জাপা মন্ত্রীদের সরে যেতেই হচ্ছে

0
76
Print Friendly, PDF & Email

মন্ত্রিসভা থাকা না থাকা নিয়ে স্বামী এরশাদ ও স্ত্রী রওশন এরশাদের মধ্যে ‘বিরোধ নাটক’ হলেও মৌখিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় জাতীয় পার্টির ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে সরে যেতেই হচ্ছে। অল্পদিনের মধ্যেই তাদের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে মন্ত্রিসভা থেকে সরে গেলে তাদের জন্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির ৪টি পদের আবদার করা হয়েছে। পার্টির একাধিক নেতা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টি থেকে ৩ জন মন্ত্রী নেয়া হবে এবং তারা এক বছর মন্ত্রিত্ব করতে পারবেন জাপার সঙ্গে এমন মৌখিক চুক্তি করা হয় বলে সূত্রের দাবি। ওই চুক্তির পর নির্বাচনে দলের অংশগ্রহণের পথের কাঁটা এইচএম এরশাদকে চিকিৎসার অজুহাতে সিএমএইচ-এ নেয়া হয়। আর রওশন এরশাদই পরামর্শ দেন। ওই মৌখিক চুক্তি এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যাশা অনুযায়ী মন্ত্রিসভা থেকে জাপাকে সরে আসতেই হচ্ছে। জাপা নেতারা জানান, রওশন যে মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ হলেও ‘ঘোষণা কার্যকর’ হবে। ৪/৫ মাস আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ হবিগঞ্জের এক সভায় মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সদস্যরা বের হয়ে আসবেন এমন ঘোষণা দেন। অতঃপর রংপুরেও তিনি একই বক্তব্য দেন। কিছুদিন পর তিনি জানান, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এরশাদের এ ধরনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন জাতীয় সংসদের গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। রওশন স্পষ্ট জানান, জাপার মন্ত্রীরা পদত্যাগ করবেন না। আর এরশাদ যা বলছেন তা তার ব্যক্তিগত দলের চেয়ারম্যানের নয়। এ ঘটনায় এরশাদের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধীদলীয় চিপ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙার তর্কবিতর্ক হয় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে। এরশাদকে তারা আগে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ থেকে পদত্যাগ করার দাবি জানান। এরশাদকে নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেয়ায় মশিউর রহমান রাঙ্গা ও তাজুল ইসলামকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ দেয়া হয়। রাঙ্গার হাত থেকে রংপুর এবং তাজুলের হাত থেকে কুড়িগ্রাম জেলার নেতৃত্ব কেড়ে নেয়া হয়। আবার কাজী ফিরোজ রশিদকে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করানো হয়। দলের অভ্যন্তরে তখন থেকে এই ইস্যুতে বিরোধ চলে আসছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি রওশন এরশাদ সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির সদস্যদের ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এইচএম এরশাদ মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসা ইস্যুতে এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। তিনি স্ত্রী রওশন এরশাদের এমন ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এইচএম এরশাদ বলেছেন, এ ব্যাপারে রওশনের কথা বলার এখতিয়ারই নেই। এ বিষয়ে এরশাদ গণমাধ্যমকে বলেন, যে সংবাদ সম্মেলনটি রওশন করেছে তা আমাকে জানিয়ে করেনি। এ ব্যাপারে অনুমতিও নেয়া হয়নি। দলের কেউ এ বিষয়ে কিছু জানে না। এটা করা তার ঠিক হয়নি। সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিসভা থেকে জাপা সদস্যের প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণার পর ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ফোন করে জানান তাজুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু পানি সম্পদমন্ত্রী আনিস অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন ম্যাডাম বললেই আমরা পদত্যাগ করবো কেন? আমরা কী তার কথায় পদত্যাগ করবো? রওশন এরশাদকে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের এ বক্তব্য জানানো হলে রওশন এরশাদ স্পষ্ট করে বলেন, দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতেই হবে। প্রধানমন্ত্রীও চান জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা পদত্যাগ করে দলটি প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালন করুক। জাপার সূত্রে জানা গেছে সরকার থেকেই চাপ দেয়া হচ্ছে জাপার সদস্যদের মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে। আর এ জন্য বেগম রওশন এরশাদ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির ৪টি পদ চেয়ে আবেদনও করেছেন। মৌখিক চুক্তির মেয়াদ শেষে মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসা, রওশন এরশাদের সরকারের ইচ্ছার পুতুল খেলা, মহাসচিবের ব্যর্থতা এবং স্বামী-স্ত্রীর বিরোধে দলের অনেকেই খুশি। যারা এরশাদের নির্দেশ মেনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তারা মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসতে হচ্ছে এ খবরে দারুণ খুশি। যারা নানা কারণে বঞ্চিত-অবহেলিত তারাও চাচ্ছেন সরকার থেকে বের হয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে। তারা চাচ্ছেন জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাতে। আবার গোলাম মহিসকে সউদী আরবের রাষ্ট্রদূত করার পর কয়েকজন নেতা চাচ্ছেন তাদেরও বিভিন্ন পদ-পদবিতে বসানো হোক। মহাসচিব হিসেবে ১ জানুয়ারি সমাবেশ ফ্লপ করায় জিয়াউদ্দিন বাবলুর মাথায় সরকারের যে আশীর্বাদের হাত তুলে নেয়া হয়েছে। রওশন এরশাদ অনেক আগেই বাবলুকে ওই পদ থেকে সরানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু এরশাদ যোগ্য মহাসচিব খুঁজে পাচ্ছেন না। সূত্র জানায়, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণেই জাতীয় পার্টির ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরাতে চায় সরকার। দেশ-বিদেশে বিএনপির বিকল্প বৃহৎ দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে তুলে ধরতে চায়। সে জন্যই ১ জানুয়ারি ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নানাভাবে সহায়তা করা হয়। মহাসচিব হিসেবে জিয়াউদ্দিন বাবলু ১০ লাখ লোকের সমাবেশ করার ঘোষণা দেন। কিন্তু সমাবেশে উপস্থিতি ছিল ১০ হাজারেরও অনেক কম। এ জন্য বাবলুর ওপর ক্ষমতাসীনরাও বিরক্ত। জাপা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে এরশাদ সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় বিপাকে পড়ে যায় আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তারা এরশাদের বিকল্প হিসেবে তার স্ত্রী রওশন এরশাদের শরণাপন্ন হন। তারা নির্বাচন করলে ক্ষমতার শেয়ার দেয়ার প্রস্তাব দেন। রওশন এরশাদ জানান, এরশাদ বাইরে থাকলে তিনি দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। অতঃপর তার পরামর্শেই এরশাদকে চিকিৎসার জন্য সিএমএইচএ নেয়া হয়। সে সময় নির্র্বাচনের পর সরকার গঠনে এক বছরের জন্য মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টি থেকে সদস্য নেয়া হবে জানানো হয়। তখন ২০০৬ সালে মতিঝিলের জীবন বীমা টাওয়ারে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ক্ষমতায় গেলে এরশাদকে প্রেসিডেন্ট করা হবে আবদুল জলিল ও রুহুল আমিন হাওলাদারের এমন চুক্তির কথা বলা হলেও ওপর মহলের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সে ধরনের লিখিত চুক্তির প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়। অতঃপর এরশাদের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হলেও পছন্দের ব্যক্তিদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করা থেকে বিরত থাকে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী এক সদস্য জানান, ভোটের আগের দিন ৪ জানুয়ারি এক জেলা প্রশাসন তাকে ফোন করে বলেন, স্যার আপনি যদি শপথ নিতে রাজি হন তাহলে আপনাকে এমপি করা হবে। আমি শপথ নিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে আর এমপি করা হয়নি। ওই নেতা জানান, সরকার এবং বিরোধী দল এ বিতর্কের অবসানের জন্য হলেও মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সদস্যদের সরে আসা উচিত।

শেয়ার করুন