আওয়াজ নেই মানবাধিকার কমিশনের

0
648
Print Friendly, PDF & Email

দেশের সাম্প্রতিক সময়ের চাঞ্চল্যকর কোনও মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কোনও আওয়াজ পাওয়া যায়নি। এমনকি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যে অভিযোগগুলো কমিশন আমলে নিয়েছে, সেগুলোরও সুরাহা বিষয়ে সফলতা নেই বললেই চলে। শুরু থেকে আইনি দুর্বলতা থাকার পরও বেশকিছু কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়াজ তুললেও বর্তমান চেয়ারম্যান বলছেন, একশ দিনের পরিকল্পনায় কমিশনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে আপাতত খুব বেশি আওয়াজ দিতে পারছেন না তারা।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে নির্বাহী ক্ষমতা না থাকার কারণে তাদের পক্ষে কোনও বিষয়েই সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব হয় না। যেকোনও অভিযোগের সত্যতা পেলেও কেবল সুপারিশে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।আর অন্যান্য বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যা করা সম্ভব তারা তাই করছে। কিন্তু এধরনের কমিশনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সামর্থ্য থাকা উচিত।

কমিশনের দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে মোট ১৭টি ইস্যুতে কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ নিয়েছে। এরমধ্যে মাত্র তিনটি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, যৌন হয়রানি, কর্তব্যে অবহেলার বিষয়গুলোতে অভিযোগ আমলে নিলেও ব্লগার হত্যাকাণ্ড বা গুম ও নিখোঁজ হওয়া বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও অভিযোগ তারা তদন্ত করেনি। এমনকি কুমিল্লায় তনু ধর্ষণ বিষয়ে কমিশন নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে ঘটনা পরিদর্শন করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তদন্ত তারা করতে পারেনি, বা এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিবেদন হাজির করেনি। এমনকি দৈনন্দিন মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রশ্নে অভিযোগের বাইরে নিজেদের কোনও ডেটা তাদের নেই।
কমিশনে আসা মোট অভিযোগ

তনু ধর্ষণ ও হত্যা ইস্যুতে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান এলাকা পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থল তদন্তের আগেই পরিষ্কার করে ফেলায় সেনানিবাসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সমালোচনা করেন তিনি। এর পরপরই মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ২ আগস্ট নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কাজী রিয়াজুল হক দায়িত্ব নেন। তারপর তনুর বিষয়ে আর কোনও অগ্রগতি নেই।

এদিকে ২০১৫ সালে আসা মোট অভিযোগের সংখ্যা ৫২৪ হলেও এরমধ্যে ৩৪২টি জমিজমা বিরোধ ও ব্যক্তিগত সমস্যার অভিযোগ, যেগুলো কমিশন অন্যান্য অভিযোগ ক্যাটাগরিতে ফেলে থাকে। সারা বছরে ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে মাত্র ১১টি। গুমের ১৫টি অভিযোগের কোনোটিই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। গুম বিষয়ে আসা অভিযোগগুলোর ধরণ বিষয়ে কমিশনের কর্মকর্তা এক বলেন, সবগুলো নিখোঁজের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। কমিশন এগুলোর কোনোটি আদৌ অভিযোগ আকারে আমলে নিয়ে তদন্ত করেছে কিনা, সে বিষয়ে জানাতেও অপারগতা জানান এই কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের আরেক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চলার কারণে আসলে কেউ কোনও রিস্ক নিতে চান না। এসব নিয়ে আমাদেরও কোনও কথা বলা নিষেধ আছে।

সম্প্রতি কমিশনের দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়া সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু করতে চেয়েও পারিনি, সেই গ্লানি আছে। আসলে আমাদের এই কাঠামোতে সব কিছু করাও সম্ভব না। তবে মানবাধিকার কমিশন কি করতে পেরেছে না পেরেছে জানি না, যথেষ্ট সরব ছিল।’
কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ

কমিশন এখন কেন সরব নেই, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি গত আগস্টে জয়েন করেছি। প্রথম একশ দিনের পরিকল্পনায় কমিশনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাচ্ছি। সে কারণে খুব বেশি আওয়াজ দেওয়া না গেলেও আমরা অনেকগুলো কাজ করেছি। আমরা চেষ্টা করছি, এটা যেন ওয়ানম্যান শো না হয়ে যায়, আমরা পুরো কমিশন কাজ করতে চাই।’

দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই পরিস্থিতিতে একশ দিনের পরিকল্পনার কথা বলে চুপ থাকার সুযোগ আছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন গুছিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়ায় আছি। সবগুলো ঘটনা ধরেই কথা বলা হচ্ছে। যদিও মিডিয়ার মুখোমুখি হওয়া হয়নি বেশি।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী ভুক্তভোগীরা তাদের কাছে সমস্যা জানাবে, তারা সমস্যা নিরসনকল্পে যা যা করণীয় তা করবে। এবং যারা সমাজের ক্ষমতাবান বা রাষ্ট্র দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার, মানবাধিকার কমিশনে তারাই অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবানদের নিপীড়নের কোনও ইস্যুতে বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন কোনও অভিযোগ পেয়ে মাঠে গিয়ে যথাযথ তদন্ত করে সহযোগিতা করেছে, এর প্রমাণ মেলে না। দু-একটা থাকতে পারে।’

নূর খান আরও বলেন, ‘নিজেদেরকে দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টার চেয়ে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার সহায়তা নিতে বিগত সময়ে তারা ব্যস্ত ছিল।এখনও পুরো কাজটা বেশ অগোছালো। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনও বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন যদি কমিশনকে কোনও উদ্যোগ নিতে চিঠি দেয়, তাহলে তারা সেই চিঠি সরকারের কাছে ফরওয়ার্ড করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। এখনও পর্যন্ত তারা নিজেদের কার্যকর বলে দাবি করতে পারবে না।’

শেয়ার করুন