চাঁদা না দিলে কমিটি বিলুপ্ত

0
98
Print Friendly, PDF & Email

ক্ষমতায় না থাকলে হতাশায় দ্বন্দ্ব আর ক্ষমতায় থাকলে আখের গোছানোর দ্বন্দ্বে খুনোখুনি: বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতিটাই এমন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলে এখন এই চিরচেনা দ্বন্দ্বই চলছে। বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের কমিটি হচ্ছে না। আর ছাত্রলীগে স্বার্থের দ্বন্দ্বে চলছে কমিটির ভাঙাগড়া। অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বনিবনা না হলেই শাখা কমিটি ভেঙে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি। কমিটিতে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে অনুগতদের বসানো হচ্ছে।

এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, গত ১০ জুলাই পল্টন ও রামপুরা থানা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এভাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছাত্রলীগের বিভিন্ন শাখা কমিটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। মূলত চাঁদার ভাগ না দেয়ার কারণেই নানা অভিযোগে কমিটি ভেঙে অনুগতদের ভারপ্রাপ্ত করে সংগঠন চালানো হচ্ছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন কমিটির নেতার সঙ্গে কথা এমন তথ্য জানা যায়।

ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতারা এভাবে চাঁদাবাজি শুরু করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ নিচের সারির নেতাদের।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, যেসব কমিটি চাঁদা দিবে না, তাদের কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে অনুগত লোকজনকে কমিটিতে স্থান দিয়ে চাঁদার ভাগ নেয়া হবে।

সূত্রে আরো জানা যায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের অনুসারী। তাই বর্তমান ছাত্রলীগের কমিটি বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে দক্ষিণের অন্তর্গত কমিটিগুলো বিলুপ্ত করে তাদেরকে দুর্বল প্রমাণ করারও একটা কৌশল এখানে কাজ করছে।

সম্প্রতি ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার অন্তর্গত ৯টি থানার কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি হলো- পল্টন, রামপুরা, গেণ্ডারিয়া, যাত্রবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে এসব কমিটি বিলুপ্তি করা হয়েছে বলা হলেও আসলে নিয়মিত চাঁদার ভাগ না দেয়ার কারণেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ। কিন্তু এ অঞ্চলের কোনো কমিটি বিলুপ্ত করার সময় মহানগর কিছুই জানায়নি কেন্দ্রীয় কমিটি। কী কারণে এসব কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে জানতে চাইলে দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শেখ আনিসুজ্জামান রানা বাংলামেইলকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে কেন্দ্র থেকে কিছু জানায়নি। কিন্তু কেন কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে আমি নিজেও কিছু জানি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকদিন আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম আমাকে ফোন করেন। তিনি পল্টন থানার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে বলে আমাকে জানান। আমি তাকে বলি, যে বিল্ডিং নিয়ে ঝামেলা তা আমি নিজেই সমাধান করে এসেছি। এরপরও কেন কমিটি বিলুপ্তি করা হয়েছে আমি জানি না।’

গত ১০ জুলাই বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অন্তর্গত রামপুরা ও পল্টন থানার কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু কমিটি বিলুপ্ত করার আগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডাকার নিয়ম থাকলেও তাদের কিছুই জানানো হয়নি।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তরের অন্তর্গত ২৮টি থানার মধ্যে ৬টি থানার কমিটি নেই। এগুলো হলো- মিরপুর, দারুল সালাম,পল্লবী, রূপনগর, কাফরুল।

অপরদিকে ঢাকা মহানগর নিয়ন্ত্রণ করে মহানগর উত্তর ছাত্রলীগ। কেন এ কমিটিগুলো করা হয়নি জানতে চাইলে মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক রানা বলেন, ‘এ থানাগুলো নতুন হযেছে, তাই এসব থানার কমিটি দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে আশা করি, খুব দ্রুত থানাগুলোর কমিটি দেয়া হবে।’

ছত্রলীগ সূত্র জানায়, বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক শাখা ১০১টি। এর মধ্যে কমিটি আছে মাত্র ৪০টির মতো।

সারা দেশে সব সাংগঠনিক কমিটি দিতে না পারলেও দেশের বাইরে কিন্তু ঠিকই কমিটি দিয়ে এসেছেন ছাত্রীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। যুক্তরাজ্য, অস্টেলিয়াসহ বিদেশে বেশ কয়েকটি কমিটি দিয়ে এসেছেন সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।

ছাত্রলীগের সূত্রে জানা যায়, চাঁদাবাজি, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে যে সব কমিটি বিলুপ্তি করা হয়েছে বলে কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে। মূল কারণ চাঁদার ভাগ বাটোয়ারা। যদি শৃঙ্খলা ভঙের কারণে কমিটি বিলুপ্তি করা হয় তাহলে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরও কীভাবে বহাল থাকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি- এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

সূত্র জানায়, আখের গোছানোয় সবার চেয়ে বেশি এগিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে বিভিন্ন থানার কাছে চাঁদা চেয়েছেন তিনি। যারা চাঁদা দেবে না তাদের ঢাকা মহানগর থানা কমিটিগুলোর ভাগ্য বরণ করতে হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঈদের পরে পুরো দেশে ছাত্রলীগের অনেক কমিটি বিলুপ্ত করা হবে। কারণ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ। তাই কেন্দ্রীয় নেতারা আখের গোছাতে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম চাঁদা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করে বাংলামেইলকে বলেন, ‘চাঁদা না দেয়ায় এসব কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে এ অভিযোগ সঠিক নয়। যেসব কমিটি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে তাদের বিলুপ্ত করা হয়েছে। এসব কমিটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যে মারমারি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘সর্বশেষ যে কমিটি বিলুপ্তি করা হয়েছে এর মধ্যে রামপুরা থানার ছাত্রলীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, এলাকায় মাদক ব্যবসা, দেহ ব্যবসায় জড়তি থাকার অভিযোগ রয়েছে। যার কারণে এ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর পল্টন থানার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল।’

উল্লেখ্য, বর্তমান ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয় ২০১১ সালের ১১ জুলাই। ২০১৩ সালের ১০ জুলাই ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর ছাত্রলীগের কোনো কাউন্সিল হয়নি।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের প্রথম ভাগের ১১ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকাল দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। অন্যথায় নির্বাহী সংসদের কার্যকারিতা লোপ পাবে।

গঠনতন্ত্রের প্রথম ভাগের ১১ (গ) ধারায় বলা আছে, বিশেষ বা জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় অনুমোদন সাপেক্ষে কমিটির কার্যকাল তিন মাস বৃদ্ধি করা যাবে। ওই সভায় প্রতিটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা যোগ দেবেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো জরুরি সভা আহ্বান করেননি।

শেয়ার করুন