নির্যাতিতদের প্রতি নির্যাতন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন

0
53
Print Friendly, PDF & Email

নির্যাতিতদের প্রতি নির্যাতনের ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। গুম, খুন, অপহরণ, আটক ব্যক্তিদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুলীর মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে। রিমান্ডের নামে চলছে পুলিশী বাণিজ্য। রিমান্ডের নামে নির্যাতন আইনের কোথাও না থাকলেও পুলিশ মানবাধিকার পরিপন্থী এই কাজটিতে বেশি উৎসাহিত। বক্তারা বলেন, নির্যাতিত মানুষের নিরাপত্তা দেয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলেও তা উপেক্ষিত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জনগণকে সোচ্চার হতে হবে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সুপ্রিম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামে ‘নির্যাতিতদের প্রতি নির্যাতন : মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন’ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শীর্ষক সেমনিারে বক্তারা এসব কথা বলেন। মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (মওসুস) সেমিনারটির আয়োজন করে। মওসুস’র উপদেষ্টা ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব এ এইচ এম নোমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মো. ফায়েজউদ্দীন, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, বারের সহ-সভাপতি এডভোকেট এম খালেদ আহমেদ, বারের সাবেক সহ-সম্পাদক এডভোকেট মো. সাইফুর রহমান ও বর্তমান সহ-সম্পাদক এডভোকেট এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার প্রমুখ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ড. মো. তাওহীদুর রহমান। নির্যাতনের শিকার সমর্থনে জাতিসংঘ ২৬ জুন আন্তর্জাতিক দিবস পালন করে। এ দিবস উপলক্ষেই এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, সারা বিশ্বে নির্যাতিতদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হচ্ছে। যে বিষয়ে এই সেমিনার তা যথাযথ। শুধু  বাংলাদেশ নিয়ে ভাবলে হবে না। মানবাধিকারের ধারণাটাই গোলমালে। আজকে যে নির্যাতনের কথা হচ্ছে এটার কথা যারা বলে বেড়াচ্ছে তারাই এটা লঙ্ঘন করছে। এরা গোটা বিশ্বে মানুষকে দানবে পরিণত করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য কারা দায়ী। যুদ্ধের জন্য তারা ১৯১৩ সালে ভারত প্রতিরক্ষা আইন করেছে। সেটা থেকে যত কালো আইন আমাদের দেখতে হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে যত ঘোষণাপত্র এসেছে তার কোনটাই তারা পালন করেনি।

তিনি বলেন ২০ বছর ওকালতি করেছি। তারপর ২০ বছর বিচারক ছিলাম। রিমান্ডের কোন মামলা আমার কাছে আসেনি। রিমান্ড কেন আসলো? কেউ চুরি করলে তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞেস করতে আদালতে নেয়া হতো। পিটানো বা মারধরের জন্য নয়। এখনতো রিমান্ডের নামে বাণিজ্য চলছে। রিমান্ডে নেয়া মানেই নির্যাতন, রিমান্ডে নিলেই পয়সা। যদি দাও তাহলে পায়ে গুলী আর না দিলে বুকে গুলী। এগুলো শিখেছে কোথায়। আমার কাছে একবার পুলিশকে মানবাধিকার শেখানোর জন্য ইউএনডিপির একটি ম্যানুয়াল উদ্বোধনের জন্য এসেছিল। সারদায় প্রশিক্ষণের জন্য লাথি দিয়ে যে গালি দেয়া হয় এটাতো তার সারা জীবনের শিক্ষা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে সে কাজে এসে কি করবে। তোমরাতো তাকে মানুষ হিসেবে তৈরি করনি। কিভাবে ভদ্র ব্যবহার করা যায়, মানবাধিকার রক্ষা করা যায় সেটা শিক্ষা দিতে হবে আগে। আসলে আমাদের আগে মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে হবে। আমি যদি মানুষ হিসেবে কর্তব্য পালন করি তাহলে অধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ কম।

রুহুল আমিন গাজী বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘন এটা আবার কি জিনিস? অন্যের অধিকার কিভাবে হরণ করা যায়, অন্যকে কিভাবে নির্যাতন করা যায়, অথবা সরকারি দলের হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পৃষ্ঠপোষকতা করার প্রতিযোগিতা চলছে। একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর রায় দেয়ার কথা ছিল। আমি খবর নিয়ে জানলাম বিচারকের বাড়িতে পুলিশ পাহারা, আর এখানেতো পুলিশ ছিলই। বলতে খারাপ লাগে ইরাকে যে বিচারক সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দিয়েছে পাবলিক তাকে ধরে ফাঁসি কার্যকর করেছে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এতো বড় অপরাধী যে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করতেন,  তাও নিজের নির্বাচনী এলাকা পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়ায় এসব অপরাধ করেছেন। আবার তার এলাকার লোকজন অপরাধী জেনেও তাকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছে। এ রকম একটা অপরাধী এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারে আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারে। অনেকের জানা শেখ হাসিনা যখন ১৯৮৬ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী তখন সংসদে বসে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে ব্রিফিং করেছেন। এটা একটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। বিএনপির সাথে না থাকলে হয়তো এ বিচার হতো না। এ রকম একটা লোককে বেড়া সাঁথিয়ার লোকজন বার বার নির্বাচিত করলো। আমি জানি না বিচারপতিরা এসব বিষয় আমলে নেবেন কিনা? আশা করি তারা ন্যায়বিচার করবেন।

বিএফইউজে’র সাবেক এই সভাপতি বলেন, আজকে সরকারি দলের হলে সব খালাস। বিরোধী দল হলে মামলা বাতিল, গ্রহণ করা হলো না, সব খারিজ। এটা কোন বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। কারণ আদালত হলো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে যদি ন্যায়বিচার না পায় এর চেয়ে অন্যায় আর কি হতে পারে। মিসরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে সাংবাদিকরা জেনারেল সিসির পাতানো নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে রকম হইছে আমাদের নির্বাচনও সে ধরনের হইছে। পরে আমি তার নম্বর সংগ্রহ করে ধন্যবাদ জানিয়েছি।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে যে নির্বাচন হচ্ছে সেখানকার লোকেরা তো নির্যাতিত। দুপুর বারোটা পর্যন্ত তারা ভোট দিতে যাননি। র‌্যাব যারা মানুষের নিরাপত্তা দেবে তারা রক্ষীবাহিনীর মতো হত্যাকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী যখন হত্যাকা- ঘটায় সেখানে আর কিছু বাকি থাকে না।

তিনি আরো বলেন, কিছুদিন আগে ওমরা হজ্ব করতে গেলাম। বাংলাদেশীরা আমাকে দাওয়াত দিয়ে রিয়াদ নিয়ে গেল। সেখানে দেখলাম প্রবাসীদের মধ্যে সরকারের প্রতি যে ঘৃণা, সেটা সারা দেশেরই চিত্র। বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র নেই, ন্যায়বিচার নেই, মৌলিক অধিকার নেই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই, মানবাধিকার বিপন্ন, মাহমুদুর রহমান কারাগারে, সাগর-রুনী হত্যাকা-ের বিচার নেই। অপরদিকে হলমার্ক কেলেঙ্কারী, ডেসটিনি  ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারী ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতুকেও দুর্নীতি করে খেয়ে ফেললো। চুরি, লুটপাট, হত্যা, মামলা-হামলা এমন কিছু আর বাকি রাখেনি। তাই আসুন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সোচ্চার হই। কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে। তাই আসুন দেশকে রক্ষার জন্য আমরা এগিয়ে আসি।

অধ্যাপক ড. মো. ফায়েজউদ্দীন  বলেন, নির্যাতিতদের পুনরায় নির্যাতন আন্তর্জাতিক কনভেনশনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারপরও এটা বন্ধ হচ্ছে না, পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। পুলিশ যে রিমান্ডে নিয়ে নিয়ে নির্যাতন করে এটা আইনের কোথাও নেই। উচ্চ আদালত রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকদফা নির্দেশনা দিয়েছেন তাও মানা হচ্ছে না। বরং পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে নাকে গরম পানি ঢালছে, ইলেকট্রিক শক দিচ্ছে বা মারধর করছে এটা গণমাধ্যমে আসছে। একজন মানুষকে আটকের সময় সুস্থ হিসেবে ধরে নেয়া হলেও আদালতে যখন নেয়া হয় তখন অর্ধমৃত হিসেবে দেখছি। এই নির্যাতন আইনের কোথায় রয়েছে। তাই রিমান্ডের নামে অপপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট বার সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, যে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে সেখানে কিভাবে মানবাধিকার থাকে? সংবিধানে মানুষের অধিকারের কথা বলা আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ মানুষের সেসব অধিকার সুরক্ষায় সজাগ থাকা। তিনি বলেন, দেখামাত্রই গুলী করা-এই কথাটাই সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। অন্য কোনো দেশ হলে, এমনকি ভারতের মতো দেশ হলেও সেই পুলিশ কমিশনারের চাকরি চলে যেতো। কিন্তু আমাদের দেশে কিছুই হয়নি। তারা মানুষকে গুলী করছে, মানুষ হত্যা করছে আবার লাশও নিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন-মানবাধিকারের কোন পর্যায়ে আছি আমরা?

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পালন করছে না। লোকাল আইন হিসেবে আমাদের সংবিধানে মানবাধিকার বিষয়ে যেসব কথা বলা আছে-আমরা তাও পালন করছি না। তিনি আরো বলেন, তবে আমরা আশাবাদী। আমরা এমন এক জায়গায় চলে এসেছি যাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত বলা যায়। আর ধ্বংসের মাঝেই নতুন কিছু সৃষ্টি হবে ইনশাআল্লাহ।

এডভোকেট এম খালেদ আহমেদ বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান হলেও বর্তমান প্রেক্ষপটে তা দেখছি না।  বরং বলা যায় সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের নির্দেশে চলছে বলে আইনের সমান প্রয়োগ ঘটছে না। ফলে নারায়ণগঞ্জ ও কালশীর মতো ঘটনাও আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। তাই আমাদের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এডভোকেট মো. সাইফুর রহমান বলেন, যিনি নির্যাতিত তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন। এখন হচ্ছে তার বিপরীত। নির্যাতিতকেই নানা হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। তাকেই উল্টো নির্যাতন করা হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায় একজন সুস্থ-সবল মানুষকে গ্রেফতার করা হলে তাকে অর্ধমৃত অবস্থায় আদালতে নেয়া হচ্ছে। প্রথমত কারাগারে শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই, আবার ১০ জনের ধারণ ক্ষমতার কক্ষে ৫০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। শুরুতেই আটক ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। এখানে রাষ্ট্রই তার অধিকার হরণ করছে। অথচ আটক ব্যক্তি মুক্ত অবস্থায় যে সুবিধা পেতেন কারাগারে গেলে তার সে সুবিধা পাওয়া উচিত।

এডভোকেট এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার বলেন, আজকে বাংলাদেশে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১৯৭৫ পূর্ব রক্ষীবাহিনীর মতো ভূমিকায় রয়েছে। অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। গুম, খুন ও অপহরণের পর লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও খালে-বিলে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সরকার দেখেও না দেখার ভান করছে। এটা কিসের লক্ষণ? এজন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে।

শেয়ার করুন