আলু উৎপাদনে শীর্ষ দশে বাংলাদেশ

0
130
Print Friendly, PDF & Email

আলু— উৎপাদন সাফল্যের এক বিস্ময়। এক দশক আগেও উৎপাদন ছিল অর্ধলক্ষ টনের নিচে। এখন তা এগোচ্ছে কোটি টনের দিকে। এ সাফল্য বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের কাতারে। স্বীকৃতিটি দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। বিশ্বের আলু উৎপাদনকারী দেশগুলোর ২০১১-১২ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তালিকাটি তৈরি করে এফএও। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮২ লাখ ১০ হাজার টন উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে অষ্টম স্থানে। ৮ কোটি ৫৯ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে তালিকার প্রথমেই রয়েছে চীন। শীর্ষ পাঁচের বাকি দেশগুলো হলো— ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলোয় উৎপাদিত আলুর পরিমাণ যথাক্রমে ৪ কোটি ৫০ লাখ, ২ কোটি ৯৫ লাখ, ২ কোটি ৩২ লাখ ও ১ কোটি ৯১ লাখ টন। এছাড়া ১ কোটি ৬ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে জার্মানি রয়েছে তালিকার ষষ্ঠ ও ৯১ লাখ টন নিয়ে পোল্যান্ড সপ্তম স্থানে। বাংলাদেশের চেয়ে কম অর্থাৎ ৬৯ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে বেলারুশের অবস্থান তালিকায় নবম। আর ৬৮ লাখ উৎপাদন নিয়ে দশম স্থানে নেদারল্যান্ডস।

উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্যই কেবল নয়, আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসলও। বহুমুখী ফসল উৎপাদনে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ফসলটি। মাধ্যম হয়ে উঠেছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও।

সাফল্যের পাশাপাশি আলু নিয়ে বিড়ম্বনাও কম নয় কৃষকের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দেয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অবহেলা রয়েছে পণ্যটি বিপণনে। একদিকে বিকল্প ব্যবহারের উদ্যোগের অভাব, অন্যদিকে আনা হচ্ছে না প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার উপযোগী কিংবা ঘাতসহিষ্ণু জাতও। আলুর বিদ্যমান জাতগুলোয় জলীয় অংশ বেশি থাকায় তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। হিমাগার সংকটের কারণেও পণ্যটির কাঙ্ক্ষিত মজুদ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। তাই উৎপাদনে শীর্ষ দশের এ অবস্থান স্বপ্ন যেমন দেখাচ্ছে, তেমনি বাড়াচ্ছে ঝুঁকিও। কারণ চলতি মৌসুমেও দাম না পাওয়ায় রাস্তায় আলু ফেলে বিক্ষোভ করতে হয়েছে কৃষককে।
আলু উৎপাদনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও মোকাবেলা করতে হচ্ছে কৃষককে। আলুর মড়ক বা নাবি ধসা (লেট ব্লাইট) রোগের কারণে প্রতি বছর ২০-২৫ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৪৫টি জাত অবমুক্ত করা হলেও এ রোগ প্রতিরোধে সক্ষম তেমন কোনো জাত দেশে উদ্ভাবন হয়নি। তাই দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন এবং গবেষণা সংস্থা জোর দিচ্ছে ফসলটির জাত উন্নয়ন ও বিপণনে। পুষ্টিনিরাপত্তায় আলুকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সে গবেষণাও চলছে।

আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্রের (সিআইপি) চিফ অব পার্টি শওকত আরা বেগম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিমাগারের ধারণক্ষমতাও বাড়াতে হবে। প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এর বিকল্প ব্যবহার ও রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে পদক্ষেপগুলো এখনো সীমিত। কয়েক বছরে দেশে আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলেও তা সঠিকভাবে বিকশিত হয়নি। কোন ফসল কোন সময়ে কী হারে আবাদ করতে হবে, তারও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। তাই এসব ক্ষেত্রে সরকারের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও নীতিসহায়তা থাকতে হবে। না হলে আলু চাষে বিমুখ হতে পারেন কৃষক।

উৎপাদন ও হিমাগার: চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে আলু উৎপাদন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে, দেশে আলু উৎপাদন ৮৬ লাখ টন ছাড়িয়েছে। যদিও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫২ লাখ ৬৮ হাজার টন। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ লাখ ৩০ হাজার টন। ২০১০-১১ অর্থবছরে উৎপাদন আরো বেড়ে হয় ৮৩ লাখ ২৬ হাজার টন। টানা এ তিন বছরে উৎপাদন বাড়লেও সে হারে বাড়েনি হিমাগারের সংখ্যা কিংবা এর ধারণক্ষমতা। বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে হিমাগারের ধারণক্ষমতা এখনো ৪২ লাখ টন।

কৃষি সচিব ড. এসএম নাজমুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ফসলটির উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর ধরেই কৃষককে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দেয়া হচ্ছে উপকরণসহায়তা। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত শিল্পের ব্যবহার উপযোগী, রোগ প্রতিরোধী ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য আনা হচ্ছে আরো কয়েকটি নতুন জাত। নতুন এসব জাতের মাধ্যমে আলুর বিকল্প ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকপর্যায়ে সংরক্ষণের চাপও কিছুটা কমে আসবে। পাশাপাশি মজুদক্ষমতা বাড়াতে সরকারিভাবেও বিনিয়োগ হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের আলুকেন্দ্রিক সমসাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে নতুন জাত উদ্ভাবন করছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি)। লেট ব্লাইট রোগ প্রতিরোধে বারি-৪৬ জাত ছাড়াও পুষ্টিনিরাপত্তায় দুটি মিষ্টি আলুর জাত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়ন ও কৃষকপর্যায়ে সংরক্ষণক্ষমতা বাড়াতে চলতি বছরের শুরুতে পাঁচটি নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। রবি মৌসুমে ৯০-৯৫ দিনের মধ্যে এসব জাতের ফলন পাওয়া যাবে। ফলন আসবে প্রতি হেক্টরে ৩০-৪০ টন। এর মধ্যে তিন জাতের আলু প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন