চট্টগ্রামে ২০ কোটি টাকার সরকারি বাড়ি আত্মসাৎ–চেষ্টার অভিযোগ

0
111
Print Friendly, PDF & Email

চট্টগ্রামে অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্তত ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি সরকারি বাড়ি আত্মসাতের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। বাড়িটি সরকারের আবাসন দপ্তরে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) বিকল্প বাসভবন হিসেবে তালিকাভুক্ত। আবু মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নামের ওই কর্মকর্তা ১০ বছর আগে অবসর নিলেও বাড়িটির দখল তো ছাড়েননি, নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করিয়েছেন বলে সিআইডির তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক বিদ্যুৎ কুমার বড়ুয়া আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছেন, আবু মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সিভিল অ্যাফেয়ার্স অফিসার (উপসচিব) পদে কর্মরত থাকাকালে বরাদ্দের জন্য আবেদন করলে বাড়িটি অস্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেয় জেলা আবাসন বোর্ড। নুরুল ইসলাম ২০০২ সালের ১ নভেম্বর বাড়িটিতে বসবাস শুরু করেন। ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি অবসরে যান। ওই বছরের ৯ আগস্ট বাড়ি ছাড়ার আদেশ হয়। কিন্তু তখন থেকে বাড়িটি দখলে রেখেছেন সাবেক ওই সরকারি কর্মকর্তা। কোনো ভাড়াও দিচ্ছেন না।
আলোচ্য বাড়িটি হচ্ছে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর মৌজার নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ৩ নম্বর সড়কের ৫৪ বি-২ নম্বর বাড়ি। সিআইডির প্রতিবেদনে ১৮ শতক জমির ওপর একতলা বাড়িটির মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ২০ কোটি টাকা। তবে এলাকার বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী তা আরও অনেক বেশি বলে স্থানীয় লোকজন জানান।
আদালতে মামলা হলে এ নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পেরেছে, বাড়িটি দখল করতে অধিগ্রহণের আগের মালিকের ওয়ারিশদের দিয়ে মালিকানা দাবি করে মামলা (নম্বর ৩১০/০৪) দায়ের করানো হয়। ইতিমধ্যে তাঁদের সঙ্গে বায়না দলিলও রেজিস্ট্রি করে নেন ওই সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু প্রতিশ্রুত টাকা না পেয়ে পরে তাঁরা ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করেন।
গত ২৬ জুন আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় তাদেরও একটি অনুলিপি পাঠায় সিআইডি। সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মুসলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোটি টাকা মূল্যের একটি সরকারি বাড়ি বছরের পর বছর অবসরে যাওয়া এক সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ দখলে রাখার বিষয়টি সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে।’
বাড়িটির ইতিবৃত্ত: তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান আমলে গভর্নরের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অধিগ্রহণ করে বাড়িটি নাসিরাবাদ কো-অপারেটিভ সোসাইটির অনুকূলে হস্তান্তর করেন। স্বাধীনতার পর এটি খাস সম্পত্তিতে পরিণত হলে বাংলাদেশ সরকার পিও নম্বর ১৬/১৯৭২ মূলে তা পরিত্যক্ত সম্পত্তি ঘোষণা করে এবং বাড়িটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় আসে। আরএস জরিপমূলে সম্পত্তিটির মালিক ছিলেন আনু মিয়া নামের এক ব্যক্তি। কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আনু মিয়ার ওয়ারিশ মোহাম্মদ আলী, পাকিজা খাতুন ও আনোয়ারা বেগমকে দিয়ে বিএস খতিয়ান শুদ্ধির জন্য মামলা দায়ের করান। ওই কর্মকর্তা সব মামলা চালানোসহ সম্পত্তির মূল্য ১৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করে মোহাম্মদ আলী গংয়ের সঙ্গে বায়না দলিল করেন (নম্বর ৪৩৭৬)।
এদিকে চট্টগ্রাম আবাসন বোর্ড বাড়িটি উচ্ছেদের মাধ্যমে খালি করার উদ্যোগ নিলে নুরুল ইসলাম তা ঠেকাতে হাইকোর্টে রিট (মামলা ৪৩৯৩/১৩) করেন।
আনু মিয়ার ওয়ারিশ মোহাম্মদ আলী মারা গেছেন। তাঁর বোন আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে জানান, সরকারি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম তাঁর ভাইকে (মোহাম্মদ আলী) দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করান। বায়নার সময় এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ১০ হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা চাইলে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হয়।
‘আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই মামলা’: সিআইডিকে দেওয়া আবাসন পরিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বায়না দলিল সম্পর্কে অবগত নয় বলে তাঁরা কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেননি। এতে বলা হয়, অবৈধ বসবাসকারী সরকারি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম রিট পিটিশন করায় প্রতীয়মান হয়, বাড়িটি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে এবং তাঁরই যোগসাজশে বর্ণিত মামলাগুলোর উদ্ভব হয়েছে। আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে রিট পিটিশনের জবাব তৈরি করে হাইকোর্টে দাখিল করার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তির পর প্রামাণিক ভাড়া আদায় করা হবে।
সরকারি সম্পত্তি কীভাবে বায়না দলিলে রেজিস্ট্রি হলো, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার মুশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বায়না দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সবকিছু দেখা হয় না। বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় সব কিছু যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়।’
বক্তব্য জানতে গত মঙ্গলবার আবু মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের কাছ থেকে মুঠোফোন নম্বর নিয়ে ফোন করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বাড়িতে থাকব না ছাড়ব, সেটা নিয়ে পত্রিকার মাথাব্যথা কেন। সিআইডি কী প্রতিবেদন দিল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যা হওয়ার উচ্চ আদালতে হবে।’ এ কথা বলে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।

শেয়ার করুন