ইসলাম করিমভ : স্বৈরাচারের বন্ধু নেই

0
787
Print Friendly, PDF & Email

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন স্বৈরাচার শব্দটি নতুন করে কাউকে বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ যুগে যুগে দেশে দেশে স্বৈরাচারের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে মানুষ। স্বৈরাচারের সংজ্ঞাটাও অনেকে এককেন্দ্রিক জানেন। কারণ প্রতিনিয়ত বাসে-ট্রেনে চলার সময় লোকজনের মুখ থেকে শুনি যে অমুক সরকার স্বৈরাচার। আসলে কি বিষয়টি এমন? তবে এ কথা যে একেবারে মিথ্যে তা কিন্তু নয়! কারণ প্রতিটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো একটু পর্যালোচনা করলেই স্বৈরাচারের চিত্রটা কেমন তা অনুধাবন করা যায়। শুধুমাত্র সরকারই স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করে না কখনও কখনও নাগরিকেরা স্বৈরাচারী হয়ে উঠেন। সরকারি অফিস-আদালতের কথা না হয় বাদই দিলাম। অনেক নামিদামি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ঊর্ধ্বতন বসরা স্বৈরচারের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। তারা ক্ষমতার চেয়ারে বসে অফিসকে স্বৈরাচারের মিনি কেন্দ্রে পরিণত করেন। তাদের ইতিহাস লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। কারণ একটা সমাজ বা দেশের মানুষ যখন শুধুমাত্র ভোগ বিলাসের ভেতরে নিমজ্জিত থাকে তখন আর ন্যায়নীতির কথা চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু যখন দেখি সবর্ত্র স্বৈরাচারের পদযাত্রা তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। একজন মানুষ কখনও ভুল ক্রুটির ঊর্ধ্বে নন। ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষের অধিকার রক্ষা করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিব্ধ যে কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তাহলে তিনিও স্বৈরাচার। একটি প্রতিষ্ঠানের এমডি বা বস যদি তার অধীনস্তদের উপর জুলুম করে থাকেন তাহলে তিনিও স্বৈরাচার। সে খবর ক’জনে রাখে। সে বিষয়টিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। এই সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে সর্বত্র স্বৈরাচারের জুলুম-নির্যাতন-নির্মমতার বিষয়টি বার বার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, বলাই বাহুল্য স্বৈরাচারের শত্রু আছে বন্ধু নেই। প্রায় ২৫ বছর ক্ষমতার সিঁড়ি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভ। প্রেসিডেন্ট প্যালেসে কাটানো এই রাষ্ট্রপ্রধানের শাসনও ছিল বিস্ময়কর। হিটলার, মুসলিনি, চসেস্কু, লেনিন ও স্টালিনের মতো শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন করিমভ। কিন্তু অবশেষে মৃত্যুর দূতের কাছে হেরে গিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এই কমিউনিস্ট নেতা প্রতিপক্ষ তো দূরে থাক নিজের উত্তরসূরি পর্যন্ত রেখে যেতে পারেননি। সম্প্রতি ৭৮ বছর বয়সী এই একনায়কের মৃত্যু হয়েছে। মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তান। জনসংখ্যা ৩ কোটি ১৫ লাখ, যার ৯০ ভাগই মুসলমান। ১৯৯১ সালে মস্কো থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই উজবেকিস্তান ছিল করিমভের কব্জায়। এই স্বৈরশাসক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের সুবাদে ১৯৮৯ সালেই দেশটির নেতা হন। তবে সর্বশেষ ২০১৫ সালের নির্বাচনে ৯০ ভাগ ভোট নিয়ে আবারও ক্ষমতার মসনদ দখলে নেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশটিতে কখনও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তার মৃত্যুতে ক্ষমতার একক কোনো উত্তরসূরিও নেই। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী দেশটিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বর্বর কায়দায় দমনের নিষ্ঠুর কুখ্যাতি রয়েছে। ২০০৫ সালে কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীকে নির্মমভাবে হত্যা করে সরকারি বাহিনী। নিপীড়নের ভয়াবহতার রেকর্ড ভাঙতেন করিমভ। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফুটন্ত পানিতে ফেলে সিদ্ধ করে হত্যা করেছেন বলে জানান দেশটিতে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রেইগ মারি। এমনকি করিমভের নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি তার বড় মেয়ে গুলনারা। টুইটারে সরকারের সমালোচনা করায় তাকে ২০১৪ সাল থেকে গৃহবন্দি করে রাখে করিমভ। পৃথিবীর কোন স্বৈরাচারই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। কারণ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রঙিন চশমা পড়ে শুধু চাটুকারীতা আর তেল মর্দন করাই পছন্দ করে। কারণ প্রকৃত সত্য কথাটাও তারা সহ্য করতে পারে না। করিমভের বড় মেয়ে মা এবং ছোট বোনের কড়া সমালোচক ছিলেন বলেই বাবাকে স্ট্যালিনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমরা যদি একটু তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে যে উজবেকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু করিমভকে বলা হতো একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক। আর স্বৈরশাসক বলার পেছনেও যুক্তি রয়েছে। কারণ তিনি বিরোধী দলের বা মতের ওপর দমনপীড়ন চালাতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। উদাহরণস্বরূপ ২০০৫ সালের একটি ঘটনার কথা বলা যায়। সরকারের দমনপীড়ন নীতির প্রতিবাদে আন্দিজান শহরে প্রতিবাদ সমাবেশে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী বিনা কারণে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে নারী-শিশুসহ শত শত মানুষের প্রাণ হারায়। এই ঘটনা আজোও আন্দিজান শহরে গণহত্যা নামে অধিক পরিচিত। আন্দিজানের মানুষ এমন ভয়ানক ঘটনার মুখোমুখি এর আগে কখনো হননি। মিডিয়াকে বলা হয় জাতির দর্পন। কিন্তু সমালোচনা করতে পারে এমন কোনো মিডিয়া উজবেকিস্তানে বাটি চালান দিয়েও খুঁজে পাওয়া দায়। যেসব মিডিয়া নিজেদের স্বাধীন বলে পরিচয় দেয় তাদের আচরণও এমন দাসসুলভ যা সত্যিই হাসির খোরাক জোগায়। মানব ইতিহাসের সংঘটিত সব ঘটনাই মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। মানুষের উচিত অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অমান্যকারী ব্যক্তি বা জাতিকে এ জগতেই কোনো না কোনোভাবে প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধঃপতিত গোটা জাতিই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আল কোরআনে বিভিন্ন নবী ও আগের অনেক জাতির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। আমরা যদি আল কোরআনে বর্ণিত অতীত জাতিসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব, অন্যায় করে, জুলুম করে, নিপীড়ন-নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে কেউ বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। তাদের অহংকার, শক্তি, ক্ষমতার দম্ভ মাটির ধূলায় মিটিয়ে দেয়া। ইতিহাস সাক্ষী নমরুদ, ফেরাউন, সাদ্দাদ, কারুন, আবুজেহেল কেউ রক্ষা পায়নি। সময় তারা পেয়েছিল অফুরন্ত। কিন্তু তা তাদের কোন কল্যাণে আসেনি। রোধ করতে পারেনি পতনের ধারা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মানুষ ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করতে অনীহা দেখায়। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে চিরশত্রু যেমন বন্ধু হওয়ার জন্যে এগিয়ে আসে তেমনি ক্ষমতাহীন সময়ে আপন বন্ধুও পর হয়ে যায়। এই সত্যটুকু ক্ষমতার চেয়ারে অধিষ্ঠিত থেকে উপলব্ধি করা যায় না। যুগে যুগে আবুজেহেল, আবুলাহাবের প্রেতাত্মারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষের উপর জুলুমের স্টিম রোলার চালায়। একবারও ভাবে না তার ভয়াবহ পরিণতির কথা।

শেয়ার করুন