সেই স্টেডিয়ামেই আজ চিলি বনাম নেইমার

0
70
Print Friendly, PDF & Email

আজ মিনেইরো স্টেডিয়ামে নামার সময় নেইমারের কি মনে পড়বে না গত বছর এপ্রিলের ওই সন্ধ্যা?
সেই একই স্টেডিয়াম, একই প্রতিপক্ষ। কনফেডারেশনস কাপের প্রস্তুতিমূলক ওই প্রীতি ম্যাচে চিলির সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করায় দর্শকেরা দুয়ো দিয়েছিল ব্রাজিলকে। আর ব্রাজিলিয়ান প্রেস নেইমারকে দিয়েছিল নতুন একটা নাম—পিপোকুয়েইরো!
পর্তুগিজ শব্দটির আভিধানিক অর্থ যা-ই হোক, সেটির বহুল ব্যবহার অন্য অর্থে—যে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে সময়মতো তা বাস্তবায়ন করার মানসিক দৃঢ়তা দেখাতে পারে না। ‘পিপোকুয়েইরো’ নেইমার সেদিন মাঠ ছেড়েছিলেন মাথা নিচু করে। আজ সেই মাঠেই আবার চিলি।
সেই চিলি, যাদের নিয়ে বিশ্বকাপ ড্রয়ের পরই ও‘গ্লোবো টেলিভিশনকে স্কলারি বলেছিলেন, হল্যান্ড বা স্পেন হলেও সমস্যা নেই, চিলি যেন কোয়ালিফাই না করে। ভাগ্যের কী পরিহাস, বেলো হরিজন্তেতে স্কলারির দলের নকআউট পর্বের শুরুই হচ্ছে সেই চিলিকে দিয়ে। নেইমার, নেইমার আজ কী করবেন?
এই ম্যাচে তাঁর নতুন বুট পরে নামার কথা। নাইকি সোনালি রঙের হাইপারভেনম বুট বানিয়েছে শুধুই নেইমারের জন্য। ‘গোল্ডেন বুট’-এর শখ যে তাঁর অনেক দিনের। ২০০৭ কোপা আমেরিকায় গোল্ডেন বুট জিতলেন রবিনহো। ‘নতুন রবিনহো’ হওয়ার স্বপ্ন চোখে নিয়ে নেইমার তখন খেলেন পর্তুগিজা সান্তিস্তা নামে সান্তোসের এক ক্লাবে। রবিনহো হতে নিজের কালো বুটজোড়াকেই সোনালি রং করে দিলেন। সেটি কি আর থাকে নাকি! বুটের রং উঠে যাওয়ায় খুব মন খারাপ হয়েছিল ১৫ বছরের কিশোরের।
সোনালি বুট খুব পছন্দ। কিন্তু ঠিক যে রংটা চান, সেটা পান না। এই দুঃখের কথা শুনেই নাইকি একেবারে নেইমারের চাওয়ামতো রঙে বানিয়ে দিয়েছে ‘গোল্ডেন বুট’।
আসল ‘গোল্ডেন বুট’ পাওয়ার লড়াইয়েও আছেন। লিওনেল মেসি, টমাস মুলার ও নেইমারের সেই লড়াই এই বিশ্বকাপে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের পুরস্কার ওই ‘গোল্ডেন বুট’ তো আসলে দলীয় সাফল্যের সঙ্গেই একসূত্রে গাঁথা। যাঁর দল যত এগোবে, ততই বাড়বে তাঁর সম্ভাবনা।
নেইমার অবশ্য আগেই বলে দিয়েছেন, তাঁর গোল্ডেন বল-গোল্ডেন বুট কিচ্ছু চাই না। চাই শুধু বিশ্বকাপ। গ্রুপপর্বে ব্রাজিলের তিন ম্যাচই পরিষ্কার করে দিয়েছে, এই দুটিও আসলে একসূত্রেই গাঁথা। ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিততে হলে নেইমারকেও জিততে হবে ওই দুটির কোনোটি অথবা দুটিই। আজকের ম্যাচটিও আসলে চিলি বনাম নেইমার।
তারকাপ্রথা খুব অপছন্দ স্কলারির। তাঁর কোচিং-দর্শনের প্রথম কথাই হলো, ফুটবল দল একটা পরিবার এবং সেই পরিবারের সবাই সমান। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলকে ‘স্কলারিস ফ্যামিলি’ নাম দিয়েছিল এ কারণেই। ক্যামেরুনের বিপক্ষে ম্যাচের পর সেই স্কলারিও নেইমার নিয়ে প্রশ্নে নিজের আদর্শের কথা ভুলে বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘আর্জেন্টিনার যেমন মেসি, আমার দলের তেমনি নেইমার।’
সেই নেইমারের মনেও চিলিকে নিয়ে খুব সমীহ। আত্মবিশ্বাস যতই থাক, নেইমারের কথাবার্তায় ঔদ্ধত্যের কোনো প্রকাশ নেই। মেসি-রোনালদোকে নিয়ে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তিনি মোটেই তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, দুজনের বিশাল ভক্তকুলের একজন মাত্র। নেইমারের এক বার্সা-সতীর্থ চিলি দলে খেলেন। আলেক্সিস সানচেজ সম্পর্কেও নেইমার গদগদ, ‘আলেক্সিস হলো একজন তারকা। ও গ্রেট এক খেলোয়াড়, ওর ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। ওকে জায়গা দেওয়া যাবে না।’
সানচেজ সম্প্রতি নেইমার সম্পর্কে কিছু বলেছেন বলে শোনা যায়নি, তবে এই ম্যাচের আগে ব্রাজিলকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সেই কথার সারাংশ এ রকম—
ইতিহাস সৃষ্টি করতেই চিলি এখানে এসেছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়েছে। হল্যান্ডের বিপক্ষে হারলেও সেটি একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। সেই ম্যাচের ভুলগুলো আর হবে না। চিলির লক্ষ্য বিশ্বকাপ জেতা।
চিলির আরেক তারকা আর্তুরো ভিদালও ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর, ‘ব্রাজিলকে হারানোটা আমাদের স্বপ্ন। আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের যখন হারিয়েছি, ব্রাজিলকেও হারাতে পারব।’
যেকোনো ম্যাচের আগেই এমন রণহুংকার শোনা যায়। বড় দলগুলোর বিপক্ষে খেলার আগে নিজেদের তাতিয়ে তুলতে ছোট দলগুলো থেকেই যা বেশি। তবে সানচেজ-ভিদালের কথাগুলোকে সেভাবেই নিয়ে ‘ফাঁকা বুলি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এমনিতে চিলি বিশ্ব ফুটবলে কোনো সমীহ জাগানো নামই নয়। সেই কবে, ১৯৬২ সালে নিজেদের দেশে খেলার সুযোগে একবারই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। কোপা আমেরিকা পর্যন্ত জিততে পারেনি একবারও। কিন্তু এই বিশ্বকাপে মাঠে ও মাঠের বাইরে অন্য রকম একটা আবহ ছড়িয়ে দিতে পেরেছে হোর্হে সামপাওলির দল। সেটি স্পেনকে হারানোর আগে থেকেই। মাঠে ভয়ডরহীন ঝাঁজালো ফুটবল ‘চিলি’ নামটির সঙ্গে খুব যাচ্ছে।
খেলোয়াড়দের মতো চিলিয়ান সমর্থকেরাও কীভাবে যেন ‘এবার আমরা একটা কিছু করেই ফেলব’ বিশ্বাসে উজ্জীবিত। এই বিশ্বকাপে অতিথি দলগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, তবে বন্য উন্মাদনায় চিলিয়ানরা যেন তাদেরও ছাপিয়ে যাচ্ছে। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে মারাকানার মিডিয়া সেন্টার ভেঙে ঢুকে পড়াটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বেপরোয়া চিলিয়ানদের সঙ্গে সেটি খুব মানিয়ে যায়।
অদ্ভুত একটা স্লোগানও বানিয়েছে ওরা। প্রথমে চি-চি-চি, এরপর লে-লে-লে, এরপর একসঙ্গে চিলে-চিলে।
সেই ‘চিলে’ সত্যি সত্যিই কান নিয়ে যেতে পারে বলে স্কলারির ভয়টা একদমই অমূলক নয়।

শেয়ার করুন