অন্তর্দ্বন্দ্বে পুড়ছে বিএনপি

0
79
Print Friendly, PDF & Email

অর্ন্তদ্বন্দ্বে পুড়ছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে আন্দোলনে পড়েছে ভাটা। দলের পুুনর্গঠন প্রক্রিয়াও স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে করে দলটির সাংগঠনিক শক্তি একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। দলের এই দুরবস্থায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। পরিস্থিতি উত্তরণে দলের পোড় খাওয়া নেতারা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে।
অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বন্দ্বের কারণে ঢাকা মহানগর কমিটি পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে পারেনি বিএনপি। শুধু ঢাকা মহানগর কমিটিই নয়; চট্টগ্রাম মহানগর, সিলেট মহানগরসহ সারাদেশে ত্রিশটিরও বেশি জেলা কমিটিতে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। মূল দলের পাশাপাশি তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোরও বেহাল দশা। আন্দোলন সংগ্রামের মূলশক্তি ছাত্রদল ও যুবদলের সাংগঠনিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি’র একাধিক নেতা জানান-নেতৃত্বের কোন্দলে ছাত্রদল ও যুবদলও কার্যত নিষ্ক্রিয়। দলের এই দুরবস্থায় সরকার বিরোধী আন্দোলনে কতটা সফল হতে পারবে এনিয়ে খোদ বিএনপি’র মধ্যেই রয়েছে সন্দেহ-সংশয়। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাদের সন্দেহের বার্তা বিভিন্ন আলোচনা ও টিভি টক শো’র মাধ্যমে নানাভাবেই দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। বিএনপি’র অভ্যন্তরে একাধিক নেতার প্রশ্ন, গত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের আগে সরকার বিরোধী আন্দোলন যাদের কারণে সফল হয়নি তাদেরকে নেতৃত্বে রেখে ভবিষ্যতে কতটা সফলতা আসবে?
দল পুনর্গঠন-নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও আগামী আন্দোলন প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ইনকিলাবকে বলেন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বা প্রতিযোগিতা এমনটা বলা যায় না। বিএনপির মতো একটি বড় দলে পদ-পদবী পাওয়া এবং না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য চলে তোষামোদী-মোসাহেবী। কর্মীদের মন দখলের চেষ্টা ছেড়ে তোষামোদী করে পদ দখলের চেষ্টা চলে। বিএনপির মতো ক্ষমতামুখী একটি দলের মধ্যে এধরনের চেষ্টা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এতে সাংগঠনিক গতি অনেক সময় ব্যাহত হয়। আর আন্দোলনের ক্ষেত্রে অতীতে যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের উপর দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আস্থা যদি এখনও থাকে তাহলে তাদের উচিত নিজ থেকেই ব্যর্থতার দায় থেকে বেরিয়ে আসা। নিজ থেকেই তাদেরকে আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। তা না হলে শুধুমাত্র মোসাহেবী করে পদ ধরে রাখা যাবে না।
দলপুনর্গঠন এবং আন্দোলন প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ইনকিলাবকে বলেন, দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি অব্যাহত আছে। দ্বন্দ্ব কোন্দলের কারণে এ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে এমন অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। বিএনপিতে নেতৃত্বের কোন দ্বন্দ্ব কোন্দল নেই। আগামী ঈদের পর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্বার আন্দোলন শুরু হবে। সে আন্দোলনে বর্তমান অবৈধ সরকারের পতন সুনিশ্চিত।
এদিকে, গত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলনে পুরোপুরি সফল হতে না পেরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেন। তার সে ঘোষণার পর আন্দোলনে ব্যর্থতার দায়ে তখন ব্যাপক সমালোচিত দলের ঢাকা মহানগর কমিটিসহ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিভিন্ন জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। শুরু হয় নানান তোড়জোড়। পদ-পদবী টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন করে পদ-পদবী পেতে শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। ফলে কেন্দ্রীয় নেতাদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব আবার প্রকট আকার ধারণ করে।
ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়ে সাদেক হোসেন খোকা এবং অপর কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আব্বাস গ্রুপ আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। মির্জা আব্বাসসহ তার অনুসারীরা তখন সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তীব্র সমালোচনা শুরু করে। সাদেক হোসেন খোকা তখন সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকামহানগর বিএনপির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি মির্জা আব্বাস বা হান্নান শাহকে ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্ব দেয়ার কথাও বলেন। সাদেক হোসেন খোকার এই ঘোষণা তার রাজনৈতিক কৌশল বলেও অনেকে মনে করেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তিনি এ ধরনের রাজনৈতিক কূটচালের আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা। সাদেক হোসেন খোকা এমন চাল দিয়ে সফলও হয়েছেন।
মহানগর বিএনপির দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর তার বিরুদ্ধে সমালোচনা একেবারেই বন্ধ হয়েছে। এ ছাড়া তাকে বাদ দিয়ে ঢাকামহানগর কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও থেমে গেছে। সাদেক হোসেন খোকা চিকিৎসার জন্য বর্তমানে আমেরিকা রয়েছেন। আগামী মাসের শেষের দিকে তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তিনি দেশে না ফেরা পর্যন্ত ঢাকামহানগর বিএনপির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আর কোন আলোচনাই হবে না। কমিটি না থাকায় ঢাকামহাগর বিএনপির সাংগঠনিক কর্যক্রম একেবারেই স্থবির। এতে করে রাজধানীতে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা বিএনপির জন্য কঠিন। আর রাজধানীতে আন্দোলন তীব্র না হলে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সফলতা সম্ভব নয়, এটা বিগত সময়ের আন্দোলনে প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা মহানগরীর মতো বিভিন্ন জেলা কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়ও শুরু হয়েছিল। বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাথে মতবিনিময়ের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন জেলা কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমালোচনা ও আপত্তির মুখে তা স্থগিত করা হয়। যে সব জেলায় কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল সেগুলোতে দ্বন্দ্ব সংঘাত এখন চরমে।
দলপুনর্গঠন প্রক্রিয়ার এই স্থবিরতার ফলে এবছর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানও এখন অনিশ্চিত। আর কাউন্সিল না হলে দলের দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবও ভারমুক্ত হতে পারছেন না। আর ভারমুক্ত হতে না পারলে তার পক্ষেও সাংগঠনিক কর্মকান্ড আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীলতার সাথে পালন অত্যন্ত কষ্টকর। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব করা হয়। দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে দলের স্থায়ী কমিটির অনেক সিনিয়র নেতা মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তখন থেকে মহাসচিব পদ নিয়েও শুরু হয় দ্বন্দ্ব।
তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ইমেজ দিয়ে দলীয় দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের উর্ধ্বে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হন। তার সততা এবং কর্মতৎপরতার মাধ্যমে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরী করে নেন। শুধু তাই নয়, একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে সকল দলের কাছে এবং সুধীসমাজেও তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তারপরও তাকে দলের কর্মকা- পরিচালনায় পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব না দেয়ায় দলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এক ধরনের হতাশা নেমে এসেছে। আর কর্মীদের হতাশা সাংগঠনিক গতিকে স্থবির করে দেয়

শেয়ার করুন