ব্যবসা-বাণিজ্যে দুরবস্থা : সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কায় ব্যাংকিং খাত

0
76
Print Friendly, PDF & Email

বিনিয়োগ স্থবিরতায় আমানতকারীদের টাকা খাটাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। পরিচালন ব্যয় কমাতে আমানতকারীদের নিরুৎসাহিত করতে কমানো হচ্ছে সুদের হার। পুঁজিবাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে না। ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ায় ও পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসায় আমানতকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করছেন সঞ্চয়পত্রে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার বাড়ানোর ফলে ব্যাংকের প্রায় তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা চলে গেছে ব্যাংকের কাছে। এতেও ব্যাংকিং খাত তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার বিপরীতে কোনো মুনাফা পাচ্ছে না। আবার শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকের অলস টাকা ভোক্তাঋণ খাতেও বিনিয়োগ করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা কড়াকড়ি করায় ব্যাংকগুলো ভোক্তাঋণ বাড়াতে পারছে না। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গত শুক্রবার নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ের মতো ব্যাংকিং খাতের এমন দুরবস্থা অতীতে কখনো হয়নি। ব্যাংকের মূল আয় হলো বিনিয়োগ। ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে বিনিয়োগ করে থাকে। ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানই হলো ব্যাংকের মুনাফা। এ মুনাফা দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, পানি, ভবন ভাড়াসহ যাবতীয় ব্যয় মিটিয়ে থাকে। পরিচালন ব্যয় মেটানো পর অবশিষ্ট অর্থ সরকারের ট্যাক্স পরিশোধের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করে থাকে। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ মন্দা চলছে। ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না বরং ব্যাংকগুলো লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করছে। কেউবা খেলাপি ঋণ কমাতে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে খেলাপি ঋণ পরিশোধ করছেন। আবার ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ নবায়ন করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক রীতিমতো এ ধরনের নীতিমালাই শিথিল করেছিল, যা আগামী ৩০ জুনে শেষ হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমে যায় গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে। ওই এমডি আরো জানান, অনেক ব্যাংকই এখন কাগজনির্ভর হয়ে পড়ছে। কাগজে কলমে ঋণ আদায় হচ্ছে। বাস্তবে ভিন্নচিত্র। এর পরও সরকারি ব্যাংক থেকে জালজালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া তো অব্যাহত রয়েছেই। হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারির পর হালে বেসিক ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ধরা পড়েছে।
ওই এমডির মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের এমন দুরবস্থা অতীতে আর কখনো ঘটেনি। তিনি বলেছেন, শক্ত ভিতের ওপর গড়ে ওঠা দেশের ব্যাংকিং খাতের এসব ধকল সহ্য করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নতি না হলে সামনে কী হবে, তা বলাই মুশকিল। কেননা ইতোমধ্যেই আমানতের সুদ কমে যাওয়ায় আমানতকারীরা তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছে। বেশি লাভের আশায় সরকারের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। ফলে ব্যাংকে কমে যাচ্ছে আমানতের পরিমাণ।
অপর এক ব্যাংকের এমডি জানান, দেশে যখন বিনিয়োগ মন্দা থাকে, তখন ব্যাংকগুলোর আমানতের অর্থ সহজ বিনিয়োগের জন্য অন্যান্য খাতে সহজ করা হয়। কিন্তু এখন সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বিরাজ করছে। ব্যাংকগুলো আমানত নিচ্ছে। কিন্তু সেই আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছে না। এর ফলে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে চলছে; কেননা নির্ধারিত মেয়াদ শেষে আমানতকারীদের সুদে-আসলে ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু এ সময়ে ব্যাংক বিনিয়োগ করতে না পারলে ব্যাংককে লোকসান দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক ভোক্তাঋণসহ অন্যান্য খাতে ঋণ দিয়ে সাময়িক সঙ্কট মেটাতে পারছে না; কারণ ভোক্তাঋণ অন্যান্য অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জেনারেল প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ করতে হচ্ছে ৫ শতাংশ। অথচ ুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে জেনারেল প্রভিশন মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানান, ভোক্তাঋণ গাড়ি কিনতে ও বাড়ি বানাতে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দিলে বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। আর এই পাঁচ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে; এতে ব্যাংকের আয় হোক বা না হোক। তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন কোনো শিল্প বিনিয়োগ নেই। ব্যাংকগুলো আমানত নিচ্ছে; কিন্তু তা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এতে ব্যাংকে বেড়ে যাচ্ছে অলস টাকার পরিমাণ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িক সময়ের জন্য ভোক্তাঋণের নীতিমালা শিথিল করলে ব্যাংকগুলো একটু স্বস্তি পেত, অন্যথায় দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন