ঈদে বাড়ি ফেরা : দ্বিতীয় দিনেও বাস-ট্রেনের টিকিটের জন্য হাহাকার : আজ শুরু লঞ্চের : বিক্রি শুরুর আগেই লঞ্চের কেবিনের টিকিট নেই

0
116
Print Friendly, PDF & Email

কলেজপড়ুয়া ছাত্র রাকিব হোসেন থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডিতে। বাবা-মাসহ চার সদস্যের ফ্যামিলি নিয়ে দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ঈদ করবেন। নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরার জন্য আগামী ৫ আগস্টের ট্রেনের টিকিট কাটতে কমলাপুর এসেছেন শুক্রবার ভোট ৪টায়। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার পর অবশেষে টিকিট পেয়ে তিনি মহা খুশি। রাকিবের ভাগ্যে টিকিট জুটলেও দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পেয়ে গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে অনেককেই।
শুধু কমলাপুর রেলস্টেশনেই নয়, অগ্রিম টিকিট বিক্রির দ্বিতীয় দিনেও গতকাল বাসের আগাম টিকিটের জন্য হাহাকার দেখা গেছে গাবতলী, শ্যামলী, কল্যাণপুরসহ আশপাশের টিকিট কাউন্টারগুলোতে। টিকিট পাওয়া ও না পাওয়া অধিকাংশ যাত্রীদের মাঝেই অভিযোগের শেষ নেই। কারো অভিযোগ বাসের টিকিটের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়া হচ্ছে। ট্রেনের টিকিটের ২৫ ভাগ ই-টিকেটিং পদ্ধতির অধিকাংশই বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে। কিছু সুবিধাভোগী দালাল জালিয়াতি করে ই-টিকেটিংয়ের অতিরিক্ত টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো কালোবাজারে বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলের এক ধরনের কর্মচারীরা এসব কালোবাজারিদের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন বাস সার্ভিসের প্রতিটি পরিবহনের যেসব এসি বাস সার্ভিস রয়েছে, সেগুলোর টিকিট সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে না। পরিবহন মালিকরা এসব টিকিট বিক্রি না করে রেখে দিচ্ছেন তাদের পরিচিত ও প্রভাবশালীদের জন্য।
এদিকে আজ রোববার থেকে লঞ্চের টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিটি লঞ্চের কেবিন এরই মধ্যে রিজার্ভ হয়ে গেছে। লঞ্চ মালিকদের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চেনা-জানা ও প্রভাবশালীরা এসব টিকিট রেখে দেয়ায় অধিকাংশ সময়ে ঘোষণা দিয়েও লঞ্চের আগাম টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয় না। আজ রোববার থেকে ঈদের আগাম টিকিট বিক্রির কথা থাকলেও গত শুক্রবার থেকেই মালিকদের পরিচিতদের কাছে আগাম টিকিট বিক্রি করা হয়েছে।
ঈদুল ফিতরের ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত শুক্রবার থেকে বাস-ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। বিক্রির প্রথম দিনেই আগের ভোররাত থেকে টিকেট কাউন্টারগুলোতে অপেক্ষা করতে থাকে টিকিটপ্রত্যাশীরা। রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর, শ্যামলীতে দূরপাল্লার পরিবহনের অধিকাংশ টিকিট কাউন্টারগুলোর কর্মচারীরা তাদের টিকিট কাউন্টারে প্রবেশ করার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই টিকিটপ্রত্যাশীরা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকিটের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আগাম টিকিট বিক্রির দ্বিতীয় দিন গতকালও একই চিত্র দেখা গেছে। যেসব যাত্রী অনেক চেষ্টার পর টিকিট পেলেও তাদের অভিযোগ, টিকিটের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে তাদের কাছ থেকে। আবার কিছু টিকিট বিক্রির পর টিকিট ফুরিয়ে গেছে বলে যাত্রীদের বলা হচ্ছে। অনেক টিকিট কালোবাজারে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
অনেকে বলছেন, টিকিটের গায়ে লেখা রয়েছে নির্ধারিত মূল্য, তার পরও অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। বগুড়ার এক যাত্রী জানান, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে বগুড়া পর্যন্ত নন-এসি বাসে ভাড়া নেয়া হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। কিন্তু অগ্রিম টিকিট বাবদ এখন নেয়া হচ্ছে ৪০০ টাকা। তবে টিকিটের গায়ে ৩৫০ টাকা লেখা রয়েছে।
অন্যদিকে বাস সার্ভিসের প্রতিটি পরিবহনের কম-বেশি সাত-আটটি করে এসি বাস রয়েছে। অনেক এসি বাসের টিকিটপ্রত্যাশীরা দীর্ঘ অপেক্ষার পরও টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন কাউন্টার থেকে। তাদের অভিযোগ, এসি বাসের টিকিট চাইলে বলা হচ্ছে, টিকিট নেই, ফুরিয়ে গেছে। যাত্রীদের এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, বাস-ট্রাক ওনার অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে। বাস-ট্রাক ওনার অ্যাসোসিয়েশন কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন গতকাল আমার দেশকে জানান, প্রতিটি পরিবহনের সাত-আটটি করে এসি বাস থাকলেও পরিবহন মালিকদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছে এগুলো ১০-১২ দিন আগেই বিক্রি করে দেয়। এজন্য এসি বাসের টিকিট সাধারণ যাত্রীরা পায় না।
এদিকে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে গতকাল দ্বিতীয় দিনে প্রথম দিনের চেয়ে ভিড় আরও বেশি লক্ষ করা গেছে। গতকাল বিক্রি করা হয়েছে আগামী ৫ আগস্টের ট্রেনের আগাম টিকিট। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনে টিকিট বিক্রি শুরু হলেও টিকিটের জন্য স্টেশনে রাত্রিযাপনও করেছেন অনেক টিকিটপ্রত্যাশী।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ঈদ উপলক্ষে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ২৮টি আন্তঃনগর ট্রেনে প্রায় ১৫ হাজার আসনসহ আগাম টিকিট বিক্রি করা হবে। যাত্রীদের অনুরোধে ট্রেন ছাড়ার দিন আসনবিহীন টিকিটও বিক্রি করবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, প্রথম দিন কিছুটা কম বিক্রি হলেও দু-একটি ট্রেনের টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে। তবে যারা টিকিট পায়নি কিংবা যেসব ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়নি, তা আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলতি কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে।
এর আগে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আবু তাহের জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি টিকিট দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে সংযোগ করা হবে অতিরিক্ত বগি। এ জন্য সাত জোড়া স্পেশাল ট্রেনসহ ১৩৫টি আন্তঃনগর ট্রেনের বগি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এবার ট্রেনের টিকিটের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও কালোবাজারি চক্রের দৌরাত্ম্য কমেনি। বিভিন্ন উপায়ে টিকিট সংগ্রহ করছে তারা। বিশেষ করে ঈদের আগের দু-তিন দিনের সিঙ্গেল টিকিট মজুত করছে তারা। ই-টিকেটিং পদ্ধতিতে সহজেই টিকিট পাচ্ছে দালাল চক্র। মোট টিকিটের ২৫ ভাগই ই-টিকিট পদ্ধতিতে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু সুবিধাভোগী দালাল জালিয়াতি করে ই-টিকেটিংয়ের অতিরিক্ত টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো কালোবাজারে বিক্রি করছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলের এক ধরনের কর্মচারীরা এসব কালোবাজারিদের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার খায়রুল বশীর জানান, টিকিট বিক্রিতে কোনো কালোবাজারি হচ্ছে না। কালোবাজারি বন্ধে কাউন্টারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, র্যাব-পুলিশের অবস্থান রয়েছে। তবে দুপুরের পরে অগ্রিম টিকিট বিক্রি না করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হয়তোবা টিকিট শেষ হয়ে গেছে, তাই বিক্রি করা হচ্ছে না। তাছাড়া নির্ধারিত দিনের এক দিন আগ পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করা হবে বলেও তিনি জানান।
এদিকে আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে নৌপথের লঞ্চের যাত্রীদের ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি। তবে আজ থেকে ঘোষণা দিয়ে টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই প্রতিটি লঞ্চের কেবিন এরই মধ্যে রিজার্ভ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চেনা-জানা ও প্রভাবশালীরা এসব টিকিট নিয়ে রেখেছেন। তাই ঘোষণা দিয়ে অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয় না। তবে গত শুক্রবার পরিচিতদের কাছে সীমিতসংখ্যক লঞ্চের কিছু আগাম টিকিট বিক্রি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৬ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ঈদ স্পেশাল লঞ্চ চলবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি লঞ্চ মালিকরা এ সেবা দেবেন। ঈদের পর বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ঢাকায় পৌঁছতে ১৩ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত স্পেশাল লঞ্চের সার্ভিস বহাল থাকবে।
আজ বাস মালিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক : এদিকে ঈদ উপলক্ষে সড়কগুলোতে নির্বিঘ্নে যানবাহন চলাচল করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, পুলিশসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি-হয়রানি বন্ধ, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাস-ট্রাক ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাস-ট্রাক ওনার অ্যাসোসিয়েশন কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন গতকাল আমার দেশকে জানান, বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিবহনগুলোকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার অনুরোধ জানানো হবে।

শেয়ার করুন