সংশোধন হচ্ছে সংবিধান

0
33
Print Friendly, PDF & Email

সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনছে সরকার। বর্তমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের স্থলে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃস্থাপিত করা হবে। এর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা ফিরে পাবে জাতীয় সংসদ। একই সঙ্গে এই সংশোধনীর ফলে রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ সংসদ বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ একে অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। ইতিমধ্যে সংবিধান সংশোধনের খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন শুধু আইনমন্ত্রীর মতামত পেলেই খসড়াটি যে কোনো দিন মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে পুরোপুরি গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে।

অবশ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেই নাই যে সংবিধান সংশোধন হবে। এটা এখনো দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে কাজ করতে। তিনি বলেন, একদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হোক সেটা যেমন আমরা চাই না, তেমনি বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতার বিষয়টাও আছে। বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই এটা আছে। আমাদের এখানেও ১৯৭২-এর সংবিধানে ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ১৯৭২ সালের সংবিধান সংশোধন করে এটা বাদ দিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ সংসদ সদস্য ও আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘৭২-এর মূল সংবিধানে যেটা ছিল সেটা তো ভালোই ছিল। তিনি বলেন, ব্যাসিক থাকা উচিত। তিনি জানান, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবিধান সংশোধন করতে চান। এই পরিবর্তনটা আগেই করা উচিত ছিল। এখন করলেও ঠিক আছে। এটা ভালো। সুরঞ্জিত সেন বলেন, জিয়াউর রহমান ‘৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন করেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। সরকারদলীয় একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য মনে করেন, সংসদকে স্বার্বভৌম করা উচিত। সংসদ স্বার্বভৌম না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় না। বর্তমান সরকার সংসদকে স্বার্বভৌম করতে চায় বলেই সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাবে। সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে বর্তমান সংসদের আগামী অধিবেশনে একটি বিল উত্থাপিত হতে পারে। তবে এ সম্ভাব্য সংশোধনী সংবিধানের ১৫তম সংশোধনের সময় করা হলে সরকারের জন্য ভালো হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন। আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংসদ বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ যার যার এখতিয়ার ভুলে একজন আরেকজনের কর্মকাণ্ডে ঢুকে পড়েছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করছে এবং অযাচিতভাবে নির্বাহী বিভাগের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের অনেক বিষয়ে স্থগিতাদেশ দিয়ে কাজ ঝুলিয়ে দিচ্ছে। সূত্র জানায়, তিন বিভাগের দায়িত্ব সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু তিনটা বিভাগ ওভারলেপিং করলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে না। এ কারণেই বিষয়টি বার বার ঘুরে ফিরে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকেও সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে একাধিক সিনিয়র মন্ত্রী আলোচনা করেন। ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের বিষয়টি দেখার জন্য আইনমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন।

সূত্র জানায়, এর পর পরই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ফাইল ওয়ার্ক শুরু করে। একটি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে সংবিধান সংশোধনের খসড়াটি প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এটি আইনমন্ত্রীর মতামতের অপেক্ষায় আছে। ইতিবাচক মতামত পেলেই শীঘ্রই এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা রক্ষা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ‘বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর। সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট ৯৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে- (২) এই অনুচ্ছেদের নিম্নরূপ বিধানাবলি অনুযায়ী ব্যতীত কোনো বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করা যাইবে না। (৩) একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে ‘কাউন্সিল’ বলিয়া উলি্লখিত হইবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাহাদের লইয়া গঠিত হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, কাউন্সিল যদি কোনো সময়ে কাউন্সিলের সদস্য এইরূপ কোনো বিচারকের সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করেন, অথবা কাউন্সিলের কোনো সদস্য যদি অনুপস্থিত থাকেন অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে কার্য করিতে অসমর্থ হন তাহা হইলে কাউন্সিলের যাহারা সদস্য আছেন তাহাদের পরবর্তী যে বিচারক কর্মে প্রবীণ তিনিই অনুরূপ সদস্য হিসেবে কার্য করিবেন। (৪) কাউন্সিলের দায়িত্ব হইবে- (ক) বিচারকগণের জন্য পালনীয় আচরণ বিধি নির্ধারণ করা; এবং (খ) কোনো বিচারকের অথবা কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন সেইরূপ পদ্ধতি ব্যতীত তাহার পদ হইতে অপসারণযোগ্য নহেন এইরূপ অন্য কোনো পদে আসীন ব্যক্তির সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করা। (৫) যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোনো বিচারক- (ক) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে অযোগ্য হইয়া পড়িতে পারেন, অথবা

(খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

(৬) কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন। (৭) এই অনুচ্ছেদের অধীনে তদন্তের উদ্দেশ্যে কাউন্সিল স্বীয় কার্য-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করিবেন এবং পরওয়ানা জারি ও নির্বাহের ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের ন্যায় উহার একই ক্ষমতা থাকিবে।’

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি প্রতিস্থাপন করা হবে। মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, (২) প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অনূ্যন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না। (৩) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত বা প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন। সূত্র জানায়, যদি ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রতিস্থাপিত হয় তাহলে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা পাবে সংসদ।

শেয়ার করুন