ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের হাতেও অত্যাধুনিক অস্ত্র

0
56
Print Friendly, PDF & Email

রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ওঠার পাশাপাশি বাড়ছে অস্ত্রের চাহিদা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন কারাগারে থাকলেও উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীরা এসব বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের মধ্যে চলছে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের হাতেও দেখা মিলছে অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন এসব অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে রাজধানীতে। ছোট খাটো ঘটনায়ও প্রতিপক্ষকে শক্তির জানান দিতে ব্যবহার হচ্ছে অত্যাধুনিক ছোট এবং হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের। প্রতিদিনই ঘটছে গুলির ঘটনা। হতাহতের ঘটনাও ঘটছে হরদম। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে সীমান্ত এলাকার অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এসব সন্ত্রাসী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরতে পুলিশ গ্রেফতারকৃত অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে চূড়ান্ত তালিকা করেছে। তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে চলছে তাদের গ্রেফতারে অভিযান। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে কয়েকজন। কিন্তু তারপরও থামছে না অস্ত্রের ব্যবহার। প্রতিদিনই রাজধানীতে গুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রটি জানায়, নিরাপদে রাজধানীতে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যেতে সন্ত্রাসীরা নারী, শিশু এবং ভুয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। এদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত এলাকা থেকে এসব অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে রাজধানীতে। সন্ত্রাসীরা রাজধানীকে নিজেদের মতো করে ভাগ করে নিয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাসীরা হালকা-ছোট বিদেশি পিস্তল বেশি ব্যবহার করছে। এসব অস্ত্র হালকা হওয়ায় তা বহনে সহজ।

রাজধানীতে অস্ত্রের ব্যবহার এতই বেড়ে গেছে যে, গত ২৮ দিনে এখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ২৭ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাও রয়েছেন। এসব অস্ত্রের উৎস এবং উদ্ধারে ডিবি পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ২০ জুন কাফরুল ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দেড় শতাধিক রাউন্ড গুলিসহ ৫টি বিদেশি রিভালবার। তারা মৌসুমি ফলের গাড়িতে ঢাকায় অস্ত্র এনেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নামের তালিকা পাওয়া গেছে।

তাদের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানীতে ১০টি সক্রিয় অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে কাজ করছে পুলিশ। এছাড়ও রাজধানীর কিছু ঘটনার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে এসব অস্ত্র ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের সুবিধার্থে এখনই তাদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করছে না পুলিশ।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীতে ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। চলতি মাসের সবকটি ঘটনায় পিস্তল ও রিভালবার ব্যবহার করেছে সন্ত্রাসীরা। এসব ঘটনায় বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের নতুন মডেলের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।

বিদেশি অস্ত্রগুলো অত্যাধুনিক হওয়ায় দাম বেশি হলেও পেশাদার সন্ত্রাসীদের কাছে তা খুবই পছন্দের। ইতালির তৈরি ‘পিট্রো বেরেটা’, আমেরিকার ‘স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন’ কিংবা স্পেনের ‘এস্ট্রা আনকেটা’র মতো অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের পিস্তল-রিভালবার এখন সব পর্যায়ের সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামধারী অনেক নেতাকর্মীও ক্ষুদ্রাকৃতির অত্যাধুনিক এসব অস্ত্র কেনাবেচা, ভাড়ার পাশাপাশি নিজের প্রভাব বিস্তারেও ব্যবহার করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছোট আকারের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মধ্যে ইতালির পিট্রো বেরেটা, স্পেনের এস্ট্রা আনকেটা, অস্ট্রিয়ার গ্লোক পিস্তল-১৭, ভোলকেনিক ভলিশনাল রিপিটার, ওয়ালদার পিপি, পিপিকে/এস পিস্তল, ফ্রান্সের ব্রাউনিং হাইপাওয়ার পিস্তলসহ আমেরিকার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) ব্র্যান্ডের কয়েকটি মডেলের রিভালবার-পিস্তল এদেশের সন্ত্রাসীরা বর্তমানে বেশি ব্যবহার করছে। এর বাইরে ভারতীয় পিস্তলও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিট্রো বেরেটাসহ বিদেশি ওইসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের মূল্য বৈধভাবে ৭০০ থেকে ১ হাজার ইউএস ডলার। অথচ এ অস্ত্রগুলোই বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের অন্ধকার জগতে অবৈধভাবে কেনাবেচা হচ্ছে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায়। ভারতীয় পিস্তল কেনাবেচা হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকায়। দেশে তৈরি পিস্তল-রিভালবার বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। এসব অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সন্ধানে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশ। পাশাপাশি কয়েকটি ঘটনার অস্ত্র ব্যবহারকারীদের গ্রেফতারেও পুলিশের অভিযান চলছে।

সন্ত্রাসী হামলার একাধিক ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। তা দিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এছাড়াও ইতোমধ্যে অস্ত্রসহ গ্রেফাতারকৃত সন্ত্রাসীদের জবানবন্দি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

কাফরুল থানা সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২০ জুন শুক্রবার রাতে কাফরুল থানার ওসি আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে একটি টিম শেওড়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে হুমায়ুন কবির বাবুকে ৫ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত বাবু গুলি বিক্রির জন্য শেওড়াপাড়ার রোকেয়া সরণি এলাকার গ্রিন ইউনিভার্সিটি এলাকায় অবস্থান করছিল। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই রাতেই তার দেওয়া তথ্যমতে কল্যাণপুরের ৩ নম্বর রোডের ৬/২ নম্বর বাসায় অভিযান চালিয়ে লিখন ও হায়দারকে ২টি জার্মানির তৈরি রিভালবারসহ গ্রেফতার করে পুলিশ।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাসার বিভিন্ন স্থান থেকে ১১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়েরের পর গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গ্রেফতারকৃত লিখনের বাবা মৃত রহমত উল্লাহ এবং হায়দারের বাবার নাম খলিল। হায়দারের গ্রামের বাড়ি যশোরের কোতোয়ালী থানার শেখহাটিতে। এছাড়া হুমায়ুনের বাবার নাম মহসিন। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া থানার গুলমাইজে।

কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম জানান, গ্রেফতারকৃত হায়দার যশোরের সীমান্ত এলাকা দিয়ে মৌসুমি ফলের গাড়িতে করে অস্ত্র এনে ঢাকায় লিখনের কাছে বিক্রি করতেন। লিখনের নিজস্ব বাড়ি কল্যাণপুর। এলাকায় তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তার ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। লিখনের বাসার নীচতলায় সাইবার ক্যাফেতে বসেই তারা অস্ত্র কেনাবেচার লেনদেন করতেন।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন লিখন দুটি অস্ত্র দেড় লাখ টাকায় হায়দারের কাছে বিক্রি করেন। লিখনের অস্ত্র বিক্রিতে সহায়তা করতেন হুমায়ুন কবির বাবু। এছাড়া মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় টিপু নামে আরো এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অস্ত্র কেনাবেচা করতেন লিখন। ঘটনার পর থেকে টিপু ও তার সঙ্গীরা পলাতক রয়েছেন।’

কাফরুল থানার ওসি আরো বলেন, টিপুও সীমান্ত থেকে অস্ত্র এনে ঢাকায় আরো কয়েকজনের কাছে বিক্রি করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

কাফরুল থানা সূত্রে আরো জানা গেছে, এই চক্রটিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের দেওয়া তথ্য থেকে মিরপুর ও যাত্রাবাড়ি এলাকার আরো কয়েকজন অস্ত্র ব্যবসায়ীর নামের তালিকা পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূলত তারা আম ও কাঁঠালের ট্রাকে করে বিশেষ কৌশলে অস্ত্র ও গুলি ঢাকায় এনে থাকে। ফলের গাড়ি হওয়ার কারণে এসব যানবাহন পুলিশি নজরদারির বাইরে থাকতো। এই সুযোগটাই তারা কাজে লাগিয়েছেন। সম্প্রতি তারা এ ধরনের তিনটি চালানে ২০টি বিদেশি ক্ষুদ্র অস্ত্র ঢাকায় আনে। এসব অস্ত্র তারা ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের কাছে বিক্রি করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহকারীদের একটি তালিকা উদ্ধার করা হয়েছে। ওই তালিকায় বেশিরভাগই ‘নতুন’ সন্ত্রাসী।

এদিকে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন ‘ভুয়া ডিবি’কে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে সীমান্ত শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বেশ কয়েকটি চক্র রাজধানীতে বিভিন্ন কৌশলে অস্ত্র সরবরাহ করছে।

গোয়েন্দা সূত্রে আরো জানা গেছে, অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে সীমান্ত জেলার কয়েকটি চক্র সক্রিয়। সীমান্ত থেকে ঢাকায় অস্ত্র আনতে তারা যাতে ধরা না পড়ে সে জন্য অস্ত্র ব্যবসায়ীরা প্রথমে কুমিল্লা ও মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি স্থানে জমা করে। দরদাম ঠিক হওয়ার পর সেখান থেকে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র সরবরাহ করে।

অনেক সময় অস্ত্র ভাড়াও দেওয়া হয়। রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার কয়েকটি এজেন্ট রয়েছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

শেয়ার করুন