ডিসেম্বরজুড়ে ঘেরাও অবরোধ

0
50
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে গতকাল ১৮ দলের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : নয়া দিগন্ত
আগামীকাল রোববার থেকে সারা দেশে আবার টানা ৭২ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। আগামীকাল রোববার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এই হরতাল চলবে। গতকাল বিকেলে জোটের মহাসচিবপর্যায়ে বৈঠকের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচি ঘোষণার আগে ১৮ দলের মহাসচিবদের নিয়ে আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন মির্জা ফখরুল। জানা গেছে, বৈঠকের প্রায় পুরো সময়ই আন্দোলনের কৌশল নিয়ে শীর্ষনেতারা কথা বলেছেন। তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে তিন দিন বা তার চেয়ে বেশি হরতাল চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তারা মত দিয়েছেন। আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সাথে সমঝোতা ছাড়াই তফসিল ঘোষণা হলে সাথে সাথেই শুরু হবে ঘেরাও-অবরোধ। জানা গেছে, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। এই তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই থাকবে কর্মসূচি। এই সময়ে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও ও সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেয়ার পাশাপাশি সপ্তাহজুড়ে হরতাল ও অসহযোগের ডাক দেয়া হবে। সমঝোতা না হলে শেষ ধাপের কর্মসূচি হিসেবে নির্বাচনের ১৫ দিন আগে থেকে চলবে টানা অবরোধ এবং এর পরে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে কর্মসূচি দেয়া হবে। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, শেষ ধাপের কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘নির্বাচন প্রতিহত’ করা। এ লক্ষ্যে সারা দেশে সংগ্রাম কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ’৯৬ সালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংযোজন করার আগে আওয়ামী লীগ যেসব কর্মসূচি দিয়েছিল, বিএনপির হাইকমান্ডও ঠিক একই পথে এগোবে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে আলোচনা করে এ নিয়ে ইতোমধ্যে পুরো আন্দোলন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতা আলাপকালে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, একতরফা নির্বাচন হলে ৭০ ভাগ জায়গায় আওয়ামী লীগ সফল হতে পারবে না। এসব জায়গায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ হবে। সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে না। পর্যবেক্ষকেরা তো অবস্থা দেখেই সটকে পড়বে। ‘সরকার সমঝোতা চায় না’ : গতকাল গুলশান কার্যালয়ে তিন দিনের হরতালের ঘোষণা দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ইতোমধ্যে আমরা দুই দফায় হরতাল করেছি। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাড়া দেয়নি। সে জন্য বাধ্য হয়ে আমরা আবার কঠোর কর্মসূচি দিয়েছি। মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন সরকার সমঝোতা চায় না বলে তথাকথিত সর্বদলীয় সরকার গঠনের নামে একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তিনি বলেন, সরকার মুখে সমঝোতার কথা বললেও সংলাপে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। আমরা তাদের বলব, এখনো সময় আছেÑ সমঝোতার পথে আসুন। হরতাল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে উল্লেøখ করে তিনি বলেন, এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। ফখরুল জানান, সরকার রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ-মানববন্ধন করার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। ফলে কঠোর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর নেই। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি। জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়নি। এর নিবন্ধন বাতিল করেছে আদালত। এর বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করবে তারা। তবে এ বিষয়টির এখানে জবাব দেয়ার বিষয় নয়। ১৮ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী কর্মপরিষদের সদস্য ডা: রেদোয়ান উল্লাহ শাহেদী, মহাসচিবদের মধ্যে এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, খেলাফত মজলিসের অধ্যাপক আহমেদ আবদুল কাদের, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, এনডিপির আলমগীর মজুমদার, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ইসলামিক পার্টির আবদুর রশীদ প্রধান, কল্যাণ পার্টির আবদুল মালেক চৌধুরী, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, লেবার পার্টির হামদুল্লাহ আল মেহেদি, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবদের মধ্যে জমিয়তে উলামা ইসলামের মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরী, ন্যাপ ভাসানীর হাসরাত খান ভাসানী, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিদের মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি মুহাম্মদ তৈয়ব, ডিএলের খোকন চন্দ্র দাশ ও বিজেপির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সালাহউদ্দিন মতিন উপস্থিত ছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে চায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। তবে তা মানতে নারাজ আওয়ামী লীগের প্রস্তাব নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার। নির্বাচনের কয়েক মাস আগেও দুই পরে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মহলের তাগিদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ২৬ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে আলোচনার আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হরতালের মধ্যে সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে অসম্মতি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন, হরতাল শেষে আলোচনা করতে তিনি রাজি। এরপর দুই প নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পরস্পরকে বলে আসছেন। এর মধ্যে বিরোধী দল নতুন করে হরতালের ডাক দিলে সরকারের প থেকে বলা হয়, সংলাপ চাইলে আর কখনো হরতাল না করার ঘোষণা দিতে হবে। এর বিপরীতে বিরোধী দলের প থেকে আলোচনার দ্বার খোলা রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী নেতারা মহাসচিবপর্যায়ে বৈঠকের একটি প্রস্তাব নিয়ে দুই নেত্রীর সাথে দেখা করেন। দুই নেত্রীই বলেছেন, সংলাপের দরজা খোলা। কিন্তু সমঝোতার সেই চেষ্টা এখনো সফলতার মুখ দেখেনি। সংলাপ না হওয়ার জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করলেও প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার আমন্ত্রণ বহাল আছে, তিনি চাইলেই গণভবন যেতে পারেন। অন্য দিকে সংলাপে সরকারের সদিচ্ছা নেই বলে অভিযোগ খালেদা জিয়ারও। আলোচনায় রাজি আছেন জানিয়ে তিনি বৃহস্পতিবারও বলেন, তাদের আন্দোলন চলবে। হরতালের আওতামুক্ত : মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের সব রকমের যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি, খাবার ও ওষুধের দোকান হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।

শেয়ার করুন