নির্বাচন ও আন্দোলনের বার্তা দেবে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ আজ

0
79
Print Friendly, PDF & Email

প্রায় এক বছর পর আজ রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি। গতকাল শনিবার দুপুরে ২২ শর্তে এই সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সমাবেশের মধ্য দিয়ে আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি সব মহলকে সুনির্দিষ্ট বার্তা দিতে চাইছে বিএনপি। এ ছাড়া আজকের সমাবেশ থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে। লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত করে আগামী দিনের ‘দাবি ও লক্ষ্য’ উত্থাপন করবে দলটি।

একই জায়গায় ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর বিএনপির সর্বশেষ সমাবেশ হয়েছিল।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সমাবেশ থেকে যে বার্তা দেওয়া হবে, নির্বাচনের আগে তা ভিন্নমাত্রা পাবে। বিএনপির এ সমাবেশের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর বাড়তি মনোযোগ থাকবে। এ সমাবেশে সরকারের প্রতি দাবি যেমন থাকবে, তেমনি জাতীয় ঐক্যে আগ্রহী দলগুলোর কাছেও বার্তা থাকবে। ফলে নির্বাচনের আগে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এই সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার দলগুলো এরই মধ্যে তাদের দাবি ও লক্ষ্য তুলে ধরেছে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে যুক্ত হওয়ার আগে বিএনপিও তাদের দাবি ও লক্ষ্য জানাতে চায়। এ জন্যই মূলত এই জনসভা ডাকা হয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি সফল ঐতিহাসিক জনসভার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুপুর ২টায় এ সমাবেশ শুরু হবে। এই জনসভায় কী কারণে বিএনপি আন্দোলনে যেতে চায়, কী হলে নির্বাচনে যাবে সেসব বিষয় স্পষ্ট করা হবে। আন্দোলনে যাওয়ার একটি বার্তাও দেবেন সিনিয়র নেতারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনসভা থেকে আমরা আমাদের নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেব। ভবিষ্যতের কর্মপন্থা, কর্মসূচি এগুলোই আসবে।’

জানা গেছে, সমাবেশ থেকে দলের সাত দফা দাবির পাশাপাশি ১২টি লক্ষ্য ঘোষণা করা হবে। সরকারকে এসব দাবি বাস্তবায়নে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হবে। তবে কোনো আলটিমেটাম দেওয়া হবে না।

জানা গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরা হবে সমাবেশে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির অবস্থান বা সরকার গঠন করতে পারলে তাদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আনার অঙ্গীকার থাকবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদ্দেশেও বার্তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদে মদদ না দেওয়া এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার অঙ্গীকার থাকবে। সশস্ত্র বাহিনীকে আরো আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথভাবে সংস্কার ও কার্যকর করার অঙ্গীকারও থাকবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সমাবেশ থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের দাবি ও লক্ষ্যগুলো ঘোষণা করব।’ তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তফ্রন্ট, ঐক্য প্রক্রিয়া পাঁচ দফা দাবি ও ৯ লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

‘সরকার বন্ধ করতে পারে, আমরা সেটাকে অতিক্রম করব’ : গতকাল শনিবার বিকেলে সমাবেশস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, সরকার বিএনপির সমাবেশ ঘিরে কোনো ঘটনা ঘটানোর জন্য আগাম সহিংসতার কথা বলছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বিএনপির মিটিংয়ে বিএনপি কেন অস্থিরতা করবে, সহিংসতা করবে? আমরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সমাবেশ করব। সমাবেশে লোক আসার পর আপনারা মন্তব্য করবেন কত লোক এসেছে।’

গয়েশ্বর বলেন, ‘সরকার গাড়ি বন্ধ করতে পারে, রিকশা বন্ধ করতে পারে, ট্রেন বন্ধ করতে পারে, আবার লঞ্চও বন্ধ করতে পারে। তারা অনেক কিছুই করতে পারে। তারা সব কিছু করবে, তার পরও আমরা সেটাকে অতিক্রম করব। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে দাবিগুলো আছে সেগুলো একত্র করে মিটিংয়ে আমরা উপস্থাপন করব।’

ওই সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, ফজলুল হক মিলন, আব্দুস সালাম আজাদ প্রমুখ।

এর আগে সকালে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে। তখন ২২ শর্তে তাদের সমাবেশের অনুমতির কথা জানানো হয়।

যেসব শর্তে সমাবেশের অনুমতি : ডিএমপির শর্তগুলোর মধ্যে আছে—সমাবেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী, রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপ পরিচালনা করা যাবে না; উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য এবং প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না; ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কোনো ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন, বক্তব্য প্রদান ও প্রচার করা যাবে না; সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অভ্যন্তরে সমাবেশের যাবতীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে; নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইডি কার্ডসহ নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়োগ করতে হবে; স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জনসভাস্থলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে স্থাপন করতে হবে; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জনসভাস্থলে আসা প্রতিটি যানবাহন তল্লাশি করতে হবে; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জনসভাস্থলে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রাখতে হবে; অনুমোদিত স্থানের বাইরে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না; অনুমোদিত স্থানের বাইরে সড়ক ও ফুটপাতে প্রজেকশন ব্যবহার করা যাবে না; অনুমোদিত স্থানের বাইরে সড়কে অথবা ফুটপাতে সমবেত হওয়া যাবে না; আজান, নামাজ ও ধর্মীয় সংবেদনশীল সময় মাইক চালু রাখা যাবে না; জনসভার মঞ্চ অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না; জনসভার দুই ঘণ্টা আগে মানুষ জনসভাস্থলে যেতে পারবে; বিকেল ৫টার মধ্যে জনসভা শেষ করতে হবে; মিছিলসহকারে জনসভায় যাওয়া যাবে না; ব্যানার-ফেস্টুনের আড়ালে কোনো ধরনের লাঠিসোঁটা, রড আনা যাবে না; শর্ত না মানলে তাত্ক্ষণিকভাবে অনুমতি বাতিল বলে গণ্য হবে; জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই কর্তৃপক্ষ এ অনুমতি বাতিল করতে পারবে।

জনসভা সফল করতে সরকারের সহযোগিতা চাইলেন রিজভী : গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী জনসভা সফল করতে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইনশাআল্লাহ আগামীকাল (রবিবার) ঐতিহাসিক ও সাফল্যমণ্ডিত জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জসহ অন্যান্য জেলার নেতাকর্মীদের জনসভায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ ঢাকাবাসীকে যথাসময়ে জনসভায় যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

বিএনপির এই নেতা জানান, গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আতাউল্লাহ বোখারীসহ বিএনপি ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল থেকে পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করে গ্রেপ্তার করে। কুষ্টিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৮ নেতাকর্মীকে। ঢাকার বংশাল থানায় ১১টি গায়েবি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আব্দুস সালাম আজাদ প্রমুখ।

মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে : গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে সমাবেশের অনুমতি মেলার পর থেকেই সেখানে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে দেখা যায়। রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মঞ্চ তৈরির প্রাথমিক কাজ শেষ হয়। রাতে নির্ধারিত এলাকার মধ্যে মাইক লাগানের জন্য কাজ করছিল শ্রমিকরা।

প্রস্তুতি সম্পর্কে বিএনপির সহসাংগঠনিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মঞ্চসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ না হলে মধ্যরাতেও কাজ চলবে। এ ছাড়া শৃঙ্খলা, আপ্যায়ন, ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবকসহ বেশ কয়েকটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক এখানে নিয়োজিত থাকবে।

দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনসভায় নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি ঘটাতে প্রস্তুতি নিয়েছে। এ লক্ষ্যে গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলা বিএনপির নেতা ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়ে যৌথ সভা করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় বৈঠক হয় দলের স্থায়ী কমিটিরও। এ ছাড়া গতকাল ঢাকা মহানগর বিএনপি, মহিলাদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল, শ্রমিকদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বৈঠক করেছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ এই জনসভার মাধ্যমে আমরা দেশবাসী-বিশ্ববাসী সবাইকে দেখাতে চাই সরকার এখন একঘরে হয়ে পড়েছে।’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, জনসভা ঘিরে ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী জেলার নেতাকর্মীরাও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং এসব জেলার সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নেতাকর্মীদের আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এটাই দলের প্রথম জনসভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধান অতিথি থাকবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভা করেছিল বিএনপি।

শেয়ার করুন