’১৯ সালে মেট্রোরেল

0
36
Print Friendly, PDF & Email

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর ওই এলাকা ঘিরে হংকংয়ের আদলে একটি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা মাথায় রেখে সামনে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। রবিবার যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকাবাসী মেট্রো রেলের সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঢাকার সন্নিকটে পদ্মা সেতু এলাকা ঘিরে আন্তর্জাতিকমানের সম্মেলন কেন্দ্র, বাণিজ্যমেলা ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েনের পর নিজস্ব অর্থে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণ প্রকল্প পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেছে সরকার, যা আগামী চার বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, সেখানে আমরা একটা নতুন শহর গড়ে তুলতে পারি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে। সেখানে একটা ভাল কনভেনশন সেন্টার করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যমেলাটাও যদি ওখানে করতে পারি তাহলে ওই জায়গা উন্নত হয়ে যাবে। ওখানে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য ব্যবস্থা করতে পারি। ওই জায়গাটা জিরো পয়েন্ট থেকে কাছে- মাত্র ২৫ কিলোমিটার। কাজেই ওই জায়গাটায় আমরা নতুন একটা শহর গড়ে তুলতে পারি। যে শহরটা হবে হংকং বা ওই ধরনের। কাজেই সেভাবে আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর পাশেই মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের বাধায় সে পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। তবে তখন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মুন্সীগঞ্জের ওপারে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর পাশেই ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নতুন বিমানবন্দর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ দিন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে এসে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা ও নানা ধরনের ‘বাধা’ নিয়ে কথা বলেন। একবার বাধা এসেছে, বাধা অতিক্রম করেছি। সব সময় মনে রাখতে হবে আর যেন কেউ বাধা না দিতে পারে- সেভাবে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, আপনারা জানেন পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে অনেক তোলপাড় হয়ে গেল। সেটা আর কিছুই নয়, এখানে একটা অন্য ধরনের উদ্দেশ্য ছিল। পদ্মা সেতুর বিষয়ে একেবারে কোন কারণ ছাড়াই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাঁর যাওয়ার শেষ দিন- বোর্ডে যেটা এ্যাপ্রোভড হয় নাই, কিন্তু কোন একটা মহল বিশেষ যেখানে আমাদের দেশের কিছু লোক আছে, আমেরিকার তো আছেই, তাদের প্ররোচনায় এই সেতুতে বরাদ্দটা তারা বাতিল করল।
সম্ভাব্য দুর্নীতি হওয়া নিয়ে ‘শেষ মুহূর্তে’ বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিল করলে তা ‘চ্যালেঞ্জ’ করা হয় বলে জানান শেখ হাসিনা। যখন চ্যালেঞ্জ করলাম, কোন এভিডেন্স দিতে পারেনি। কার ডায়েরিতে নাকি লেখা আছে- কে কত পারসেন্ট পাবে। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তো অনেকেই দেখা করেছেন। তার কিছুদিন আগে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে আমার দেখা হলো। আমেরিকান এ্যাম্বাসেডার দেখা করেছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী-এমপি যাঁরা যখনই কেউ আসেন, সে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন। কনকো ফিলিপস কয়টা ব্লক পাবে কিনা, ওই আমরা তেলগুলো কিনব কিনা, অথবা তাদের গ্যাস ও বিদ্যুতের কয়েকটা কোম্পানি, তেল কোম্পানিগুলো কাজ ঠিকমতো পাবে কিনা? আমি উনাদের সরাসরি বললাম, আমার সঙ্গে আপনাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই দেখা করে গেলেন, আলোচনা করে গেলেন, আচ্ছা ঠিক আছে- আমি ডায়েরিতে লিখে নিচ্ছি অমুক অমুক দেখা করেছেন, এই প্রজেক্টের কথা বলেছেন, এই প্রজেক্টে অমুক অমুক এত পার্সেন্ট পাবে। এইটা যদি আমি ডকুমেন্টস হিসেবে নিই… আমাদের অফিসিয়ালরাও যখন যেখানে কথা বলতে যাবেন সবাইকে বলব ডায়েরিতে লিখে নিতে।’ পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করাটা ‘এত সহজ ছিল না’ বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এভাবে বাংলাদেশের ওপর বদনাম দিয়ে টাকা বন্ধ করে দেবে- এটা কখনও মেনে নেব না। যখনই আমরা বলেছি নিজস্ব অর্থায়নে করব, তখন আবার নানা শর্ত নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমরা শুরু করেছি। আপনাদেরও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যে কাজটা শুরু করেছি, কাজটা যেন আমরা দ্রুত করতে পারি।
এ সময় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ‘দ্বিমতের’ কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কথা এ জন্য বললাম যে, ১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর অনেক বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের বেশ দ্বিমত হয়। বিআরটিসি তারা বন্ধ করে দিতে বলেছিল। বিএনপি সরকার এসে বিআরটিসি বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমি এসে বললাম, না এটা হতে পারে না। আমরা বিআরটিসি চালু রাখলাম এবং এখন লাভজনক হয়েছে। একইভাবে খুলনা শিপইয়ার্ড, এটাও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন ছিল বন্ধ করে দেয়ার। আমরা বললাম বন্ধ করব না। সমস্যাটা আমাদের, দেশটা আমাদের, আমরা জানি আমরা কিভাবে করব। তাদের কয়েকজন লোক আসে, উনারা একটা প্রেসক্রিপশন দেবে আর সেটা আমাদের মানতে হবে- এটাও ঠিক না। আমাদের দেশের মানুষের মাথায় বুদ্ধি কম নাই যে তারা চিন্তা করতে পারবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালী পারে যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে। বৈদেশিক মুদ্রার আমাদের কোন অভাব নেই। ২১ বিলিয়ন আমাদের রিজার্ভ, এর মধ্যে এক-দুই বিলিয়ন খরচ করা কোন ব্যাপারই না। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীনের (বিসিআইএম) মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন ও অর্থনৈতিক করিডরের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই চারটি দেশ মিলে ইকোনমিক করিডর হয়ে গেলে কুনমিং পর্যন্ত আমরা যদি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি তাহলে বাণিজ্যের বিরাট সম্প্রসারণ হবে। পশ্চিম চীন পর্যন্ত আমরা সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারব।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নেপাল ভুটান যাতে ট্রানজিট পায় আমি ভারত বরাবর অনুরোধ করেছি এবং তারা রাজি হয়েছিল। আমরা এখানে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান ও বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল অর্থাৎ ত্রিদেশীয় একটা জোটের মতো করে সেখানে বিদ্যুত উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণে বিশেষভাবে নজর দিয়েছি। নেপাল, ভুটান এবং ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং আমাদের চট্টগ্রাম, মংলা এবং নতুন যে পায়রা বন্দর হচ্ছে এগুলো যাতে ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়েও তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এ যোগাযোগ স্থাপিত হলে অর্থনীতিতে ‘অবদান’ রাখবে আশা করে তিনি বলেন, সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট- ভুটানকে আমি প্রস্তাব দিয়েছি যে, তারা আমাদের এয়ারপোর্টও ব্যবহার করতে পারে। এই এয়ারপোর্টটা বিএনপি আমলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমরা আবার তা চালু করেছি এবং এটাকে আমরা আরও উন্নত করতে চাই। ভুটান আমাদের প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের ভাল সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশে সড়ক ও সেতু ভারি যানবাহন চলাচল উপযোগী এবং দীর্ঘমেয়াদের জন্য পরিকল্পনা করে তৈরি করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকাবাসী মেট্রো রেলের সুবিধা পাবেন। তিনি আরও জানান, দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৪১টি নতুন সেতু নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া সারাদেশে ১ হাজার ২৬৬ কিলোমিটার নতুন সড়ক তৈরি করা হবে।
এর আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ ১৯ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন তিনি। এরও আগে ২২ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পাদ মন্ত্রণালয়, ১৮ মে তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৫ মে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। ৭ মে বেসামরিক বিমান, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ১০ মে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ৩০ এপ্রিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেছেন তিনি। গত ১২ জানুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়, বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন শেখ হাসিনা। পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে কাজের অগ্রগতি ও এতে কোন সমস্যা থাকলে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেখবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন।

শেয়ার করুন