রেস্তরাঁ হোটেলে ভেজালের ছড়াছড়ি, দেখার কেউ নেই

0
70
Print Friendly, PDF & Email

একটি ভবন গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী আর পুরানো আমলের খাদ্য পরীক্ষার যন্ত্রপাতি দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ঢাকায় বসবাসরত দেড় কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা। রাজধানীবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত একমাত্র খাদ্য পরীক্ষাগারটির প্রতি যেন কারও কোন গুরুত্বই নেই। এ নিয়েই চলছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) খাদ্য পরীক্ষাগারের কার্যক্রম। পরীক্ষার যন্ত্রপাতি বলতে তেমন কিছুই নেই। আধুনিক কোন প্রকার যন্ত্রপাতির দেখা মেলে না এ পরীক্ষাগারে। পুরানো জরাজীর্ণ কিছু লোহা-লক্কড়ের যন্ত্রপাতি রয়েছে যা দিয়ে বিশ্বের কোন বৃহত শহর তো দূরের কথা কোন ছোটখাটো শহরে বসবাসরত নাগরিকদের খাদ্য পরীক্ষা করা হয় না। সত্যিই এরকম খাদ্য পরীক্ষাগার বিশ্বের কোন শহরে পাওয়া মুশকিল। খাদ্য পরীক্ষাগারের এ পদ্ধতি সত্যিই আশ্চর্যজনক। ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নির্দিষ্ট কিছু কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ। কিন্তু এটি সংস্কার করে আধুনিক পদ্ধতিতে খাবার পরীক্ষা করা হবে বলে কর্তৃপক্ষের দাবি করলে কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের অর্ন্তগত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ের ওপর দিয়েই চলছে রাজধানীবাসীর খাদ্যের মান পরীক্ষা করার দায়িত্ব।
প্রায় দেড় কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্যপণ্যের মান এই পরীক্ষাগারের মাধ্যমে কতটুকু নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজধানীর প্রধান নাগরিক সেবা সংস্থা দুই সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নগরবাসীর খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা। নিয়মিত খাদ্য নমুনা সংগ্রহের কথা থাকলেও কর্মচারীদের তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। তাছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকা, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ না দেয়া ও অভিজ্ঞ পরীক্ষক না থাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আর জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে চলছে ঢাকার একমাত্র খাদ্য পরীক্ষাগারটি। নগরবাসীর মতে, কর্তব্যে অবহেলার পাশাপাশি নানামুখী সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কর্তব্য পালনে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলছে।
জানা যায়, নগরীর খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে ডিসিসির রয়েছে একটি স্বাস্থ্য বিভাগ। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে স্বাস্থ্য পরিদর্শক। যারা প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্টে গিয়ে নগরবাসীকে নিরাপদ খাদ্য প্রদানের লক্ষ্যে খাবার পরীক্ষা করবেন। কোন প্রকার ভেজাল পেলেই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন। প্রয়োজনে ব্যবসা বন্ধ করতে ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করবেন। করা হবে জেল জরিমানা। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি কর্পোরেশনের ১০টি অঞ্চলে রয়েছে সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, যাদের দায়িত্ব পরিদর্শকদের কার্যক্রম মনিটর করা। কিন্তু এই স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের ব্যাপারে অভিযোগের শেষ নেই। নমুনা আনলেও তা পরীক্ষা না করেই ফেলে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী খাবার পরীক্ষা করছে তা কারও চোখে পড়েছে এমন কোন নাগরিক পাওয়া যায়নি। দায়িত্ব পালনের কথা ভুলে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। ফলে অনায়াসে হোটেল, রেস্টুরেন্টগুলোতে ভেজাল খাদ্যপণ্য বিক্রি চলছে। রাস্তার ওপর ফুটপাথে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের জমিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যে কেউ হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করলেও তা যেন তাদের চোখে পড়ে না। স্থান ভেদে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা দিলেই যে কোন স্থানে ব্যবসার অনুমতি দিয়ে দেন এ পরিদর্শকরা।
নিয়মানুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি এলাকায় বৈধ হোটেলগুলোতে অস্বাস্থ্যকর কোন খাবার খাওয়ানো হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য হোটেল বা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে খাদ্য এনে পরীক্ষা করার কথা। কর্পোরেশন নিজস্ব অর্থে ওইসব হোটেল বা রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে একটি ভাগ স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের কাছে অন্য একটি ভাগ খাদ্য পরীক্ষাগারে আর অপর অংশটি হোটেল মালিককে দেবে। পরীক্ষার পর কোন ভেজাল পাওয়া গেলে ভেজাল খাদ্য বিক্রিকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় এতই নগণ্য যে ভেজাল খাদ্য বিক্রয়কারী অনায়াসেই পার পেয়ে যাচ্ছে। কালেভদ্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে গুটিকয়েক দোকানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, হোটেল, রেস্টুরেন্টগুলো যখন নিয়মিত মাসোহারা দিতে অস্বীকার করে, তখনই কেবল স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মামলা ঠুকে দেন। তাছাড়া নিয়মিত মাসোহারা প্রাপ্তদের এলাকায় এ সব স্বাস্থ্য পরির্দশকরা অভিযান পরিচালনা করতে তেমন একটা আগ্রহী হয় না। আর অভিযান পরিচালনা করলেও তেমন কোন জরিমানা করতে দেখা যায় না।
তাছাড়া পরীক্ষাগারের পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। অভিজ্ঞ পরীক্ষক নেই। নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল। খাবার পরীক্ষার জন্য নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করার কথা। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাত্র ১৬ জন নমুনা সংগ্রহকারী রয়েছে। তাদেরও আবার নিয়মিত খাবারের নমুনা সংগ্রহ করতে দেখা যায় না। ভেজাল খাদ্য পরীক্ষার পর জনসাধারণের মাঝে শাস্তির কথা প্রচারে কর্পোরেশন তেমন আগ্রহী নয়। মূলত খাদ্য পরীক্ষায় নিয়োজিত এ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবহেলা আর তাদের খেয়ালখুশি মতো কাজ চলছে এ প্রতিষ্ঠানটি। মাস শেষে নিয়মিত এ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন পেলেও নির্ধারিত সেবা পাচ্ছেন না বসবাসরত নাগরিকগণ।
খাদ্যপণ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নিয়ম থাকলেও কালেভদ্রে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। হোটেল, রেস্টুরেন্টগুলোর খাদ্যপণ্যের মান খারাপ হচ্ছে দিন দিন। মরা মুরগির মাংস আর কয়েকদিন আগের রান্না করা খাবার বিক্রি হচ্ছে নগরীর হোটেলগুলোতে- এমন অভিযোগ প্রায়ই লোকমুখে উচ্চারিত হচ্ছে। এ সব নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সংস্থাটি প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, খাদ্য পরীক্ষাগারটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। ভেজাল খাবারের সব আইটেমের পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। শুধু দুগ্ধজাত ও চর্বি জাতীয় খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। নগরবাসীর চাহিদা পূরণ করতে পরীক্ষাগারটিকে জনবল ও যন্ত্রপাতির দিক থেকে শক্তিশালী করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল-হারুন বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীকে দুই সিটি কর্পোরেশনে ভাগ করা হলেও পরীক্ষাগার মাত্র একটি। ফলে অনেক দায়িত্ব রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটির। সে অনুযায়ী তেমন ক্ষমতা নেই। জনবল সঙ্কট ও অভিজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে। এর পরও নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেজাল খাদ্য সরবরাহকারী ও ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাছাড়া খাদ্য পরীক্ষাগারটির বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য জনবল সঙ্কট, যন্ত্রপাতি ও আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ চলছে। পরীক্ষাগারটিকে শক্তিশালী করার জন্য সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। আশা করি ডিসেম্বর নাগাদ এটি সংস্কারের কাজ শেষ করা যাবে। তবে পর্যায়ক্রমে এ সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে।

শেয়ার করুন