প্রকল্পের ৬১ কোটি টাকা পানিতে ঢাকার রাস্তার ১৫৫ সিসি ক্যামেরা বন্ধ

0
42
Print Friendly, PDF & Email

রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ৫৯টি সংযোগ ও প্রবেশমুখে ১৫৫টি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। দূর থেকে সম্ভাব্য অপরাধ ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। কিন্তু চার বছর ধরে এগুলো বন্ধ পড়ে আছে। সার্ক ফোয়ারার মোড়ে গত ২৯ নভেম্বর বাসের ধাক্কায় সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী নিহত হন। এই মোড়েও দুটি সিসি ক্যামেরা আছে। সাধারণ ধারণা ছিল, এই সিসি ক্যামেরার চিত্র (ফুটেজ) থেকে সহজেই কোন বাস তাঁকে ধাক্কা দিয়েছিল তা শনাক্ত করা যাবে। কিন্তু গত সাত দিনেও বাসটি কেন শনাক্ত করা যায়নি, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, শুধু সার্ক ফোয়ারার মোড়ের ক্যামেরা দুটিই নয়, নগরের সব কটি সিসি ক্যামেরা আসলে বন্ধ আছে। মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলার সময় ক্যামেরাগুলো দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে (আন-অফিশিয়ালি) কিছু নজরদারি করা হয়েছে। এর পর থেকে এগুলো বন্ধ আছে। পুলিশ টেলিকম বিভাগ ঠিকাদারের কাছ থেকে সেগুলো বুঝেও নেয়নি। তবে প্রকল্পের ৭০ ভাগ টাকা তারা ঠিকাদারকে পরিশোধ করেছে। প্রকল্পের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরো রাজধানীকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনতে এবং ডিজিটাল বোর্ডের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সাত বছর আগে ২৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৬১ কোটি টাকা। চার বছর আগে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। কিন্তু পুলিশ প্রকল্পটি এখনো বুঝে নেয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে তাঁদের মধ্যে ভীতি রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো আইনি ঝামেলা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তাঁরা প্রকল্পটি বুঝে নিতে আগ্রহী নন। জানতে চাইলে পুলিশ টেলিকমের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নওসের আলী প্রথম আলোকে জানান, প্রকল্পটি বুঝে নেওয়া হবে কি না, সে ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর সিদ্ধান্ত দেবে। বর্তমান ব্যবস্থায় পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ শুধু ওয়্যারলেসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। পুলিশের এই কাজকে সহজতর ও গতিশীল করতে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৮) ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন কন্ট্রোল রুম আধুনিকায়ন’ নামে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো ও কেন্দ্রীয়ভাবে অপরাধ ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা, ট্রাফিক ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে রাস্তার যানজট পরিস্থিতি পথ ব্যবহারকারীদের জানানো, পুলিশের বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা এবং ওয়াকিটকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। প্রকল্পের কাজ পায় ফলেক কমিউনিকেশন্স নামের ব্রুনাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে প্রকল্পের জন্য ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও একপর্যায়ে তা এসে দাঁড়ায় ৪১ কোটি টাকায়। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের জন্য খরচ হয় আরও ২০ কোটি টাকা। সব মিলে খরচ দাঁড়ায় ৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। প্রকল্প বুঝে না নেওয়ায় বছরের পর বছর ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। ক্যামেরা ও ডিজিটাল বোর্ডগুলো রাস্তায় পড়ে আছে অবহেলায়। এগুলোর বিক্রয়োত্তর সেবার মেয়াদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে এই ৬১ কোটি টাকাই পানিতে যাবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফলেক কমিউনিকশন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি কাজী জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ফলেক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০১০ সালেই প্রকল্পের কাজ শেষ গেছে। এরপর তাদের দুই বছরের বিক্রয়-পরবর্তী সেবা দেওয়ার মেয়াদও শেষ হয়। এখন এ প্রকল্প নিয়ে তারা কোনো দায় নিতে চায় না। কার্যালয় গুটিয়ে চলে যেতে চায় তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্পটি ‘অনিষ্পন্ন’ রাখার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যা চেয়ে গত ২৯ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কোনো জবাব দেয়নি। জানতে চাইলে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন) গাজী মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজেও বিস্মিত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও কেন প্রকল্পটি বুঝে নেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘গ্রহণ-সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে প্রকল্পটি নিতে কোনো বাধা আছে বলে আমি মনে করি না।’ এই প্রকল্পের আওতায় ১৫৫টি সিসি ক্যামেরা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ৩১টি ট্রাফিক ডিসপ্লে বোর্ড লাগানো হয়। আবদুল গণি রোডে স্থাপন করা হয় (কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন) নিয়ন্ত্রণকক্ষ। এরপর ওই প্রকল্প থেকেই পুলিশকে দেওয়া হয় এক হাজার ২৩টি আধুনিক টেট্রা সিস্টেম-সংবলিত (টেরিস্ট্রিয়াল ট্রাংকড রেডিও) ওয়াকিটকি বা বেতার যন্ত্র, থানার ৩০টি টহল গাড়িতে স্থাপিত হয় স্বয়ংক্রিয় যান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় দেড় বছর এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে পুলিশ। এরপর সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রকল্পের সঙ্গে সূত্র জানায়, প্রকল্পের চুক্তিপত্র মোতাবেক কাজ হয়েছে িক না, তা দেখতে ১২ সদস্যের একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি করে পুলিশ। সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, যেভাবে প্রকল্পের নকশা করা হয়েছিল তা সঠিক ছিল নয়। শুরুতে ভাবা হয়েছিল পুরো ব্যবস্থাকে তারবিহীন (ওয়্যারলেস) করা হবে। ক্যামেরাগুলোতেও কোনো তার থাকবে না, চলবে বেতার তরঙ্গে। কিন্তু প্রকল্প শেষ করে দেখা গেল, উঁচু ভবনের কারণে বেতার তরঙ্গ বাধা পাচ্ছে। ফলে অনেকগুলো ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে, ওয়্যারলেসও কাজ করছে না ঠিকমতো। চলতি বছরের প্রথমদিকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি চালু করতে হলে তারের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। সেই অনুযায়ী, অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ স্থাপনের জন্য বিটিআরসির সঙ্গে চুক্তি করে পুলিশ। চুক্তি অনুযায়ী সব ক্যামেরা ও ডিসপ্লে বোর্ড সংযুক্ত করতে অপটিক্যাল ফাইবার বসানোর জন্য পাঁচ কোটি টাকা দেওয়া হয় বিটিআরসিকে। এ বছরের মার্চ মাসে বিটিআরসি অপটিক্যাল ফাইবারের কাজ শেষ করে। এবার সবকিছু ঠিকমতো কাজ করছে িক না, তা দেখার জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি গত ১৮ মার্চ তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সবকিছু সচল আছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর শুরু হয় প্রকল্প গ্রহণ করা নিয়ে চিঠি চালাচালি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) শহরের কিছু স্থানে নিজের মতো করে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে। কিন্তু সে ক্যামেরা ব্যবহার করে কী সুফল পাওয়া গেছে, তা সুনির্দিষ্ট করে কেউ জানাতে পারেনি। পুলিশের গণসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কাজ চালানোর জন্য কিছু ক্যামেরা বসিয়েছি।’ যোগাযোগ করা হলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) এএসএম শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, যে উদ্দেশ্যে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলো, পুলিশের সমন্বয়হীনতার কারণে তার সুফল পেল না নগরবাসী। আর জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর মতো অনেক মৃত্যু, দুর্ঘটনার বা গুরুতর আইন অমান্যের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার সুযোগও থাকল না। এর জন্য যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

শেয়ার করুন