ক্ষমতায় যেতে চীনকে কাজে লাগাতে চান খালেদা

0
53
Print Friendly, PDF & Email

ক্ষমতায় যেতে চীনকে কাজে লাগাতে চান বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের এই উত্তাপ পরিস্থিতিতে দেশটি কাজে লাগাতে মরিয়া এখন বিএনপি। খালেদা জিয়ার এই থিওরী চলমান রাজনীতিতে কতোটুকু প্রভাব পড়বে তা নিয়েও শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন বাংলাদেশের অভ্যান্তরীণ রাজনীতি নিয়ে হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন। অতীত ইতিহাসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে দেশটির নিরবতা লক্ষ্য করা গেলেও হঠাৎ করেই নি:শব্দে মাঠে নেমে স্টাইকার হতে চাইছেন নতুন এই প্লেয়ার। এ রাষ্ট্রদূতের আমলেই ঢাকার চীনা দূতাবাস এই প্রথম একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে যেখানে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে চীনা আগ্রহ সরাসরি ও নির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ‘দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে’ চীনের অভিষেককে সন্তুষ্টির সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। গত ৯ই অক্টোবর ঢাকার চীনা দূতাবাস ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের রণকৌশলগত বিশেষজ্ঞরা সবসময় বিশ্বাস করে আসছেন, ভারত ও চীনের ঐতিহ্যগত স্নায়ুপীড়নের মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশ সন্নিহিত ‘চিকেন নেক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত ও যুক্তরাষ্টের তরফে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের বিষয়টিকেও বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। যদিও বাংলাদেশের দুই প্রধান দলই চীনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। এর প্রমানও পাওয়া যায় সাম্প্রিতক সময়ে দুই দলের চীনা প্রীতি দেখে। গত মাসে সাম্যবাদী দল আয়োজিত এক চীনা অনুষ্ঠানে তিন মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন এবং দিলীপ বড়ুয়া বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে দৃঢ়তা কামনা করে বক্তব্য রাখেন।
সম্প্রতি সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. মাহবুবুর রহমান অবশ্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমরাস্ত্র কিনেছেন। এসব অস্ত্র চীনের কাছ থেকে আরও কম দামে কেনা যেতো। চীন এ ঘটনাকে সুনজরে দেখতে পারে না বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
নানা কারণেই বাংলাদেশে চীনের ভূমিকার দিকে এখন অনেকেই নজর রাখতে শুরু করেছেন। তারা বাংলাদেশ রাজনীতি এতকাল সতর্কতার সঙ্গে হ্যান্ডেল করছিল। দুই নেত্রীকে তারা সবসময় হিসাব করেই নিমন্ত্রণ জানিয়েছে বেইজিংয়ে। তবে হঠাৎ করে দেওয়া চীনা রাষ্ট্রদূতের বিবৃতি চলে গেছে বিএনপির অনুকূলে। এর প্রমানও মিলেছে রাষ্ট্রদূতের কথায়।
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেছেন, সাম্প্রতিককালে বিএনপি তার কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করছে বলে তাঁর নজরে এসেছে। তিনি বলেন, ২৫শে অক্টোবরের পরে বিএনপি বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে যাবে বলেই আমি ধারণা করি। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণ হবে। বিএনপি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি সামাজিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশের জাতীয় ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।’ আর সমঝোতা সম্পর্কে বলেন, চীন আশা করে, উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছার মনোভাব নিয়ে চলবে। কারণ, আসন্ন নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও ন্যায্য হয় সে বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
এখন ভারতের আওয়ামী লীগ প্রীতির ধোয়া তুলে চীনের এই আনুকূল্য কাজে লাগাতে চান খালেদা জিয়া। তাদের দিয়ে আর্ন্তজাতিক লবিং এ জয়ী হতে তাই কাজ শুরু করেছেন বিএনপিপন্থী লবিষ্টরা। বিগত সংকটগুলোতে বিদেশী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আরো অনুপ্রাণিত করছে বিএনপিকে।
দলের একজন শীর্ষ নেতা ডিনিউজকে বলেছেন, দেশীয় রাজনীতিতে বিদেশী কূটনীতি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন ঘটনা নয়। নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে কমবেশি টানাপড়েন বাংলাদেশ রাজনীতিতে গা সওয়া ঘটনা।  ‘টুয়েসডে গ্রুপ’ তো বহুল আলোচিত। ঈশান কোণে মেঘ জমলেই হলো। টুয়েসডে গ্রুপ সক্রিয় হতো। এখন আর এটা সেভাবে নেই। তবে এটা ছিল বস্তুত পশ্চিমা কূটনীতিকদেরই একটি সম্মিলনী। সরকার পরিবর্তন কেন্দ্রিক অঘটন কিংবা ডামাডোল একটা কিছু হলেই হলো। সবার আগে যে নামটি ভেসে আসে সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। স্নায়ুযুদ্ধকালে বৃটেন আর আমেরিকা ছিল সমার্থক। এরপর বৃটেন আড়ালে চলে যায়। তার পরিবর্তে আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে এক-এগারোতে ইউএনডিপি জোরালো ভূমিকা রাখে। স্বাভাবিক কারণৈই শক্তিধর দেশ হিসেবে বিএনপি চীনের উপর ডিপেন্ট করতেই পারে।
এই নেতা বলেন, ম্যাডাম ২০১২ সালের চীন সফরে দেশটির নেতাদের কথা দিয়েছিলেন বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে সার্বিক উন্নয়নে জোর দেবে। তাছাড়া বিএনপি মনে করে চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্ক ভালো নয়। সরকারের নানা কর্মকান্ডে চীন ‘অসন্তুষ্ট’।
কেন এমন মনে করছে বিএনপি- এর ব্যাখা করে বিএনপির ঐ নেতা বলেন, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন। চট্টগ্রাম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন কারিগরি সহায়তা দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও এখন পর্যন্ত তা প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। একইভাবে বিএনপি আমলে চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগের কার্যক্রম শুরু হলেও এখন তা স্থগিত হয়ে আছে। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় থিয়াওউ দ্বীপ নিয়ে জাপানের সঙ্গে যে বিরোধ চলছে তাতে বাংলাদেশের সমর্থন চেয়েছে চীন। সরকার এ বিষয়েও নীরব রয়েছে। সরকারের সঙ্গে চীনের এ ‘শীতল’ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া তাদের সঙ্গে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তিনি জানান, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরই বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কূটনীতিক সম্পর্কের উন্নতি শুরু হয়। এ কারণে চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক। পুরোনো সম্পর্কের ভিত্তিতে খালেদা জিয়া ভবিষ্যতে চীনকে বাংলাদেশের আরো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে প্রত্যাশা করেন। আর খালেদা জিয়ার এই প্রত্যাশাকেও আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে দেশটি।

শেয়ার করুন