সরকার পতন আন্দোলনে জামায়াতের ব্যাপক প্রস্তুতি

0
35
Print Friendly, PDF & Email

ঈদ পরবর্তী সরকার পতন আন্দোলনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছে। রমজানে আন্দোলনের পূর্ববর্তী প্রস্তুতি হিসেবে সংগঠনটি ইতোমধ্যে অর্থ সংগ্রহ, সাংগঠনিক মানোন্নয়ন ও জোরালো আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা থেকে নেতা-কর্মীদের জামিন করানোসহ বেশ কিছু কাজ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধ মামলায় আটক দলের শীর্ষ নেতাদের মামলার রায় ঘোষণা করা হলে, রায় নিজেদের পক্ষে না আসলে সেক্ষেত্রেও ব্যাপক আন্দোলনের প্রস্তুতি রয়েছে দলটির। আর সরকারের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে দলটির নেতারা বলছেন- এটি স্রেফ অপপ্রচার।

দলীয় সূত্র জানায়, সরকারের দমন-নিপীড়নের মাঝেও থেমে নেই জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম। ঈদ পরবর্তী সরকারবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জামায়াত। নানা কৌশলে দলটি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছে। গোটা রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে দলের অবস্থান ও সার্বিক অবস্থা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে তুলে ধরছে জামায়াত। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় জামায়াত কয়েকটি ইফতার মাহফিল সম্পন্ন করেছে। গত ৩ জুলাই বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিশিষ্টজনদের সম্মানে ইফতার মাহফিল করে দলটি। ৯ জুলাই রাজনীতিকদের নিয়ে ইফতার করেছে জামায়াত। ওই ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠনসহ প্রতিদিন কোনো না কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মানে রাজধানীতে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছে জামায়াত। আর এসব ইফতার মাহফিলে বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি সন্তোষজনক হওয়ায় নেতাকর্মীরা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠছেন।

রাজধানী ছাড়াও মহানগরী, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রতিদিন জামায়াতের পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে।

রমজানে ইফতারের পাশাপাশি যাকাত আদায়ে ব্যস্ত দলটি। যাকাত ফান্ডের অর্থ আগামী দিনে আন্দোলনের কাজে লাগাতে চায় জামায়াত নেতারা। তাছাড়া যারা ইতোপূর্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের মাঝেও এই অর্থ বিতরণ করা হবে বলে দলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রমজান মাসে সাংগঠনিক মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। সারাদেশে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ‘বিশেষ প্রশিক্ষণ’র ব্যবস্থা করা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে। এসব প্রশিক্ষণে জামায়াত আগামী দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনের বার্তা ‘রুট লেভেল’ পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে।

এছাড়া সাবেক শিবির নেতাদের নিয়ে এরইমধ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত। তাদেরকে আন্দোলনে একাত্ম করতে চায় দলটি।

আর দলের নেতাকর্মীদের মামলা থেকে জামিনের জন্য রমজান মাসে বিশেষভাবে সংগঠনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সে মোতাবেক কাজও চলছে।

রমজানের আগে গত মে মাসে জামায়াত সারাদেশে কর্মী-সমর্থক বাড়ানোর জন্য মাঠে নামে। সেক্ষেত্রে সন্তোষজনক সাড়া পাওয়া গেছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মে মাসে প্রত্যেক কর্মী ও দলের বিভিন্ন পদের দায়িত্বশীলরা তাদের এক মাসের উপার্জিত অর্থ সংগঠনকে দান করেছে বলে জানা গেছে। দলের নেতা-কর্মীদের কল্যাণে এসব অর্থ ব্যয় করা হবে।

মে মাসে গোটা দেশকে অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা পর্যায়ে সফরও করেছেন। এক্ষেত্রে জেলা আমিররা সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী দিনে আন্দোলন বেগবান করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওই সফর ছিলো বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উপর ইসরায়েলি বর্বর হামলার বিষয়কে ইস্যু হিসেবে নিয়ে বেশ সোচ্চার রয়েছে জামায়াত। আগামী শুক্রবার কয়েকটি ইসলামী সংগঠনের মতো জামায়াতও সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রেও ব্যাপক লোক সমাগম হবে বলে আশাবাদ জামায়াত নেতাদের।

তথ্যানুসান্ধানে জানা গেছে, গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে জামায়াত রাজপথমুখি কর্মসূচি থেকে বাইরে ছিলো। এসময় তারা ঘর গোঁছানোর জন্যই মূলত ব্যস্ত ছিলো। উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের আবারো মাঠে নামানোর চেষ্টা করে আসছে দলটি। আর ওই নির্বাচনে বেশ সাফল্য পাওয়ায় নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা হতে শুরু করেন। এরপর থেকে সাংগঠনিক কর্মসূচি বৃদ্ধি করতে থাকে দলটি। রমজান মাসকে সাংগঠনিক মাস ঘোষণা করেছে জামায়াত।

এদিকে সম্প্রতি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা আপিল বিভাগে রায়ের জন্য বেশ কিছুদিন অপেক্ষমাণ থাকা ও ট্রাইব্যুনালে মতিউর রহমান নিজামীর রায় ঘোষণার কথা বলে দেরি করাসহ কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠে। তবে, এ গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।

ঈদ পরবর্তী সরকার পতন আন্দোলনের বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, জীবন দিয়ে হলেও ঈদের পর রাজপথে নেমে এ জালিম সরকারের পতন ঘটানো হবে। তত্ত্বাবধায়কের দাবি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের সরকার ক্ষমতায় আসবে।

তিনি আরো বলেন, জামায়াত রাজপথে ছিলো, আগামীতেও থাকবে। কিছুতেই জামায়াতকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখা যাবে না।

জামায়াতের আরেক কর্ম পরিষদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০  দলের শরিক দল হিসেবে ঈদের পর সরকার পতন আন্দোলন করার জন্য জামায়াত সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সরকার যে পর্যায়ে আন্দোলন করতে বাধ্য করবে সেভাবেই আন্দোলন করা হবে।

শুধুমাত্র সরকার পতন আন্দোলন নয়, অন্যায়ভাবে যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হলে সারাদেশ অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াত নেতা-কর্মীদের ওপর নানাভাবে দমন-নিপীড়ন শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিতে শুরু করে সরকার।

যুদ্ধাপরাধ মামলায় আটক করা হয় দলের শীর্ষ ১০ নেতাকে। ইতোমধ্যে সরকার দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে। দলটির সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আজমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় দিয়েছেন এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এখন আপিল বিভাগে কামারুজ্জামানের মামলার শুনানি চলছে। আর সাঈদীর মামলার রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। আরেক শীর্ষ নেতা একেএম ইউসুফ তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালে মারা যান।

এছাড়া দলটির আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। অন্যতম নীতিনির্ধারক এটিএম আজহারুল ইসলাম, মীর কাশেম আলী, মাওলানা আব্দুস সোবহানের বিচার কার্যক্রম চলছে।

অন্যায়ভাবে নেতাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে বলে বরাবরই অভিযোগ ছিলো জামায়াতের।

শেয়ার করুন