নগর বিএনপির নেতৃত্বে আব্বাসের উপর আস্থা পাচ্ছেন না তারেক

0
41
Print Friendly, PDF & Email

দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন পুড়ছে অবিশ্বাসের আগুনে। দলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। অনেকের আবার বুক ফাটে তো মুখ ফোটেনা অবস্থা। যেন বিশ্বাসঘাতক বা দলের স্বার্থ বিরোধীদের চিনলেও কিছু বলার নেই।

বিএনপির  রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনায় বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে ঢাকা মহানগর বিএনপি। কিন্তু বিগত সময় দেখা গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে মহানগর বিএনপি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্য। তাই বিএনপি চেয়ারপারসন আগামী দিনে সরকার বিরোধী আন্দোলনের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকা মহানগর বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় খালেদা জিয়ার দল গোছানো ঘোষণা কেবল ঘোষণা আকারেই রয়েছে। বাস্তবে এর কোনো কার্যক্রম এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

কিন্তু হঠাৎ করে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে মহানগর বিএনপির কমিটি শীঘ্রই করা হবে বলে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আবারো ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে মহানগর বিএনপির কিছু ত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে, ফলে সময়মতো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তাই এবার ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধন করে খুব শীঘ্রই মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। পরবর্তীতে মহানগরের প্রতিটি থানা ও ইউনিট কাউন্সিল ভোটের মাধ্যমে গঠন করা হবে।

দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কবে কখন মহানগর বিএনপি’র কমিটি নতুন করে ঘোষণা করা হবে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কেননা দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইসচেয়ারম্যান তারেক রহমান যৌথভাবে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে আমরা আশাবাদী ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধী আন্দোলনকে সফল করতে হলে খুব শীঘ্রই ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হবে। অন্যথায় আন্দোলন আন্দোলন করে মুখে বুলি ফোটালেও আন্দোলন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছে বিএনপির উচ্চ পর্যায়। তাদের ধারণা আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রাম হবে বিগত দিনের তুলনায় আরো কঠিন। কেননা পূর্বের আন্দোলন ছিলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর এখন একটি সরকারকে (যেভাবেই হউক ক্ষমতায়) ক্ষমতা থেকে বিদায় করার পাশাপাশি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তাই এই কঠিন মুহূর্তে এমন নেতৃত্ব দিতে হবে যারা আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে সফলতা বয়ে আনতে সক্ষম হবে।

তবে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট বিএনপির একটি প্রভাবশালী সূত্র শীর্ষ নিউজকে বলেন, আগামী দিনে সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে মির্জা আব্বাসের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না তারেক রহমান।

সূত্র জানায়, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন, আন্দোলনকে বেগবান করতে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব এমন একজনের হাতে দিতে হবে যে কিনা কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। তাই তৃণমূলে রাজনীতির ক্ষেত্রে মির্জা আব্বাস ততটা ফিট নয়।

মির্জা আব্বাসকে দায়িত্ব দেয়া হবে এমনটি জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির এক যুগ্ম আহবায়ক বলেন, খোকা ভাই যেভাবে কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন মির্জা আব্বাসের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এমনকি তিনি এ কথাও বলেছেন, ইচ্ছা করলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করা যতটা না সহজ তার চেয়ে কঠিন মির্জা আব্বাসের প্রটোকল ডিঙ্গিয়ে সাক্ষাৎ করা। তাই এমন লোককে তৃণমূলের দায়িত্বে আনা ঠিক হবে না।

সূত্র জানায়, মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে একেক সময় নাম উঠে এসেছে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বর্তমান আহবায়ক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। কিন্তু সম্প্রতি সাদেক হোসেন খোকা শারীরিক ভাবে অসুস্থ হওয়ায় এক সময়ে তারই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নামও শোনা যাচ্ছে মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জনগণ নির্বাচন থেকে দূরে ছিল এটা ঠিক। কিন্তু রাজনীতির কৌশলের কাছে বার বার হেরে বুঁদ হয়েছে বিএনপি। এখনও সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। মামলায় জড়িয়ে আছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধেও মামলা ঝুলছে। আন্দোলন করবেন কি, নেতাদের বেশির ভাগ সময় কাটে কোর্টের বারান্দায়। পুরনো মামলা সচল করে নেতাদের কাবু করে রাখা হয়েছে। আবার নড়াচড়া করলে জেলের দরজা খুলে যাবে। অসংখ্য নেতাকর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন জেল আর গুমের আতঙ্কে। এ সবের মধ্যে আন্দোলনের ডাক কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে বিএনপির ভেতরেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্বাসের ঘরে আগুন লেগেছিলো অনেক আগেই। প্রায় সাত বছর আগে যখন এক এগারোর ঝড় তছনছ করেছিলো বিএনপিকে। সেই সময়ের মতো সংস্কারপন্থী আর সংস্কার বিরোধী প্রকাশ্য গ্রুপ না থাকলেও দলাদলি থেমে নেই। বিএনপিতে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকেই সরকারের সুবিধাভোগী বা সরকারের হয়ে কাজ করেন বলে মনে করেন তৃণমূলের কর্মীরা। অনেককে মনে করা হয় শুধু নিজেদের স্বার্থই বড় করে দেখেন, দলের নয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শুধু তৃণমূল নয়। দলের অনেক নীতিনির্ধারক প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। তারা স্পষ্টতই বলছেন, বিএনপিতে দালাল এবং সুবিধাভোগীরা এখন সক্রিয়।

জানা যায়, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন ফেরাতে না পারা এবং সেই সময় আন্দোলনে চূড়ান্ত ফল না পাওয়ার পেছনে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কারও কারও বেঈমানীকে দায়ী করেন বিএনপি তৃণমূল কর্মীরা। বিএনপির আন্দোলন কৌশল খুব গোপন রাখার চেষ্টা করার পরও তা সরকারের কাছে পৌঁছে দিতো কেউ কেউ।

এ বিষয়ে বিএনপির নীতি নির্ধারণীর একজন সদস্য শীর্ষ নিউজকে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাব্ইে মনে করি গত কয়েক বছরের মধ্যে যারা বিএনপিতে থেকে দল বিরোধী কাজ করেছ তাদের শাস্তি না দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গিয়েছে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বিএনপিতে সুবিধাভোগীরা কখনও বেগম খালেদা জিয়া আবার কখনও তারেক রহমানের নাম বিক্রি করে তাদের সুবিধামতো অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেন।

এদিকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন তবে কি ফের ভুল পথে হাঁটছে বিএনপি। নতুন করে আন্দোলনের কথা বলছেন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রায় প্রতিদিনই ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে বলছেন ঈদের পরই চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হয়ে যাবে। তারা তাদের প্রিয় নেত্রীর কাছে দাবি করেন তাহলে অতীতের ব্যর্থতাগুলোর কি হবে? এগুলোর কি কোন পর্যালোচনা বা মূল্যায়ন হয়েছে।

যত দূর জানা যায়, এ রকম কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি। এমন কি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও এ নিয়ে কোন মূল্যায়ন বৈঠকে মিলিত হননি। ভুলে ভরা ছিল নিকট অতীতের আন্দোলন। নির্বাচন ঠেকানোর কোন চেষ্টাই সফল হয়নি। সরকার তার পথেই এগিয়েছে এবং সফল হয়েছে।

আন্দোলন করে কি লাভ হবে আক্ষেপ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান শীর্ষ নিউজকে বলেন, কেন ২৯শে ডিসেম্বর ‘গণতন্ত্র মার্চ’ সফল হয়নি। নেতারা কোথায় ছিলেন। তাদের ফোন কেন বন্ধ ছিল। এসএমএস বার্তায় কি ছিল, যা পেয়ে নেতাকর্মীরা গাঢাকা দিয়েছিলেন। শত নির্যাতন-নিপীড়ন-ভয়ভীতি উপেক্ষা করে যেসব নেতাকর্মী ঢাকায় এসেছিলেন তাদের খোঁজ কেউ নেননি কেন?

তিনি বলেন, সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে একটি দল যে চলে না তার তো প্রমাণ দেখা যাচ্ছে বিএনপিতে। জেলা কমিটি গঠনের উদ্যোগ কেন বন্ধ হয়ে গেল তা নিয়ে নানা যুক্তি শোনা যায়। আসল কারণ হচ্ছে কেউই এখন নেতৃত্বে আসতে চাইছেন না। তাদেরকে ভয় আর আতঙ্কে পেয়ে বসেছে।

শেয়ার করুন