অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে ঢাকা মহানগর বিএনপি

0
48
Print Friendly, PDF & Email

নেতৃত্বের অভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনাকারী ঢাকা মহানগর বিএনপি।

অভিযোগ আছে, ঢাকা মহানগর বিএনপিতে রয়েছে সাদেক হোসেন খোকার একক আধিপাত্য। তাই তাকে বাদ দিয়ে মহানগর বিএনপি বিকল্প কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না, যার হাতে আগামী দিনে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে।

অন্যদিকে একটি মহল খোকাকে বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যারা কেবল সাদেক হোসেন খোকা নয়, চায় ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন নেতৃত্বে কমিটি গঠন করতে। যে কমিটিতে থাকবে পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের সমাগম।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা মহানগর বিএনপিকে সংস্কার করে অচিরেই নতুন কমিটি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই আগামী কমিটি থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় সাদেক হোসেন  খোকা ও আব্দুস সালাম দায়সারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এদিকে মহানগর বিএনপির কয়েকজন যুগ্ম আহবায়কের সঙ্গে আলাপকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। সেটি হচ্ছে সামনে পরির্বতনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা নিশ্চিতভাবে জানেন না আগামী দিনের কমিটিতে স্থান পাবেন কিনা।

শীর্ষ নিউজকে এসব নেতারা বলেন, ঢাকা মহানগর বিএনপি অভিভাবকহীন নয়। তবে নতুন কমিটি ঘোষণা করার ক্ষেত্রে যদি বেশি সময় নেওয়া হয় তাহলে একদিন সত্যিকারভাবেই রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া মহানগর বিএনপি অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়বে।

ঢাকা মহানগর বিএনপির দফতর সূত্রে জানা যায়, মহানগর বিএনপির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অচিরেই মহানগরে যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে না পারলে এর খেসারত দিতে হবে মূল দল বিএনপিকে।

সূত্র জানায়, সাদেক হোসেন খোকা দেশে অবস্থানকালে মহানগর বিএনপিকে নিয়ে দ্বন্দ্ব বিরাজ করলেও এখন মহানগর বিএনপি অভিভাবক শূন্য। তবে যারা যুগ্ম আহ্বায়ক রয়েছেন তারা একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িত। তারা একজন আরেকজনকে মানতে নারাজ। এমনকি কমিটিতে থাকা সদস্য সচিব আব্দুস সালামকে অবাঞ্ছিত নেতা মনে করেন তারা। তাই তো অভিভাবকহীন ঢাকা মহানগর বিএনপি তাদের নির্ধারিত সভায় নিয়ে আসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে। অথচ যিনি সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে এক সময় নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

জানা যায়, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রমজান মাসে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ শেষ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি যেকোনো সময় ঘোষণা করবেন ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটির নাম।

এ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার হাতে যে সমস্ত কমিটির নাম সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে সভাপতি হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, যুবদলের সভাপতি এডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং সদস্য সচিব হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবীব উন নবী খান সোহেল, আবু সাঈদ খান খোকন প্রমুখ।

যদিও বিগত দিনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আন্দোলন সফল করতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ৮ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। যার নির্দেশনা ও আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব ছিলো ঢাকা মহানগর বিএনপির ওপর।

কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটের সরকার পতন আন্দোলন পরিচালনা ও সফল করার মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে মহানগর বিএনপি।

আন্দোলনের মাঠে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ক্ষমতা দখল আর পদ আঁকড়ে থাকা নেতাদের মাঠে না পাওয়ায় আন্দোলনে ভাটা পড়েছে। মহানগর নেতাদের দিক নির্দেশনা আর নেতৃত্বের অভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহতের লক্ষ্যে ডাকা কর্মসূচিও ছিল গা ছাড়া অবস্থায়।

জানা যায়, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ। সম্প্রতি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার জন্য অবস্থান করছেন। সাদেক হোসেন খোকা ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় দেশে ফিরতে প্রায় ২ মাস চলে যাবে। আর খোকা দেশে ফিরলেও সম্ভবত আগের মতো রাজনীতিতে সময় দিতে পারবেন না।

এদিকে সাদেক হোসেন খোকার আস্থাভাজন একজন বিএনপি নেতা শীর্ষ নিউজকে বলেন, খোকা বিগত দিনের ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব ছাড়তে যাচ্ছেন। খুব শিগগিরই তিনি এ বিষয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলে তার সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন। যদিও গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক পদ থেকে অব্যাহতি চান। খোকা এ কথাও বলেছিলেন খালেদা জিয়া যখন চাইবেন তখনই তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন। খালেদা জিয়া চাইলে তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। আর তখন থেকেই  মহানগর বিএনপির মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়।

এদিকে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুস সালামের কাছে এসব বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম এমনকি খালেদা জিয়া নিজেও ঢাকা মহানগরের নেতৃত্ব থেকে খোকাকে যেমন বাদ দিতে পারছেন না, তেমনি খোকাকে রেখেও মহানগর কমিটিকে আন্দোলনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারছেন না।

জানা যায়, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তৃণমূল পর্যায় থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনতে মহানগর বিএনপিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করা হয়।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে দেওয়া হয় মহানগর বিএনপির দায়িত্ব। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২ বছর পর কাউন্সিল হওয়ার নিয়ম থাকলেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে পালাবদল ঠিক হয়ে ওঠেনি।

তবে ২০১১ সালের ১৪ মে সাদেক হোসেন খোকাকে আহ্বায়ক করে ২১ সদস্যের কমিটি নিয়ে পুর্ণাঙ্গ কমিটি হবে এমন আশা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা মহানগর বিএনপি।

দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের অনুমোদনে সাদেক হোসেন খোকাকে আহ্বায়ক ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালামকে সদস্য সচিব এবং ১৯ জনকে যুগ্ম আহবায়ক মনোনীত করা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী আহবায়ক কমিটিকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে সর্বস্তরের কাউন্সিলের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর শাখার নির্বাহী কমিটি নির্বাচন করার কথা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ মাসের নামে প্রায় সাড়ে ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্বাচিত নেতারা ক্ষমতা না ছাড়ার কারণে মহানগরের কমিটিতে স্থান পাননি অনেক নতুন নেতৃত্ব। অনেক ত্যাগী নেতাদেরও পাশ কাটিয়ে পয়সাওয়ালাদের পদ দেওয়া হয়েছে এমনও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাদেক হোসেন খোকার আস্থাভাজন বিএনপির এক নেতা শীর্ষ নিউজকে বলেন, সাদেক হোসেন খোকার বিকল্প কেবল ঢাকা মহানগর নয়, বিএনপির মূল দলেও নেই। তাই বিএনপিকে যদি আগামী দিনে রাজপথে আন্দোলন করতে হয়, সে আন্দোলনের দায়িত্ব খোকা ভাইয়ের হাতেই দিতে হবে বলে জানান।

খোকার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা আছে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

তবে বিএনপির একটি নির্ভরশীল সূত্র শীর্ষ নিউজকে বলেন, শিগগিরই দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন। আর সেখানে নেতৃত্বদানে সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নাম।

শেয়ার করুন