স্মৃতিকথা জীবন যখন ছিল ফুলের মত… ফৌজিয়া হাসিন

0
600
Print Friendly, PDF & Email

দৃশ্য: এক ওই কারা হেঁটে যাচ্ছে কুয়াশার চাদরের আড়ালে? একি স্মৃতির কুয়াশা নাকি কোন স্বপ্ন- দৃশ্য ? দুটি বালিকা গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। এটা তাদের নিরুদ্দেশ ভ্রমণ, স্বপ্ন- যাত্রা। চলছে আপনমনে । কোথায় যাবে তা জানে না, সুনির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই। পথই পথ দেখাবে। কানাপুকুরের পাশ দিয়ে পারিবারিক কবরস্থান, আমবাগান পেরিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সীমানার দিকে। এই দুইটি বালিকা দুই বোন। আপন বোন কিন্তু ওদের বাবা- মা আলাদা। ওরা ঘুমায় একসাথে, খায় একসাথে, চলে একসাথে। এরকম একসাথে থাকে বলে দু’জনের নাম দুটো মিলে একটি নাম হয়ে যায়, ‘জেসিজেনি’। ওদের আছে এক স্বপ্নের পৃথিবী, কল্পনার রাজ্য- সেখানে ওরাই রাজা ওরাই প্রজা।       যেতে যেতে একসময় এসে পৌঁছায় একটি ছোট্ট জলাধারের কাছে। খুবই বাজে একটি নাম, “শকুনি ছড়া”। এমনিতেই ওদের গ্রামে কোন নদী নেই। কিন্তু ওরা যে ছোকানু আর ওর ভাইয়ের মত ‘নদীর স্বপ্ন’ দেখে। তাই এই ছোট্ট তিরতিরে জলাধারটিই ওদের পদ্মপুকুর, স্বপ্ন-নদী। বর্ষায় এই শীর্ণ স্রোত ধারাটিই ভর-ভরন্ত হয়ে ওঠে। মূল উৎসটির কাছে যেতে বালিকাদের বড় সাধ হয় কিন্তু সেটি যে আরেক দেশে!  বড় মনোরম জায়গাটি, চারদিকে ঝোপঝাড়, গাছপালা, বিস্তৃত ধানক্ষেত। কাছেই ভারত সীমান্ত। এখান থেকে দেখা যায় দূরে পাহাড়ের সারি। ওরা বলে, মামা-ভাগনার টিলা। জলের ধারে বসে থাকে দুজনে, অনেক কথা বলে- বালিকাদের সরল গল্প। একসময় উঠে দাঁড়ায়, আবার হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়িতে ঢোকে। জীর্ণ-শীর্ণ ঘরগুলো,  চারদিকে দারিদ্রের ছাপ। বাড়ির লোকজন এত ছোট দু’টি বালিকাকে দেখে কৌতুহলী হয়। জানতে চায় কোথা থেকে এসেছে। জানার পর হুলস্থূল শুরু হয়ে যায়। কোথায় বসাবে, কি খাওয়াবে- কি যে খাতির-যত্ন! ওরা জানেই না এটা ওদের কালা’র মা বুয়ার বাড়ি। ছোটো খাটো, শান্তশিষ্ট, মুখভরা পান আর হাসিভরা মুখের কালা’র মা বুয়া। বহু বছর ধরেই ওদের বাড়িতে সাহায্যকারী হিসাবে আছেন, মাসিক বেতন দশ টাকা। যাই হোক, এতদিন পর মনে নেই কি খেতে দিয়েছিল। পিঁপড়ে ভাসা চিনির শরবত কি এ বাড়িতে দিয়েছিলো?  দৃশ্য: দুই  বিকেল এখন, মাত্র ফিরেছি স্কুল থেকে। ভাত খেয়ে উঠতে না উঠতেই, “শায়ে …ন”, হুজুরের ডাক, শাহিনকে ডাকছেন। হুজুর তো নয়, যেন বাঘ ডাকছে। ডাক শুনলেই বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে ওঠে। বিকালে খেলার সময়ে হুজুরের কাছে পড়াটা এই সদ্য-স্কুল ফেরত বালক-বালিকাদের কাছে যে কি বিরক্তি আর আতঙ্কের ব্যাপার তা বাবা- মায়েরা একটুও বোঝেন না!  তবুও তারা তিনজন মিলে পড়তে বসে, কিন্তু মনটি বীথি, শামিম ওদের সাথে খেলতে থাকে হা-ডু-ডু, ‘কুমির তোর জলে নেমেছি’।  প্রসন্নবাবু স্যার পড়াতে আসেন সন্ধ্যার পর। শীর্ণ দেহের, আধময়লা ধুতি পাঞ্জাবী পরা নিরীহ এক শিক্ষক। একটা সাইকেলে চেপে ধীরে ধীরে এসে ঢোকেন। খুব ভাল পড়াতেন তা না কিন্তু তাঁর শান্ত স্বভাব ছাত্রছাত্রিদের কাছে তাঁকে প্রিয় করে রাখে। প্রতিদিন এককাপ চা আর কিছু খাবার আসতো তাঁর জন্য। পরম তৃপ্তি নিয়ে শব্দ করে চা খেতেন, খাবারের একটা কণাও কোনদিন প্লেটে পড়ে থাকত না। সেদিন বাড়িতে বড়দের কেউ নেই, আছে শুধু কাজের ছেলে ‘গুটলু’। সময় গড়িয়ে যায়, চা- খাবার আর আসে না। স্যার ডাকেন, “গুটলু, আজকে চা দিবি না”? “স্যার, দুধ নাই”- গুটলুর তাৎক্ষণিক উত্তর। “আচ্ছা, রঙ চা দে” স্যার বলেন। এবার গুটলুর পরবর্তী তীর, “ওমা স্যার চিনি নাই”। “তাহলে লবণ দিয়েই দে, রং চা লবণ দিয়েই খেতে ভালো” বেচারা স্যারের কাতর অনুনয়।  গুটলু আজ স্বাধীন, চা বানানোর কষ্ট আজ সে করতেই পারবে না । তাই একটু পর এসে তার শেষ এবং অব্যর্থ তীরটি ছোঁড়ে “আহা স্যার, চা পাতাই তো  নাই”। সরল শিক্ষক শূন্য দৃষ্টিতে তাকান “তো আর কি করবি”! প্রায় ৪৩/৪৪ বছর আগের এই ঘটনাটি কেন যেন ভুলতেই পারিনি। আজ কোন মন্ত্রবলে যদি সেই অসহায়, দারিদ্র-ক্লিষ্ট শিক্ষককে পেতাম, বলতাম, “স্যার, এই যে আমরা, আপনার ছাত্র-ছাত্রীরা কত কিছু পেয়েছি জীবনে, কিন্তু সেদিন শুধু লবণ দেয়া দুধহীন এককাপ চা আপনাকে খাওয়াতে না পারার দুঃখটা কি দিয়ে পূরণ করতে পারবো সেটা আমাদের বলে দেন”।    তখন আমাদের ক্লাশ ফাইভ। শাহিন আর আমি দুজনেই বৃত্তি পরিক্ষা দিব। সে কারণে এবার শিক্ষক বদল হল। প্রসন্নবাবু স্যারের জায়গায় আসলেন সিঙ্গাড়া কাট চুলের কমবয়সী একজন। তাঁর কাজ হলো সাথে করে চকলেট, বিস্কুট, চানাচুর জাতীয় খাবার নিয়ে আসা আর আমাদের সাথে জমিয়ে গল্প করা। আমাদের তো আনন্দের সীমা নেই। এমন শিক্ষক কি সহজে মেলে? তো দিনের পর দিন শিক্ষক- ছাত্রের এই দান-প্রতিদান চলে, ফলে পড়াশোনা অশ্বডিম্ব। কিন্তু চোরের দশদিন হলে গৃহস্থের একদিন হতেই হবে!  এক দুর্ভাগা দিনে বড়তা’র কাছে ধরা পড়ে গেল আমাদের ফাঁকিবাজির এই মহোৎসব। ফলাফল শিক্ষক মহাশয়ের বিদায়। কিন্তু ততদিনে এই ছাত্র-ছাত্রী দুজনের ক্ষতি যা হবার  তা হয়ে গেছে।  দৃশ্য: তিন  ঈদে বাড়ি এসেছি সবাই। সবাই মানে আমাদের নয় ভাইবোন আর দুইজোড়া বাবা-মা মিলিয়ে তের সদস্যের পরিবারটি। অনেক মজা। রাতদিন খেলা, খেলা, খেলা। চিবুড়ি, টোকাটুকি, এক্কাদোক্কা। আরো আছে নাম-দেশ-ফল-ফুল, চোর- ডাকাত- বাবু -পুলিশ…। ঈদের আগের দিন অশ্বিনী নাপিত আসে আমাদের চুল কাটার জন্য। সবাই লাইন  ধরে বসে যেতাম, একজনের পর একজন। দাদাসাহেব নাপিতকে বলতেন, “আলফেট কাট দাও”। ‘আলফেট’ টা যে কি কাট কখনো জানলাম না। ঈদের অন্যতম আনন্দ ছিল দাদাসাহেব কর্তৃক প্রত্যেক নাতি-নাতনীকে আলাদা করে দেয়া ছোট্ট একটা করে সাবান। আমাদের কাছে নুতন জামাকাপড়ের চাইতেও আকর্ষণীয় ছিল এই সাবান পর্বটি। কি সুন্দর ছিল রঙগুলো- হালকা নীল, গোলাপি, ঘিয়ে, আর কি অপূর্ব সুগন্ধ! একা একটা সাবানের মালিক হওয়ার গর্ব আর আনন্দই ছিল আলাদা। আজ চারিদিকে ছড়ানো কত আনন্দ- উপকরণ কিন্তু সেই আনন্দটি হারিয়ে গেছে ‘গভীর কোন অন্ধকারে’।  ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ঈদ-রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, নাচ, নাটক। নিজেরাই আমরা সকল কাজের কাজী। বেশ কিছুদিন ধরেই নাটক লেখা হচ্ছে “যার যেথা ঘর”। লিখছেন বিশিষ্ট নাট্যকার, মেজ’তা। আমরা তো তার লেখক প্রতিভায় মুগ্ধ। পরিচালক ও মনে হয় তিনিই ছিলেন। তো একবার করা হল ‘মহসিন ও চোর’। জেসি’পা  আমার চেয়ে বয়সে কিঞ্চিৎ বড় হবার সুবিধাটা ভোগপূর্বক নিজে মহসিনের চরিত্রটা নিয়ে আমাকে একেবারেই অগুরুত্বপূর্ণ  ভৃত্যের চরিত্রটি দিয়ে স্বপ্রীতির যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, তা নিয়ে মনে বড় কষ্ট পেয়েছিলাম। সন্ধ্যার পরপর উঠোনে বা বাড়ির বারান্দায় শুরু হত অনুষ্ঠান। দর্শক- সমাবেশ একেবারে কম হতো না। এর মধ্যে গায়ক হিসাবে আমার ছোট মামা আমাদের এটুকু পরিসরে নাম করেছেন। গলাকে প্রচণ্ড কাঁপিয়ে যখন ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন’ বলে টান দেন আমার দাদুর মত মানুষও বলে ওঠেন- ‘ আমার পুত্রা তো ভালো গায়’! তবে করুণ সত্যটা হোল শামিম মামা গানের ‘গ’- ও জানত না । তবে সেটা বুঝেছি অনেক পরে। সে সময় তিনিই আমাদের ‘দেবব্রত বিশ্বাস’ । …আবার গায়িকা জেসি’পা খবরের কাগজ দিয়ে চোঙ্গা বানিয়ে সেটাকে মাইক হিসাবে ব্যবহার করে যখন তখনকার craze আজম খানের গান ধরতো “ওরে সালেকা, ওরে মালেকা”, মুখে না বললেও মনে মনে এতো বড় শিল্পীকে সমীহ না করে পারতাম না। এরকম আরও অনেক গল্প আছে, বলবো আরেকদিন।  …ক্রমবহমান সময় আমাদের ভাইবোনদের অনেককেই নিয়ে এসেছে প্রায় বিকেলবেলায়, কিন্তু আমাদের দিনগুলি আজো একেবারে মরে যায়নি। আজো আমরা একসাথে বলি, একসাথে গাই, একসাথে বাঁচি। জীবন আমাদের এভাবেই একসাথে বেঁধে রাখুক। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা, মায়া, দায়িত্ববোধ। জয় হোক আমাদের  দু’জোড়া বাবা-মায়ের- নয়টি সন্তানকে একটি ভালবাসার সুতোয় জড়িয়ে রাখার জন্য।

শেয়ার করুন