নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় নির্বাচন সালাহউদ্দিন বাবর

0
776
Print Friendly, PDF & Email

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দশম জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ-আপত্তি রয়েছে। সে নির্বাচনে একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং তার ১৪ দলের জোটভুক্ত মিত্ররা অংশ নিয়েছিল। তা ছাড়া রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে নির্বাচনকে দেশের ভেতরে বা বাইরে ভারত ছাড়া কেউই অনুমোদন করেনি অনিয়ম, কারচুপি ও একতরফা হওয়ার কারণে। দেশের ভেতর থেকে তো বটেই; বাইরে থেকেও ওই নির্বাচন নিয়ে কোনো উৎসাহ না দেখিয়ে অবিলম্বে নতুন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলা হয়েছে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর ২০-দলীয় মিত্ররা নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে জোর দাবি তুলে আন্দোলন করেছে। এখন অবধি বিএনপি ও এর মিত্ররা নতুন নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার। এটা এত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন যে, ভারত ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের আর কারো কাছ থেকে এর অনুমোদন আসেনি। দেশের ভেতর নতুন নির্বাচনের দাবি ওঠায় নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন মহল কখনোই স্বস্তি বোধ করেনি, এখনো করছে না। এই নির্বাচনের পর তারা সরকার গঠন করেছেন বটে, কিন্তু নৈতিক দিক থেকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভেতরে একটা গ্লানিবোধ থাকতে পারে। এই নির্বাচনে দু’টি জিনিস প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকারি দলের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এখনো আমাদের দেশে সম্ভব নয়। তা ছাড়া, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন খুবই জরুরি। প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন রয়েছে। সব দেশে বিশ্বমানের নির্বাচন সম্পন্ন করে থাকে এই কমিশন। গণতন্ত্রের প্রাণ নির্বাচন, সেটা যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ না হয়, তবে কার্যত গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটে। এই অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জোর আন্দোলন করেছিল এবং আন্দোলন করে এই দাবি আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সে ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় এবং পুনরায় দলীয় সরকারের অধীনেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে। এ সংসদ নির্বাচন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর সংসদের প্রথম নির্বাচন। এর বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ রয়েছে, যা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ফের ব্যাপক আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে মাত্র চার মাস পরে, আগামী বছর ৮ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছিল ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। তাই নতুন নির্বাচন তথা সংসদের একাদশ নির্বাচন হবে নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। আর সে জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি এ কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছিল। ওই তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি নতুন কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন গঠনের আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ২৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেন। সেই বৈঠকে বহু দল নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য নিজেদের মত দিয়ে একটি করে তালিকা পেশ করেছিল। পরে রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রধান বিচারপতির মনোনীত, আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে সভাপতি করে নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটির অপরাপর সদস্য ছিলেন- হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান। পরবর্তীকালে চার সদস্যের এই কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য নামের একটি তালিকা জমা দেয়। তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করেছিলেন। ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদের এই কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। সেই কমিশন গঠনের আগে কোনো নির্বাচন সম্ভব নয়।
এবারো সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে বলে মত ব্যক্ত করেছেন আইনমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারি ভাষ্য এটাই। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবারো আগের প্রক্রিয়ায় ইসি নিয়োগ করা হবে। ২০১২ সালে যেভাবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এবারো সেভাবে হবে।’ এ দিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও চার দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে; কিন্তু সে আইন প্রণীত হয়নি। সংবিধানের আলোকে এই আইন প্রণয়নের বিষয়টি এখনো সরকারের বিবেচনায় আসেনি। তেমন ‘পরিকল্পনা নেই’ বলে উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে। অতীতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবার মতামতের আলোকে তা গঠন করা হয়েছে। আগামীতে এভাবেই কমিশন গঠন করা হবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বলেছে, ইসি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। তিনি সরকারের বা আওয়ামী লীগের কেউ নন। কাজেই এ ক্ষেত্রে সরকারের সাথে বিএনপির সংলাপের কিছু নেই। রাষ্ট্রপতি গতবারের মতো সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতসাপেক্ষে ইসি গঠন করবেন। ক্ষমতাসীন দল আরো মনে করে, দ্রুত সংসদ নির্বাচনের দাবি না করে বিএনপির উচিত যথাসময়ে অনুষ্ঠিতব্য, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সরকারি দল মনে করে, এখন এ বিষয়টি অতীত। কারণ সংবিধানে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানের অস্তিত্ব নেই।
নির্বাচন কমিশন সংবিধানমাফিক, সব দিক থেকে স্বাধীন। এ স্বাধীনতা প্রয়োগ করে ইসিকে নির্বাচনের ব্যাপারে তার ওপর জাতির আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশে চারটি নির্বাচন ছাড়া আর সব নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার মনে করেন। তিনি বলেন, অতীতে ইসির ঘাটতি ছিল। ২০১৪ সালে তা চরমে পৌঁছে। অপর এক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র চাইলে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। আগামীতে এমন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। আর এমন একটি নির্বাচনের দায়িত্ব ইসির। ইসি গঠনেই যদি গলদ থেকে যায়, তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইসি নিয়ে যতটা ঢাকঢোল পেটানো হয়, ঠিক ততটা গুরুত্ব দিয়ে ইসি গঠিত হয় না। তিনি আরো বলেন, ইসি গঠনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। শুধু যোগ্য হলেই হবে না; তাদের ওপর জনগণের আস্থা থাকতে হবে। তাদের গ্রহণযোগ্যতারও প্রয়োজন রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার ও মাস্তান ঠেকানোর ব্যাপারে দল-মত বিচার না করে তাদের কাজ করতে হবে। ইসি গঠনের ক্ষেত্রে সব দলকে সম্পৃক্ত করা উচিত, কাউকে বাইরে রাখা ঠিক হবে না। দেশে নির্বাচন নিয়ে সঙ্কট রয়েছে, আস্থার অভাব রয়েছে; সেটি দূর করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মানসিকতা। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার একটি শর্ত হচ্ছে, সরকারের সব অঙ্গই নিরপেক্ষভাবে ইসিকে সহযোগিতা করা। ইসির যথেষ্ট নৈতিক বল থাকতে হবে। তার পক্ষে রয়েছে সংবিধান, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে। তাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের সামলাতে হবে; যাতে তারা নির্বাচনে কোনো অনিয়ম বা হস্তক্ষেপ না করে এবং জনগণের ভোট ছিনতাই না করে।
২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির তিন মাস আগে যেকোনো দিন সংসদ নির্বাচন হবে- এটাই বিধান। সেই হিসেবে এখনো দুই বছরের বেশি সময় রয়েছে। তা সত্ত্বেও ইতোমধ্যে ভোটের মৃদুমন্দ হাওয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে বইয়ে শুরু করেছে। তবে এটা নতুন নির্বাচন না মধ্যবর্তী নির্বাচন, সেটাও একটা প্রশ্ন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একমত হয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের পক্ষ থেকে কোনো দাবি আসেনি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, এই মুহূর্তে নির্বাচন চাই। তবে সে নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দেশের বড় দুই দল মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, তারা জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে।
তবে এই নির্বাচন সঠিক কোন সময় হবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, পরবর্তী সংসদ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে। খবরে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা নির্বাচনকে সামনে রেখে হোমওয়ার্ক করছে। বিএনপি তাদের কাউন্সিল করে দল গোছানোর কাজ শুরু করেছে। বিএনপি আগামী নির্বাচন যে কারো অধীনেই হোক, তাতে অংশ নেবে। প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত; এখন তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে জনমত গঠনের কাজ তারা শুরু করেছে। সব দলের অংশগ্রহণ এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের ওপর বৈদেশিক চাপ সৃষ্টির জন্য কাজ করছে। আপাতত সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলনের কর্মসূচিতে যাচ্ছে না দলটি। ‘ভিশন ২০৩০’-কে সামনে রেখে এ দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হবে। ২০০ আসনে পুরনো সদস্যদের মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি আসনে নবীনদের নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ২০তম দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হবে ২২ অক্টোবর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে কাউন্সিল অধিবেশন করার পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। ভারতসহ বিশ্বের ১২টি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে কাউন্সিলে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে পাকিস্তানের কোনো দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। এই অধিবেশনে দলের ৩০ হাজার ডেলিগেট এবং ছয় হাজার ৬০০ কাউন্সিলর যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দুই দিনের এই কাউন্সিলের উদ্বোধন অনুষ্ঠান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং পরবর্তী অধিবেশনগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, আসন্ন কাউন্সিল অধিবেশনে মাঠপর্যায়ের যে নেতারা অংশ নেবেন, তাদের ২০১৯ সালের আগেই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির বার্তা ও দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। জাতীয় নির্বাচন মাথায় রেখে দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির প্রস্তুতি নেয়া হবে। এই ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হবে- ‘ভিশন ২০৪১’। এতে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। আওয়ামী লীগ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য জরিপ পরিচালনা করছে। দলের সংসদ সদস্যদের কাজের মূল্যায়ন করা এবং ময়দানে তাদের জনপ্রিয়তার বিষয়টিও দেখা হবে। বস্তুত আওয়ামী লীগ একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে একাধিক প্রার্থীকে সামনে রেখে চিন্তাভাবনা চলছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সুবিধা হচ্ছে, তারা ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। ফলে প্রশাসনের সব ক্ষেত্র থেকেই তারা সহযোগিতা পাবেন। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রেও তারা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠিত হবে, সেখানেও তাদের প্রভাব পড়বে। ফলে নির্বাচন কমিশনে তাদের পছন্দের লোক আসার সম্ভাবনাই বেশি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে সার্চ কমিটির মাধ্যমে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুসারেই এই কমিশনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনসহ বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু এসব নির্বাচনের কোনোটিই অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। কোনো নির্বাচনেই জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। ভোট ছিনতাই হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত জনপ্রতিনিধি বেছে নেয়ার সুযোগ জনগণ পায়নি।
জাতীয় পার্টি সরকারের সুবিবেচনায় রয়েছে। তারা ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। দলের প্রধান এইচ এম এরশাদ সিলেট থেকে প্রচারাভিযানের সূচনা করেছেন গত শনিবার। তাদের এই প্রচারণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে তারা সবুজ সঙ্কেত পেয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইসি গঠনের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিত্রটি পরিষ্কার হবে। এমনকি ওই বছরের প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা আসতে পারে।
এ কথা সবার মনে রাখতে হবে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার উপায় বা হাতিয়ার নয়, সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচন দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং দেশের উন্নয়নের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করাই নির্বাচনের লক্ষ্য। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ, যোগ্য, সৎ ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ করার উপায় হচ্ছে নির্বাচন। দেশে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন অবশ্যক। সন্ত্রাসমুক্ত সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প নেই।
আমরা পাশের দেশ ভারতের অনেক বিষয় নিয়ে উদাহরণ পেশ করে থাকি, যার বেশির ভাগই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। কিন্তু সে দেশের নির্বাচন নিয়ে বা নির্বাচন কমিশন নিয়ে কোনো কথা কারো মুখে শোনা যায় না। সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের অবস্থান অনেক ওপরে। সে দেশের গণতন্ত্রও বিশ্বমানের, যা ভারতের স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করেছে। ভারতে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের জন্য যেখানে যতটুকু ভালো জিনিস রয়েছে তা গ্রহণ করা উচিত।

শেয়ার করুন