপার এমপি-মন্ত্রীদের। দলের ৩৪ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে এরশাদ ছাড়া বাকি সবাই রওশনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। আর রুহুল আমিন হাওলাদার সব পক্ষের সঙ্গেই মিল-মিশ রাখছেন। সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে রওশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জাপার তিনজন এমপি বলেন, ‘এরশাদ সাহেব দলের চেয়ারম্যান। তার আদেশ-নির্দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে। কিন্তু সংসদীয় দলের প্রধান রওশন এরশাদ। সেজন্য সংসদের যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন রওশন এবং দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপিরা। সুতরাং সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও রওশনসহ দলের এমপিদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।’

এই এমপিরা জানান, প্রার্থীদের সাক্ষাত্কার নেয়ার পর এরশাদ কোনো তালিকা তৈরি করলে, তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেটিও পর্যালোচনা করবে সংসদীয় দল। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা দ্বন্দ্ব কাটাতে ভোটাভুটি করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। যারা মনোনয়ন পেতে আগ্রহী হবেন, দলীয় এমপিদের ভোটাভুটিতে তাদের মনোনীত করা হবে। এর ফলে কারও একক কর্তৃত্ব কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকবে না।

জানা গেছে, এরশাদ গতকাল রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তার বনানী কার্যালয়ে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। এসময় তার সঙ্গে দেখা করেছেন জিএম কাদের, রুহুল আমিন হাওলাদার, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফকির আশরাফ ও গোলাম হাবিব দুলালসহ কয়েকজন। সূত্রমতে, গতকাল দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এরশাদ বলেছেন ‘আমি দলের চেয়ারম্যান। দলের এমপিদের মনোনয়ন আমি দিয়েছি। মহিলাদের মনোনয়নও আমি দেবো। এখানে তো অন্য কারও ক্ষমতা নেই। এটা পার্টির ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলা)। যদি আমি মনোনয়ন দিতে না পারি, তাহলে চেয়ারম্যান হিসেবে আমারতো কোনো ক্ষমতাই থাকলো না।’

সূত্রমতে, সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি মনোনয়নের জন্য এরশাদ ছয়জনের একটি তালিকা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- গাইবান্ধার একজন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের একজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাড়ি-দলের এমন এক নেতার স্ত্রী, জাতীয় মহিলা পার্টির এক শীর্ষ নেত্রী এবং এরশাদের পরিবারের একজন। এই তালিকা বাহকের মাধ্যমে রওশনের কাছেও পাঠিয়েছেন এরশাদ। তবে তাদের মধ্যে তিনজনের বিষয়ে রওশন প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, এমনকি তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এরশাদের সঙ্গে দৃশ্যমান মুখোমুখি অবস্থান নিলেও তা মেনে নিতে রাজি নন রওশন। গতকাল দলীয় এমপিদের নিয়ে জাপার সংসদীয় দলের পক্ষে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক প্রদান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘ওনার (এরশাদ) সঙ্গে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা সবাই জাতীয় পার্টি করি। সব বিষয়ে আমরা সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নেবো।’

৩৪ জন এমপির মধ্যে বিরোধী দলীয় নেতা রওশনের নেতৃত্বে ২৭ জন ফুল দিতে সাভারে গেছেন। এরশাদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার সেখানে যাননি। তাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে রওশন বলেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যান ও মহাসচিব অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেননি।’ তবে এরশাদের সঙ্গে থাকা জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অভিনেতা মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এমপি হিসেবে এরশাদ ও মহাসচিবেরও যাওয়ার কথা। কেন যাননি তা আমাদের কাছেও রহস্যের।’ সূত্রমতে, সাভারে যাওয়ার বিষয়ে এরশাদ ও মহাসচিবকে জানানোও হয়নি। প্রসঙ্গত, গত ১৫ জানুয়ারি স্মৃতিসৌধে যেতে চেয়েছিল জাপার সংসদীয় দল। এরশাদ নিষেধ করায় সেদিন তারা যাননি।

বিভিন্ন ইস্যুতে এরশাদের সঙ্গে রওশনপন্থীদের চলমান মতবিরোধের বিষয়ে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার গতকাল বলেন ‘যে যাই বলুক, চূড়ান্তভাবে জাপা ঐক্যবদ্ধ। আমরা সবাই মিলে-মিশেই কাজ করছি এবং সামনের দিনগুলোতেও করে যাবো। পার্টিকে সুসংহত রাখার ক্ষেত্রে আমরা সক্ষম হবো। কারণ অতীতে নানা ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা করে আমরা টিকে থেকেছি। সংসদ নির্বাচনের মতো একটি বিরাট ইস্যুতে জাপার মতো দলে বহু মত, বহু পথ থাকতেই পারে। ইতোমধ্যে সকল দ্বন্দ্ব, দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি ও মতপার্থক্যের অবসান ঘটেছে। মাঝখানে যে সীমারেখা ছিল তা এখন মিলে-মিশে একাকার। ভবিষ্যতেও এরকম কলহ দ্বন্দ্ব ম্লান হয়ে যাবে ঐক্যের কাছে।’

শেয়ার করুন