বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের

0
66
Print Friendly, PDF & Email

টানা দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এসে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল হলেও বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের। গুম-খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, জমি দখল, বস্তিতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যাসহ একের পর বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন দলীয় নেতাকর্মী থেকে করে মন্ত্রী-এমপিরা। তাদের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের বড় শিরোনাম হলেও কারো বিরুদ্ধে নেই কোনো ব্যবস্থা। ফলে পার পেয়ে যাচ্ছে সেই আলোচিত গডফাদারেরা, যারা অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন ঘটনার জন্ম দিয়ে নেপথ্যে নায়ক হিসেবে বারবার আলোচনার ঝড় তুলছেন।
গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির পাশাপাশি জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর আগে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মন্ত্রী-এমপিরা বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে দল ও সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ উল আলম লেনিন নয়া দিগন্তকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে নাম উঠে এলেই তার অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। যদি অপরাধমূলক কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে কোনো নেতা বা এমপি জড়িত থাকেন তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আইনগতভাবে তাদের আগে দোষী সাব্যস্ত হতে হবে। এরপরই দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধী যেই হোক পার পাবে না।
গত ১৪ জুন শবেবরাতের রাতে নেতাকর্মীরা রাজধানীর পল্লবীর কালশী বিহারি পল্লীতে আগুন ধরিয়ে ১০ জনকে হত্যা করে। এ ঘটনার সাথে ঢাকা-১৭ আসনের এমপি ও পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এমপির দাপটে উল্টো কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন আক্রমণের শিকার বিহারিরা। এমপি বিষয়টা মীমাংসার জন্য বিহারিদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ অব্যাহত রেখেছেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় নেপথ্যে সন্দেহের তীর এখন সরকারি দলের এমপি শামীম ওসমানের দিকে। র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে দীপু চৌধুরী ছয় কোটি টাকা লেনদেনের সাথে জড়িত থাকার পেছনে ত্রাণমন্ত্রীর যোগসূত্রতার অভিযোগ ওঠে। হত্যাকাণ্ডের সাথে জামাতা-ছেলে জড়িত থাকার অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ত্রাণমন্ত্রী এবং তার পদত্যাগের দাবি উঠলেও শেষমেশ ঘটনাটি ধামাচাপা পড়তে যাচ্ছে।  নারায়ণগঞ্জের ওই চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার সাথে বহুল আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। দলের পক্ষ থেকেও তেমন উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের সাথে আরেক আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ভারতে পাড়ি জমানোর কয়েক দিনের মাথায় গ্রেফতার হন। ভারত সরকার নূর হোসেনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছে। এ দিকে সংসদে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ওসমান পরিবারের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলে ওই ঘটনা অনেকটাই আড়ালে যেতে বসেছে।
এরপরই ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হককে গুলি করে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় চলে আসেন সেই হাজারী পরিবার। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকারদলীয় এমপি নিজাম হাজারী ও ফেনীর আরেক গডফাদার হিসেবে পরিচিত জয়নাল হাজারী। একে অপরকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। দলীয়ভাবেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এর এক দিন পরেই লক্ষ্মীপুরে আবারো ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতাকে এবং বগুড়ায় যুবলীগকর্মীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার রেশ না কাটতেই পাবনায় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর গত মঙ্গলবার আবারো ফেনীতে সরকার সমর্থক এক নেতাকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। এর প্রত্যেকটি ঘটনার সাথে সরকার সমর্থক এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতা-গডফাদারেরা জড়িত থাকলেও  অদৃশ্য ক্ষমতাবলে পার পেয়ে যাচ্ছেন তারা। গত ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসেই আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে নেতাকর্মীরা। দশম জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেই প্রকাশ্যে ঘুষ দাবি, প্রকৌশলীকে চড়-থাপ্পড় মারা, সোনার নৌকা উপহার নেয়া, সংবর্ধনার নামে কোমলমতি শিার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখাসহ নানা কারণে সমালোচিত হন সিনিয়র মন্ত্রীরা। এ থেকে বাদ যাচ্ছেন না একেবারেই নবীন এমপিরাও। তবে এ রেওয়াজ শুধু দশম সংসদেই নয়, এর আগে মহাজোট সরকারের আমলেও অনেক প্রভাবশলী মন্ত্রী-এমপিও একইভাবে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে সরকারকে বিব্রত করেছেন। বর্তমানে এই আলোচিত এমপিরাও আগেকার আমলে বিতর্কের শীর্ষে ছিলেন। গণমাধ্যমেরও বড় শিরোনাম দখল করেছেন একাধিকবার।
আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের এক নেতার সাথে আলাপকালে বলেন, নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যা, লক্ষ্মীপুরে ব্যাপকহারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সরকার সমর্থক নেতাকর্মী হত্যা, যশোরের শার্শা ও ঝিকরগাছায় খুন-হত্যার রেকর্ডসহ সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুরের কালশী বিহারি পল্লীতে আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় সরকারের ভাবমর্যাদাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, এসব ঘটনার সাথে সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে আসায় সরকার বিব্রত। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না।  
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, কার্যত বিরোধী দল মাঠে না থাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নিজেদের মধ্যে কোন্দল বিবাদে জড়িয়ে এবং প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সর্বোপরি আধিপত্য ধরে রাখতে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নয়া দিগন্তকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ সর্বশেষ কালশীতে যে ঘটনা ঘটেছে, তা  অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মস্পর্শী। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দলীয় এমপিদের নাম উঠে আসায় দল ও সরকারের ভাবমর্যাদা ুণœ হচ্ছে এটা ঠিক। তবে এটাও ঠিক চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কোনো এমপির বিরুদ্ধে ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে সরাসরি দোষ দেয়া যাচ্ছে না, দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতা বলেন, অপরাধী যেই হোক, ঘটনার সাথে যত প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রী হোক, জড়িত থাকলে অবশ্যই সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, অপরাধীদের কোনো দল নেই, তারা যেই হোক তাদের ছাড় দেয়া হবে না।

শেয়ার করুন