বন্ধ রয়েছে কাফকো : গুণতে হচ্ছে শতকোটি টাকা

0
62
Print Friendly, PDF & Email

এফএনএস, এফআই মাসুদ : গত ৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত শতভাগ রফতানিমুখী বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো)। গ্যাস সরবরাহ বন্ধের পরপরই বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম। কাফকোর উৎপাদন কার্যক্রম ২০১২ সালে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল। এ বছরের প্রায় সময় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদনপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকার ফলে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। যার ফলে গুনতে হচ্ছে শতকোটি টাকার লোকসান।

চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক-কর্মচারী নেতারা বলেন, ‘কাফকো সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৯৫ মার্কিন ডলার গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করছে যা দেশের অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। গ্যাসের এ দর নিয়ে মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে।’ তারা আরো বলেন, কাফকোতে ২৮৩ জন কর্মকর্তা এবং ৩৪৩ জন শ্রমিকসহ প্রায় এক হাজার দু’শ জন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত আছে।

কাফকোর করপোরেট প্লানিং শাখার ডিজিএম কামাল উদ্দিন জানান, চলতি বছরের ৪ এপ্রিল থেকে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ফলে কারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়াও বন্ধ। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি জানান, কাফকোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার মেট্রিকটন ইউরিয়া। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। উৎপাদনের উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ভার বহনের দায়বদ্ধতা।

সূত্র জনায়, গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ফলে ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাফকোর উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল প্রায় ২৩৬ দিন। বন্ধ থাকার ফলে কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪ লক্ষ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হারায়। এর ফলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয় কোম্পানিটি। পক্ষান্তরে গ্যাস বিল, রাজস্ব ও লভ্যাংশ  বাবদ সরকার হারায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। কাফকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘ দিন উৎপাদনপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকার ফলে চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। অতি দ্রুত সময়ে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা না হলে আরো বেশি লোকসান গুনতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে কাফকোর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, আমরা বেসরকারি কোম্পানির চাকরিজীবী। সরকারকে অতি জোর দিয়ে কিছু বলার ক্ষমতাও আমাদের নেই। তিনি জানান, সরকারের উচিত দ্রুত সময়ে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করে সঙ্কট নিরসন করা।

এর আগে ২০১২ সালে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কারণে প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল কাফকোর উৎপাদন কার্যক্রম। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় কারখানার কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ নষ্টের সম্মুখীন হলে ঐ বছর ৪ জুন সংবাদ সম্মেলন করে কর্তৃপক্ষ। পরে ২০১২ সালের ১১ আগস্ট কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ করে সরকার। ঐ বছরই প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানার ওভারহাউলিং (যান্ত্রিক সংস্কার) করতে হয়েছিল। কাফকোর চিফ অপারেশন অফিসার শফি আহমেদ জানান, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহের কোনো ইঙ্গিত আমরা আপাতত দেখছি না। তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ফলে আমরা প্রতিদিন ২ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের ক্ষমতা হারাচ্ছি।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ, জাপান, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ বিনিয়োগে চট্টগ্রামের আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় গড়ে উঠে ইউরিয়া সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো)। ১৯৯৫ সালে  বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। কারখানার বেশির ভাগ শেয়ার বাংলাদেশ সরকারের। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সব ঋণ পরিশোধ করে ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এর উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ২ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া।  সর্বোচ্চ উৎপাদনে রেকর্ড হয় ইউরিয়া ২১৩২ মেট্রিক টন এবং এমোনিয়া ১৬৫৪ মেট্রিক টন। কারখানার ডিজাইন সক্ষমতার চেয়ে ২৪ ও ১০ শতাংশ বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গ্যাস বিল, রাজস্ব ও লভ্যাংশ বাবদ ৯৫৩৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে সরকারকে। এছাড়া দেশে সার উৎপাদনের ফলে বিদেশ থেকে সার আমদানির পরিবহন খরচ বাবদ সরকারের সাশ্রয় হয়েছে আরো ৯৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার।
এছাড়া গত ৮ বছরে কাফকো ৪৮ লাখ ৪৭ হাজার ৩১২ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করেছে। যার মধ্যে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার  মেট্রিক টন ইউরিয়া সরকারের কাছে বিক্রি করেছে। সরকার এই সার বিসিআইসির মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে বণ্টন করছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা হয় ১৫লাখ ৪১ হাজার ১৭৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া।

বিদ্যুৎ সংকট ও ফসলি মওসুমের নানা অজুহাতে বিভিন্ন সময় কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকাসহ নানান প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাফকো পরিচিত। দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। কবে নাগাদ কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ করা হবে তা নির্দিষ্ট করে কেউই বলতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামী মাস দুয়েকের মধ্যে কাফকোতে গ্যাস সরবরাহের কোনো সম্ভাবনা নেই। যোগাযোগ করা হলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেসিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জামিল আহমেদ জানান, কাফকোতে আপাতত গ্যাস সরবরাহ করা হবে না। তিনি জানান, এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ উন্নয়নের দিকে আমাদেরকে নজর দিতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ সংকট কেটে গেলে দ্রুত সময়ে কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

পেট্রো বাংলার চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ হোসেন মনসুর জানিয়েছেন, জ্বালানি উপদেষ্টার নির্দেশে কাফকোতে  গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের প্রস্তুতি এ মুহূর্তে আমাদের সামর্থ্যে নেই। তবে এ ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করে কাফকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিইও) সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধের ফলে ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে আমাদেরকে।

কাফকোর জিএম (প্রশাসন) জাওয়াদুল হক জানান, গ্যাসের অভাবে কাফকোর সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা মাফিক নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন অনেকাংশে কমে গেছে। বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আশা করি শীঘ্রই কাফকো চালু করা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন