ট্রেন-কাভার্ড ভ্যান সংঘর্ষ : নিহত ৬

0
81
Print Friendly, PDF & Email

রাজধানীর কমলাপুরে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) ভেতরে ট্রেনের সাথে কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ১০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন আইসিডির ভেতরের লাইন দিয়ে কমলাপুর স্টেশনে প্রবেশের প্রাক্কালে দ্রুতগতির একটি কাভার্ড ভ্যান তার বগিতে আঘাত করলে এ ঘটনা ঘটে। লরির আঘাতে ট্রেনের একটি বগি উল্টে যায়। লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে ইঞ্জিন ও আরো কয়েকটি বগি। খবর পেয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ ঘটনাটি তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি কাভার্ড ভ্যানের চালককে আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৫ ঘণ্টা এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায় লরির চালক ও হেলপার। নিহতরা হলেনÑ নাইম ইসলাম সিকদার (১৬), মজিবুর রহমান (৬০), আলমগীর হোসেন (৫০), ইসমাইল হোসেন (৪৫), অজ্ঞাত পুরুষ (৪০) ও অজ্ঞাত মহিলা (৩০)। এর মধ্যে নাইম ইসলাম ও অজ্ঞাত পুরুষ (৪০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি চারজনের মৃত্যু হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর। আহতরা হলেনÑ নাসির (২৫), বাবুল (৪০), গোলাম মোস্তফা (২৫), বিল্লাল হোসেন (২৫), আবুল কালাম (২৭), জাবেদ (৪৫), হারুন (৪০), জিন্নাত আলী (২৫), সুমন (২৬) ও আনসার সদস্য মিজানুর রহমান (২৫)। নিহতদের সবাই ট্রেনের যাত্রী। গতকাল সরেজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে আইসিডিতে গিয়ে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনের ১ ও ২ নম্বর বগি লাইনের বাইরে কাত হয়ে পড়ে আছে। ১ নম্বর বগির এক সাইড ভেঙে তার মধ্যে কাভার্ড ভ্যানের মাথা ঢুকে রয়েছে। ট্রাকের ইঞ্জিন, চেসিস ও বিভিন্ন পার্টস ভেঙে চুরমার হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেখানেই কথা হয় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে ঢাকা আসা আবুল কাশেমের সাথে। তিনি ট্রেনের ২ নম্বর বগির ছাদের ওপর বসেছিলেন। কাশেম জানান, ট্রেনটি আইসিডির কাছে পৌঁছলে গেট খুলে দেয়া হয়। ট্রেনটি প্রবেশ করে কিছু দূর এগিয়ে যায়। এমন সময় আইসিডির ভেতরে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যান পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যেতে রেললাইন পার হতে রওনা দেয়। ভ্যানের গতি ছিল খুব বেশি। ভ্যানটি সজোরে ইঞ্জিনের সাথে লাগানো ১ নম্বর বগিতে আঘাত করে। এতে বগিটির পূর্ব পাশ ভেঙে ট্রাকের মাথা বগির মধ্যে ঢুকে যায়। এতে ১ ও ২ নম্বর বগি কাত হলে তিনিসহ ছাদে থাকা কয়েকজন যাত্রী নিচে পড়ে যান। তিনি আরো বলেন, ইঞ্জিন চালু থাকায় ট্রেনটি ভ্যানটি নিয়েই সামনের দিকে এগোতে থাকে। প্রায় ৫০ গজ দূরে গিয়ে ট্রেনটি থেমে যায়। ৩ নম্বর বগিতে থাকা সাবেদুল হক বলেন, ভ্যানটি বগির এক সাইড ভেঙে যাত্রীদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই দু’জন যাত্রী মারা যান। তিনি বলেন, আমি প্রায় প্রতিদিন ট্রেনে করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ যাওয়া-আসা করি। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ট্রেনটি আইসিডির ভেতর দিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাওয়া-আসা করে। ট্রেন এলে আইসিডির গেট খুলে দেয়। ট্রেন ভেতরে প্রবেশ করলে রেললাইনের দুই পাশে আনসার সদস্যরা লাল পতাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে ওই সময়ের মধ্যে আইসিডি গ্রাউন্ডে থাকা কোনো ট্রাক, লরি বা অন্য কোনো যানবাহন ট্রেন লাইনে উঠে না পড়ে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আবার ট্রাকগুলো চলাচল শুরু করে। তিনি বলেন, গতকালও ট্রেন টিটিপাড়া হয়ে দক্ষিণ কমলাপুর আসার পর গেট খুলে দেয়া হয়। কিন্তু রেললাইনের দুই পাশে পতাকা হাতে কোনো আনসার সদস্যকে দেখা যায়নি, যার কারণে পূর্ব দিকের গ্রাউন্ডে থাকা এনএস কার্গো সার্ভিস নামে একটি কাভার্ড ভ্যান দ্রুতগতিতে রেললাইনের পশ্চিম দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। ট্রেনের ইঞ্জিন পার হওয়ার পরই প্রথম বগিতে আছড়ে পড়ে। তবে মিজানুর রহমান নামে অপর এক যাত্রী জানান, তিনি দেখেছেন ডিপোর আনসার সদস্যরা ট্রেন দেখে ভ্যানের চালককে থামার সঙ্কেত দিয়েছিলেন। কিন্তু চালক না থামিয়ে ট্রেনের লাইন পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর চোখের পলকে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এ ঘটনায় আহত আনসার সদস্য মিজানুর রহমান হাসপাতালে নয়া দিগন্তকে বলেন, ঘটনার সময় তিনি ও আবদুল হান্নান (২৪) নামে অপর এক আনসার সদস্য সেখানে ছিলেন। মিজানুর বলেন, আইসিডির ভেতরে রেললাইনের দুই পাশে গেট বেরিয়ার নেই। ট্রেন এলে কেউ লাল পতাকা দিয়ে সিগন্যাল দেন। গতকালও ট্রেন প্রবেশ করতেই দুই পাশে দু’জন লাল পতাকা নিয়ে সিগন্যাল দিচ্ছিলেন। কিন্তু ওই কাভার্ড ভ্যান তাদের সিগন্যাল অমান্য করে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করে। তিনি আরো বলেন, ভ্যানচালক ভেবেছিল দ্রুতগতিতে গেলে ট্রেন পৌঁছার আগেই তিনি রেললাইন পার হতে পারবেন। কেননা এ স্থানটিতে ট্রেন সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতে চলে, যার কারণে ভ্যানটি এত জোরে ট্রেনের ওপর আচড়ে পড়ে ট্রেনের লোহার বগির এক সাইড ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায়। তিনি বলেন, ভ্যানচালকই এ ঘটনার জন্য দায়ী। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ভ্যানচালক হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, নয়তো তার গাফিলতি ছিল। যার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এর সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাজমুল হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত রিপোর্ট পেশ করবে। মন্ত্রী আরো বলেন, এ ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার ব্যয় রেল মন্ত্রণালয় বহন করবে। এরপর বিকেল সোয়া ৫টায় মন্ত্রী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত যাত্রীদের দেখতে যান। আহতদের মধ্যে পাঁচজনকে ২০ হাজার টাকা করে চিকিৎসাসহায়তা দেন। হাসপাতালে নিহত নাইম ইসলাম সিকদারের খালু আবদুর রশিদ জানান, নাইমের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জের খোদাবক্সকাঠি গ্রামে। তার বাবার নাম ইউনুস আলী। নাইম স্থানীয় নেসারাবাদ মাদরাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র। গত ১০ দিন আগে কমলাপুরের তাদের বাসায় বেড়াতে আসে। তিন দিন আগে খালার বাসা থেকে মাসুদ নামে তার এক খালাতো ভাইয়ের নারায়ণগঞ্জের বাসায় বেড়াতে যায়। গতকাল ওই বাসা থেকে ট্রেনে করে আবার তার বাসায় ফিরছিল। নিহত মজিবুর রহমানে বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। তার স্ত্রী সখিনা বেগম জানান, মজিবুর ব্যানারের দুই পাশে ব্যবহৃত কাঠি তৈরি করে তার ব্যবসায় করতেন। তার বাসা পল্লবীর ৭ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি। গতকাল ভোর ৪টার দিকে কাঠি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে যান। সকাল ৯টার দিকে মোবাইলে তার সাথে কথা হয়। এ সময় তিনি সখিনাকে বলেন, মাল বিক্রি হয়ে গেছে। ট্রেনে ফিরে আসব। তিনি সখিনাকে আরো বলেন, মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরে কথা বলব। এ সময় সখিনা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার স্বামীর আর বাসায় ফেরা হলো না’। নিহত আলমগীর হোসেনের নাম পাওয়া গেলেও তার অন্য পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহত অজ্ঞাত (৩০) পুরুষের পরনে ছিল চেক লুঙ্গি, চেক শার্ট ও কালো জ্যাকেট। অজ্ঞাত পুরুষের (৪০) পরনে ছিল চেক লুঙ্গি, চেক শার্ট সোয়েটার, অজ্ঞাত (৩০) মহিলার পরনে ছিল প্রিন্টের সালোয়ার কামিজ। কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি আবদুল মজিদ জানান, ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে নেয়ার পর আরো চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় কাভার্ড ভ্যানচালককে আসামি করে জিআরপি থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে ভ্যানচালক পলাতক রয়েছেন। তবে এনএস কার্গো সার্ভিসের সাথে যোগাযোগ করে ওই চালককে খুঁজে বের করা হবে। তা ছাড়া এ ঘটনায় চালকও আহত থাকতে পারেন। তার খোঁজে পুলিশ মাঠে নেমেছে। তিনি আরো বলেন, ধারণা করা হচ্ছে ভ্যানটি কোনো হেলপারকে দিয়ে চালানো হচ্ছিল।

শেয়ার করুন