ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ৬৮২। কিন্তু গত বুধবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে বন্দি ছিলেন ৭ হাজার ৬৪৩ জন। অর্থাৎ সেখানে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি বাস করছেনসাখাওয়াত হোসেন গাড়িতে পেট্রলবোমা, অগি্নসংযোগ ও ভাংচুরসহ নানা নাশকতা ঠেকাতে দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে বিরোধী দলের শত শত নেতাকর্মী। তাই আতঙ্কিত অনেকেই নিজ ঘর ছেড়ে আত্মগোপন করছেন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের হল, মেস কিংবা তাদের ঘুপচিধরা বাসা-বাড়িতে। তবে সাঁড়াশি অভিযানের মুখে নিরাপত্তা মিলছে না সেখানেও। তাই গ্রেপ্তার হয়ে অনেকেরই শেষ ঠিকানা এখন কারাগার।
কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের অধিকাংশ কারাগারেই আগে থেকেই ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বন্দি থাকায় সেখানেও ঠাঁই হয়নি তাদের। তাই শেষমেষ অনেকেরই আশ্রয় হয়েছে জেলখানার রান্নাঘর কিংবা গণশৌচাগারের আশপাশে। কেউ কেউ থাকছেন খোলা আকাশের নিচে। এছাড়া কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন গোডাউন, বড় সেলের বারান্দা, এমনকি যেসব সেলের বাথরুমগুলো বড় সেগুলোকেও সেল বানিয়ে বন্দিদের রাখা হচ্ছে। ভারসাম্য রক্ষার্থে মাঝেমধ্যে এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে বন্দি অদল-বদল করা হচ্ছে। এতে কারা অভ্যন্তরে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ৬৮২। কিন্তু গত বুধবার দুপুরে সেখানে বন্দি ছিলেন ৭ হাজার ৬৪৩ জন। অর্থাৎ সেখানে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি বাস করছেন। এর ওপর প্রতিদিনই ঢাকা মহানগরসহ রাজধানীর আশপাশের এলাকায় দেড় থেকে দুইশ’ জন গ্রেপ্তার হচ্ছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকায় কিছু তো সমস্যা হবেই। তবে সেগুলো ম্যানেজ করেই বন্দিদের রাখা হচ্ছে।
তবে অতিরিক্ত বন্দি নিয়ে শঙ্কিত কারারক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই। তাদের আশঙ্কা এতে যে কোনো সময় কারা অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই সব কারাগারের নিরাপত্তা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী এরই মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের রাস্তাসহ আশপাশের এলাকায় ১৬টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে কারা অভ্যন্তরের নিরাপত্তা চৌকিও।
এদিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বোমাবাজ, চোর-ডাকাত আর খুনিদের সঙ্গে ভাগ্য বিড়ম্বনায় জেল খাটছেন নিরীহ অনেকেই। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে কেউ বা পিকেটার, কেউ বা বোমাবাজ কলঙ্ক মেখে কারাগারে ঢুকে পড়েছেন পুলিশের কারসাজিতে। তাদের গ্রেপ্তারবাণিজ্য ফেঁসেছেন স্কুল-কলেজগামী অসংখ্য শিক্ষার্থীও।
তাই ভোর না হতেই প্রতিদিন স্বজনদের ভিড় বাড়ছে কারা গেটে। আবার কেউ বা শিক্ষা সনদ, কর্মস্থলের পরিচয়পত্র ও হাজিরা তালিকাসহ নানা প্রমাণপত্র নিয়ে হন্যে হয়ে ছুটছেন আদালতে। আইনজীবীদের সাধ্যানুযায়ী ফি দিয়ে কারাবন্দি স্বজনের জামিনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে বিস্ফোরক, ভাংচুর ও অগি্নসংযোগসহ সব ধরনের নাশকতার মামলায় আপাতত জামিনের সুযোগ না থাকায় ব্যর্থ মিশন শেষে তাদের প্রায় সবাইকে ছুটতে হচ্ছে কারা ফটকেই। নির্ধারিত ফির ওপর কারারক্ষীদের বাড়তি আবদার মিটিয়েই বন্দি স্বজনদের সঙ্গে দেখা করছেন অনেকেই। আর যাদের সে সামর্থ্য নেই তার ঘুরছেন জেলখানার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। বুকে আশা_ যদি কোনো দয়াবান সৎ কারারক্ষীর সহায়তায় নির্ধারিত ফি দিয়ে স্বজনের দেখা মেলে।
তবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য উপরি অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় বন্দির সংখ্যা আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় তা সামাল দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ এসব বন্দির স্বজনরা প্রায় প্রতিদিনই দেখা করার সুযোগ চাইছেন। ফলে তারা তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ স্বজনরা এ ধরনের অভিযোগ করছেন বলে মনে করেন জেল কর্মকর্তারা।
বুধবার সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকসহ আশপাশে কয়েকশ’ মানুষের ভিড়। কারো হাতে কাপড়-চোপড়, আবার কারো হাতে খাবারের পোটলা। তাদের সবাই কারাবন্দি স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রতীক্ষা করছেন।
এদের একজন মাতুয়াইলের গৃহিণী মিনহাজ সালেহা। তিনি জানান, ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাত ৯টায় তার কলেজপড়ুয়া সন্তান যাত্রাবাড়ী কোচিং সেন্টারে সহপাঠীদের সঙ্গে প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফিরছিল। এ সময় সাদা পোশাকে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। খবর পেয়ে তিনি ছেলের কলেজের আইডিকার্ড ও বেতন বই নিয়ে থানায় গেলেও পুলিশ তাকে পাত্তা দেয়নি। ছেলেকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে হলে অন্তত ১০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে পুলিশ তাকে সাফ জানিয়ে দেয়। কিন্তু রাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় তার ছেলেকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়া হয়।
সালেহার অভিযোগ, তার ছেলের সঙ্গে তার দুই বন্ধুকে পুলিশ আটক করেছিল। এদের একজন তার দামি মোবাইল ফোন সেট এবং অপর একজন নগদ ৭ হাজার টাকা দিয়ে পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন। তিনি জানান, তার ছেলেকে পুলিশ বাসার সামনে থেকে তুলে নিয়ে সন্দেহভাজন নাশকতাকারী হিসেবে আদালতে চালান দিয়েছে। সেখানে জামিন না হওয়ায় কারাগারে তার ঠাঁই মিলেছে। মুক্তারের অভিযোগ, ছেলে কারাগারের কোথায় আছে তা জানতেই কারারক্ষীদের ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এর পর রুটি-বিস্কুট ও সাবান-ক্রিম পাঠাতে আরো ২০০ টাকা গেছে।
এদিকে গত বুধবার সকালে মহানগর মুখ্য হাকিম (সিএমএম) আদালতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। এদের একটি বড় অংশ এসেছেন আগের রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তারকৃত স্বজনের জামিন নিতে।
শ্যামপুরের বাসিন্দা মনোয়ারা খাতুন জানান, তার স্বামী শাহজাহান মিয়া তরিতরকারি ফেরি করে বিক্রি করেন। গত শুক্রবার রাতে কদমতলী এলাকা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে ভাংচুর ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় চালান দেয়।
মনোয়ারার অভিযোগ, ঘটনার পরপরই তার স্বামীকে ছেড়ে দেয়ার জন্য পুলিশের এক সোর্স ৫ হাজার টাকা দাবি করে। ওই টাকা দিতে না পারায় তার স্বামীর বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা দেয়া হয়েছে।
পল্লবী থেকে আসা আজাহার উদ্দিন তার ছেলের জামিন নেয়ার জন্য আদালতে এসেছেন জানালেও এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তার সঙ্গীয় এক স্বজন জানান, পুলিশ তার কলেজপড়ুয়া মেধাবী ছেলেকে কেন ধরেছে তার কৈফিয়ত চাইতে গিয়ে এ বিপাকে পড়েছেন। তাই এসব বিষয় নিয়ে কোনো অভিযোগ করতে গিয়ে নতুন ঝামেলায় জড়াতে চান না। তবে সুযোগ বুঝে আইনজীবীরা হরতাল-অবরোধে গ্রেপ্তারকৃতদের জামিন করানোর জন্য মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন আজাহার উদ্দিনের সঙ্গীয় ওই স্বজন।
এ ব্যাপারে সিএমএম আদালতের প্রবীণ আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, গাড়ি ভাংচুর, বোমা হামলা ও অগি্নসংযোগসহ যে কোনো ধরনের নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের আদালত জামিন দিচ্ছে না। কিন্তু বিষয়টি তাদের অভিভাবকরা বুঝতে চাইছেন না। তাই তারা স্বজনের জামিনের আশায় এক আইনজীবী ছেড়ে আরেক আইনজীবীকে ধরছেন। এ সুযোগে কিছু দালাল তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্ক হাতিয়ে নিচ্ছে। কাউকে জামিন করিয়ে দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে কোনো আইনজীবী কখনই কারো কাছ থেকে টাকা নেন না বলে দাবি করেন মাহবুবুর রহমান।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে কারা ফটক, আদালত প্রাঙ্গণ ও জেলখানাতে উপচেপড়া ভিড় থাকলেও বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের অধিকাংশ সক্রিয় নেতাকর্মীর ঘর এখন ফাঁকা। গ্রেপ্তার আতঙ্কে তারা সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেছেন। এমনকি হয়রানির ভয়ে তাদের অনেকেরই বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্ত্রী-সন্তানও ঘর ছেড়েছেন।
ঢাকা মহানগর বিএনপির থানা পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে জানান, গত দু’সপ্তাহে পুলিশ চারবার তার বাসায় হানা দিয়েছে। তাকে না পেয়ে তার কলেজপড়ুয়া ছোটভাইকে ধরে নিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর তার দুই ভাই ও বাবা অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়েছেন। এরপরও পুলিশ বাসায় এসে তার মা ও বোনকে গালিগালাজ করে গেছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির ওই নেতা।
ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকা ছাত্রদলের এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ এখন যাকেই ধরছে, তাকেই বোমাবাজ কিংবা গাড়িতে অগি্নসংযোগকারী বলে আদালতে চালান দিচ্ছে। এ ধরনের কোনো মামলা দিতে না পারলে সন্দেহজনক নাশকতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। তাই দলের নেতাকর্মী সবাই রাজপথ থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। ওই নেতার ভাষ্য, সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। বৈধ পথে যেতে না পেরে অনেকেই চোরাপথে ভারতে গিয়ে অবস্থান করছেন।








