বিশেষ দূত এরশাদের দিনকাল

0
42
Print Friendly, PDF & Email

দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হতে চললেও কার্যত কোনো কর্মকাণ্ড নেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। বিশেষ দূত হিসেবে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে অফিস ও জনবলও পেয়েছেন তিনি। পাচ্ছেন পূর্ণ মন্ত্রী মর্যাদার প্রটোকল। শুধু নেই কোনো কাজ। কাজকর্ম না থাকায় বিশেষ দূত হিসেবে অলস সময় কাটাচ্ছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে ভিসার আবেদন করে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া এবং এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় ব্যক্তিগতভাবেও অসন্তুষ্ট তিনি। তবে নিজের অবস্থান ও ব্যস্ততার জানান দিতে একের পর এক দলীয় কর্মসূচির পেছনে সময় দিচ্ছেন এরশাদ। ১২ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা শপথের দিনই এ দায়িত্ব পান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ সময়ের মধ্যে বিশেষ দূত হিসেবে কতটুকু বা কী দায়িত্ব পালন করেছেন কিংবা সরকারিভাবে তার দায়িত্বটাই আসলে কী_ এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে উদ্যোগ না নেওয়ায় চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত এরশাদ। জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জানান, জাতীয় পার্টির সরকার আমলে স্যারের (এরশাদ) ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার দখল করেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি এখনো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সরকার তাকে কাজে লাগাতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ আবারও শ্রমবাজার দখল করতে সক্ষম হবে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে এইচ এম এরশাদ কয়েকটি দেশের ভিসার জন্য আবেদন করেছেন। তবে পাননি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীন সফরে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু কোনো অদৃশ্য কারণে তা হয়নি। তিনি নিজে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পরও মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখন কুয়েতের ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু গত ছয় মাসে এ পদের সংশ্লিষ্ট কোনো কাজই করতে পারেননি এরশাদ। যেতে পারেননি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের কোনো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে। এত দিন দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল ছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে। কিন্তু এবার খোদ এরশাদের মনেই ক্ষোভ জেগেছে তাকে নিয়ে সরকারের এ রহস্যময় আচরণে। নতুন সরকারের অর্ধেক বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাকে কোনো দেশে সফরে যেতে বলা হয়নি। যদিও এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ জাপান ও চীন সফর করে এসেছেন। সরকারের একাধিক মন্ত্রী, এমপি ও প্রতিনিধি দলও ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচ এম এরশাদ সংসদ ভবনে একটি অত্যাধুনিক অফিসসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেলেও তার বিশেষ দূত পদের কাজটা কী, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত পরিষ্কার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সরকারের আচরণে অসন্তুষ্ট এরশাদ। জাপার একাধিক সূত্র জানায়, ১২ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর এরশাদকে যখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো তখন দলের নেতা-কর্মীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। কেউ কেউ বলেছেন, এরশাদ সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সেনাপ্রধান ও একটানা নয় বছর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সেই এরশাদ কীভাবে বিশেষ দূতের একটি পদ পেয়ে সন্তুষ্ট? নেতা-কর্মীদের এসব তির্যক আলোচনা-সমালোচনার পর এরশাদ জানান কেন তিনি বিশেষ দূতের পদ পেয়ে সন্তুষ্ট। এ পদ নিয়ে তার পরিকল্পনার কথাও জানালেন। বললেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। এ ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে ওইসব দেশে জনশক্তি রপ্তানিসহ দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করবেন। সে জন্য ১২ মার্চ তিনি হঠাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে কথা বলে জানতে চান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়েও কথাও বলেন। একই দিন দুপুরে এরশাদ সংসদ ভবনে তার নতুন অফিসও পরিদর্শন করেন এবং তিনি সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। এর কয়েক দিন পর এরশাদ তার নিজের বাসায় মধ্যপ্রাচ্যের সব রাষ্ট্রদূতের সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সর্বশেষ এপ্রিলে সৌদি আরব, কুয়েত ও চীন সফরের জন্য আবেদনও করেন।

এ ছাড়া শ্রমবাজারে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে পর্যায়ক্রমে তিনি আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ধনী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়নেরও চেষ্টা করেন। বিশেষ করে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত বিষয়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে বা সম্পর্কের ঘাটতি রয়েছে সেসব দেশের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছেন। কিন্তু এরশাদ যেসব দেশে সফরে যেতে আবেদন করেছেন সেসব দেশ থেকে এখনো তার বিদেশ যাওয়ার আমন্ত্রণ আসেনি। এর বাইরেও অনেক দেশের ভিসার জন্য আবেদন জানালেও কোনো সাড়া পাননি তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও এ ব্যাাপারে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে দৃশ্যত কোনো কাজ নেই তার। তবে সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষে ইদানীং সময় দিচ্ছেন এরশাদ। বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এসব সভা-সমাবেশে সরকারেরও কঠোর সমালোচনা করছেন তিনি।

শেয়ার করুন