খালেদা জিয়া গ্রেফতার! মাহমুদুর রহমান মান্না

0
48
Print Friendly, PDF & Email

৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি সংবাদ দিয়ে আমার আজকের লেখা শুরু করছি। ২ তারিখে আমি রংপুর ছিলাম, একটি নাগরিক সমাবেশে বক্তৃতা করেছিলাম। বাংলাদেশ প্রতিদিন সেই বক্তৃতার উপরে একটি সংবাদ ছেপেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘ডিসেম্বরেই খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠাবে সরকার’। এই শিরোনামটি আমার আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য। শিরোনামটি ভুল ছিল তা বলছি না। তারপরও একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন, যা আমি বক্তৃতায় বলেছি কিন্তু পত্রিকা বলেনি। গত ৪৩ বছরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মিলে দেশ শাসন করেছে তিন দশক। শুরুতে দল দুটির মধ্যে এত বৈরিতা ছিল না। বিএনপির জন্ম নিয়ে আওয়ামী লীগ শুরু থেকে প্রশ্ন তুলত। যদি দলটা বড় না হতো, ক্ষমতার ভাগিদার হয়ে না বসত তাহলে হয়তো সম্পর্কটা এত দূর গড়াত না। আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্বই হয়তো মুখ্য, কিন্তু কোনো সময়ই যে তাদের মেলেনি এমন নয়। এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা যুগপৎভাবে লড়াই করেছে, স্বৈরতন্ত্রের পতনের পরে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে গিয়ে দুই দল একসঙ্গে ভোট দিয়ে সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনও করেছে। কিন্তু অতঃপর যখন থেকে দুই দল ক্ষমতার প্রশ্নে পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন থেকে তাদের দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। অভিযোগের সুতীক্ষ্ন তীরটি প্রথমে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছোঁড়া হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বলা হয়েছে দখলদার, শেখ মুজিবের হত্যাকারী। বিএনপির পাল্টা আক্রমণ বলতে তেমন কিছু ছিল না। তারা তখন নিজেদের ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছে এই বলে যে, জিয়া কোনোভাবেই মুজিব হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি এমনকি ক্ষমতা দখল করার উদ্দেশ্যে তেমন কিছু করেনওনি, পরিস্থিতি তাকে ক্ষমতার দিকে ডেকে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে হয়তো একটা বিতর্ক হতে পারত, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য মূল্যবান হয়ে দাঁড়াতে পারত কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্ক বলতে তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। এর নৈতিক সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে কখনো খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। ফলে বিতর্কের নামে যা হয়েছে তা মূলত অশ্লীল কাদা ছোড়াছুড়ি, নগ্ন হৃদয়হীন ক্ষমতার লড়াই। দেশে এখন সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালু আছে। সংসদের মূল দুটি খুঁটি ছিল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। কিন্তু তাদের ক্ষমতার কুৎসিত লালসার কারণে সংসদ কাজ করতে পারেনি। বিরোধী দলের অবশ্যম্ভাবী বর্জনের কারণে (তা যে দলই বিরোধী পক্ষে থাকুক না কেন) সংসদ সব সময় এক পাক্ষিক চলেছে। আর এখন সংসদে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। আওয়ামী লীগ ছলচাতুরী করে বিএনপিকে সংসদ থেকে বের করে দিয়েছে। তাতে কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকদের বলেছেন, এখন আর সংসদে অশ্লীল খিস্তিখেউড় হয় না। কিন্তু বাস্তবত সমস্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। যাকে সংসদ থেকে বের করে দিয়ে, তার জায়গায় মৎস্যকন্যার মতো এক বিরোধী নেত্রীকে বসিয়ে (মৎস্যকন্যা বলছি এই কারণে যে, মৎস্যকন্যার অর্ধেক মাছ আর অর্ধেক মানুষের মতো তার শরীরের অর্ধেক বিরোধী বেঞ্চে আর অর্ধেক মন্ত্রিসভায়) তিনি তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার চেষ্টা করছেন সেই বহিষ্কৃত বিরোধী নেত্রী এখন সরাসরি জনতার ময়দানে গিয়ে এদের অবৈধ দখলদার ইত্যাদি বলে সমালোচনা শুরু করেছেন। বাস্তবত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনের পরে এই সরকারকে নির্বাচিত তো আর বলা যায় না। অতএব মানুষ দলে দলে বেগম জিয়ার জনসভায় গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীকে তার মোকাবিলায় সংসদের বাইরে গিয়ে জনসভায় বক্তৃতা করতে হচ্ছে। এমনিতে যতই আত্মতৃপ্তির ভাব দেখানো হোক না কেন, সরকার যে স্বস্তিতে নেই তা তাদের আচরণ-উচ্চারণে স্পষ্ট। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সরকার পক্ষ পারলে বিরোধী দল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন, নিঃশেষ করে দেয়। আর বিরোধী দল এই সরকারকে যত তাড়াতাড়ি পারে ঝেটিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে দেয়। এ কথাগুলো আমি ওই সমাবেশে বলেছিলাম। ৫ জানুয়ারির প্রহসনে অংশগ্রহণ না করে যদি বিএনপি ট্রেন মিস করেই থাকে, আর যদি রাজনীতির গাড়িতে উঠতে নাই পারে তাতে আওয়ামী লীগের তো দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই। তারা বরং মৎস্যকন্যাকে নিয়ে সুখে ঘরকন্না করুক। তা না করে তারা ওই বহিষ্কৃত বিরোধী নেত্রীকে নিয়েই তাদের চর্চা অব্যাহত রেখেছে কেন? প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং গোটা সংসদ খালেদা জিয়াকে নিয়ে এত শোরগোল করছেন কেন? জিয়া অরফানেজের মাত্র কয়েক কোটি টাকার জন্য এই মামলাবাজি কেন? সরকারি দলের বন্ধুরা আমার ওপর রাগ করতে পারেন। বলতে পারেন, আপনি না ‘দুর্নীতিকে না’ বলে ক্যাম্পেইন করতে চান। তবে বেগম জিয়ার দুর্নীতিকে উপেক্ষা করতে চাইছেন কেন? আমার জবাব, আমি উপেক্ষা করতে চাইছি না। করুন, মামলা করুন। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী তো বেগম জিয়াকে বলছেন, আপনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন? সাহস থাকলে মামলা ফেস করুন। আমিও তা সমর্থন করছি। সঙ্গে সঙ্গে এও বলছি, সেই বিচার যেন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করুন। আপনারা যেভাবে নিজেদের সব মামলা তুলে নিয়েছেন, অথচ বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে জারি রেখেছেন তাতে তো সন্দেহ হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বিচার বিভাগের পৃথককরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এখন আর নিম্ন আদালত আর উচ্চ আদালতে কোনো পার্থক্য নেই। দেশের পুলিশ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আমি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ করেছি। এ জন্য হোক বা অন্য যে কোনো কারণে হোক, আওয়ামী লীগের বন্ধুরা আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি দুই নেত্রীকে একই পাল্লায় মাপেন। আমি হ্যাঁ বাচক জবাব দেই। আসলে আমি নৈর্ব্যক্তিক থাকার চেষ্টা করি। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রীর কথা যেমন উল্লেখ করলাম তেমনি এ প্রসঙ্গে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথাও উল্লেখ করতে চাই। তিনি এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, মিগ-২৯ মামলায় প্রধানমন্ত্রীর সাজা হতো। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, আপনার নামে ১৫টি মামলা ছিল। এই মামলাগুলো কেন উঠিয়ে নিলেন। নিরপেক্ষ কোর্টের মাধ্যমে ফেস করতেন, দেখতাম কত সাহস। বেগম জিয়া এখন দেশব্যাপী জনসভা করে বেড়াচ্ছেন। জনগণকে আন্দোলনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। আন্দোলনের ব্যাপারে তিনি এতটাই সিরিয়াস যে, তিনি তার দলের নেতাদের বলেছেন, আপনারা আন্দোলন না করলেও আমি একাই মাঠে নামব। জয়েন্ট সেক্রেটারি এবং তার নিচের লেভেলের সরকারি আমলাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে সারা দেশে জল্পনা-কল্পনা চাউর হয়ে গেছে। বিএনপি অবশ্য এ বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছে কিন্তু পর্যবেক্ষক মহল তাদের বিশ্বাস করছেন না। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মুখে শোনা যাচ্ছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর পার হলে আগামী বছরের শুরুতে বেগম জিয়া আন্দোলনে নামবেন। বিএনপির প্রাক্তন ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন, ১৮ ডিসেম্বর সরকার পতনের দিকনির্দেশনা দেবেন বেগম খালেদা জিয়া। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত রাজপথে নামতে পারে বলে সরকারের কাছে খবর আছে। সম্ভাব্য এ আন্দোলন কঠোরভাবে মোকাবিলায় বিরোধী দলের প্রতি আরও কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত আছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। প্রয়োজনে বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও গ্রেফতার হতে পারেন বলে জানা গেছে। এই শীর্ষ পর্যায়ের তালিকায় কি শীর্ষতম নেতাও আছেন? জিয়া অরফানেজ মামলায় বেগম জিয়ার করা আবেদনগুলো সব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর ওই মামলা পরিচালনায় এখন আর কোনো বাধা নেই। আর সেই বিচারে যদি বেগম জিয়ার শাস্তি হয়ে যায় তাতে অবাক হওয়া বোকামি হবে। দুটি বড় দলের এবং দুই শীর্ষতম নেতার এই বিধ্বংসী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বেগম জিয়া আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে গ্রেফতার হবেন, এরকম সম্ভাবনার কথা আমি বলেছিলাম। এটা কেবল সম্ভাবনার কথা। এরকম হবেই তা আমি কী করে বলব? আমি তো আর সরকার নই। কোর্ট কি আমার কথায় চলে? তবে এরকম হয়ে গেলে ‘তখন বিএনপির আর কিছু করার থাকবে না’ এরকম কথা আমি বলিনি। বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠালেই যে গণতন্ত্রের আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে এরকম হতে পারে না। বিএনপির কিছুই করার থাকবে না কেন? বরং সত্যি যদি সে রকম কিছু হয় তবে আন্দোলনের রুদ্ধ দুয়ার খুলেও তো যেতে পারে। কীভাবে? এসব নিয়ে পরে কোনো এক সংখ্যায়। লেখক : রাজনীতিক, আহ্বায়ক নাগরিক ঐক্য। ই-মেইল : [email protected]

শেয়ার করুন