এরশাদের জাপায় ড্রাইভিং সিটে দালালচক্র

0
42
Print Friendly, PDF & Email

শতকরা ৯৯ ভাগ নেতাকর্মী এরশাদের পক্ষে থাকলেও জাতীয় পার্টির (ক্ষমতাসীন বিরোধী দল) নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত এইচ এম এরশাদের ‘হাতছাড়া’ হয়ে যাচ্ছে। তার কথায় এখন দল চলে না; বরং অদৃশ্য শক্তির জোরে দালালদের কথায় দল চলছে। পার্টির নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতাকর্মীদের ভাষায় দালাল (ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, সুনীল শুভ রায় প্রভৃতি নেতার নাম বলার আগে দলের নেতাকর্মীরা ‘দালাল’ শব্দ ব্যবহার করেন) ব্যক্তিদের মত প্রাধান্য পাচ্ছে। বড় দুই নেতার খুঁটি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব হলেও ছোট নেতার খুঁটির জোর প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা বলে দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন। তাদের মতে এরশাদ নেতাকর্মীদের ‘সঠিক রাজনীতি’ দিতে না পারায় জাতীয় পার্টি কয়েক টুকরো হয়ে গেছে। এখন  এরশাদের নেতৃত্বের অবশিষ্ট অংশের ড্রাইভিং সিটে দালাল চক্র বসে গেছেন। মস্কোয় বৃষ্টি হলে বাংলার বামরা যেমন ঢাকায় ছাতা ধরতেন; দিল্লীতে বৃষ্টি হলে আওয়ামী লীগ যেমন ঢাকায় ছাতা মাথায় দিতেন; তেমনি আওয়ামী লীগের ইচ্ছা অনিচ্ছায় এই চক্র জাতীয় পার্টিকে ব্যবহার করছেন।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউশনে যুব সংহতির প্রতিনিধি সভায় রওশন এরশাদ ‘আর নির্বাচন করবেন না’ ঘোষণা দেয়ার পর এরশাদ দলে বিরোধ নেই দাবি করেন। এক মাসের মাথায় একই স্থানে মৎস্যজীবী পার্টির প্রতিনিধি সভায় তিনি দলে মতভেদের কথা স্বীকার করেন। মৎস্যজীবী পার্টির প্রতিনিধি সভায় জিএম কাদেরের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু যখন মঞ্চ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন সামনের সারিতে বসা শত শত নেতাকর্মী ‘দালাল যায়, দালাল যায়’ শ্লোগান দেন; চিৎকার করেন। কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে ‘মহাসচিবের’ পথ আটকানোর চেষ্টা করেন। দলের প্রেসিডিয়ামের তিনজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে ইনকিলাবকে বলেন, এরশাদের অনুসারী হিসেবে দলে রয়েছি ২৮ বছর; অথচ এরশাদ দলের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব সরকারের দালালদের হাতে তুলে দিয়েছেন। দলের মধ্যম সারির একাধিক নেতা (নাম প্রকাশ করলে বহিষ্কার হবেন এ আশঙ্কায় পরিচয় গোপন রাখা হলো) উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, দুর্বলের ওপর চড়াও হয় সবাই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়লে জাতীয় পার্টির নেতাদের ‘বোরকা পার্টিতে’ যোগ দিতে হবে। ’৯০ পট পরিবর্তনের পর যেমন সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বোরকা পড়ে পালিয়েছিলেন; সামনে আবার সে অবস্থায় পড়তে হবে জাতীয় পার্টির নেতাদের। কারণ বিএনপিসহ সাধারণ মানুষ মনে করে জাতীয় পার্টির কারণে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন করতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। বর্তমান সরকারের করা হামলা মামলা, জুলুম-নির্যাতনের প্রতিশোধ নেবে জাতীয় পার্টির নেতাদের পিটিয়ে।  সারাদেশের এরশাদপ্রেমীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে ঝুঁকির মুখে ফেলে সরকারের সুবিধাভোগী কয়েকজন দালাল নেতা দলকে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করেছেন। এরশাদকে পুতুল হিসেবে অভিহিত করে দলত্যাগী এক নেতা (বর্তমানে কাজী জাফরের জাপায়) বলেন, ‘এরশাদের জাপা ১৬ বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। ’৯৮ সালে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানিক মিয়া এভেনিউ-এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের ভারতবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে নাজিউর রহমান মঞ্জুর (সে সময় অতিরিক্তি মহাসচিব ছিলেন) এরশাদের সামনেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর চড়াও হন। অতঃপর তিন দফায় কাজী জাফরকে দল থেকে বহিষ্কার, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহরের নাটক হয়। ২৫ জুন সরকারের সমালোচনা করায় জিএম কাদেরের প্রতি চড়াও হওয়ার পর নিজে সংসদে সরকারের সমালোচনা করেন হঠাৎ মহাসচিব জিয়াউ্িদ্দন আহমদ বাবলু। মরহুম নাজিউর রহমান ও জিয়াউদ্দিন বাবলুদের খুঁটির জোর সীমান্তের ওপারে। তারা দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে যেমন একদিকে ‘যাত্রা পার্টির’ অভিনেতার মতো পরিকল্পিতভাবে সংসদে সরকার বিরোধী বক্তৃতা দেন; তেমনি মুরুব্বির আস্থায় যাতে ঘাটতি না পড়ে সেজন্য দলের অন্যেরা সরকারবিরোধী কথাবার্তা বললে প্রতিবাদ করেন।     
কাকরাইলের নিজস্ব ভবনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় উদ্বোধনের পর প্রতি সন্ধ্যায় অফিস সরগরম হয়ে উঠে। দলের নেতাকর্মী এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন ভিড় করেন, আড্ডা দেন। চা সিঙ্গারা খাওয়া নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন, খুঁনসুটি করেন। দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদও মাঝে মাঝে আসেন (তোপখানা অফিসে বছরে দু’একবার যেতেন)। তিনি নিজেই সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন; দল এবং চলমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রায়ই এরশাদকে কাছে পেয়ে অফিস পিয়ন থেকে শুরু করে নেতাকর্মীরা সবাই খুশি। কিন্তু সবার মধ্যে কোথায় যেন একটা শূন্যতা। কোথায় যেন বিভাজন। এক সঙ্গে চা সিঙ্গারা খায়; অথচ কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। অবিশ্বাস আর ভীতি যেন তাদের সবার মধ্যে বিদ্যমান। ২৫ জুন মৎসজীবী পার্টির প্রতিনিধি সভায় এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের বক্তৃতার সময় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু যখন ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান তখন নেতাকর্মীদের প্রায় সবাই শ্লোগান দেন ‘দালাল যায়; দালাল যায়’। ‘একটা করে দালাল ধরো সকাল বিকাল নাস্তা করো’। এইচ এম এরশাদকে মঞ্চে অসহায়ের মতো নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে এ নিয়ে হৈচৈ হলেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা যায় অনেকের মধ্যে। এরশাদের ওপর চাপ দিয়ে জিএম কাদেরসহ দু’তিনজন নেতাকে বহিষ্কার করা হতে পারে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। পার্টি অফিসের হৈচৈ থেকে দু’শ গজ দূরে বিজয় নগরের কোনায় ফুটপাতে জাতীয় পার্টির ৪/৫ জন নেতা চা খেতে খেতে নিজেদের  দলের অবস্থা নিয়ে গল্প করছিলেন। তারা সবাই এরশাদের ওপর ক্ষিপ্ত; অথচ লোকটিকে (এরশাদ) নিজের প্রাণের মতোই ভালোবাসেন। জাতীয় পার্টি স্বতন্ত্র কর্মকৌশল নিয়ে অগ্রসর হোক তারা সেটাই প্রত্যাশা করেন। কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী নেতা (এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত) জানালেন, জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ এখন এরশাদের হাতে নেই। দলের ড্রাইভিং সিটে এখন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আর জিয়াউদ্দিন বাবলু। ম্যানেজার হচ্ছেন রওশন এরশাদ। মামলা থেকে বাঁচতে এরশাদ দালালদের দিয়ে দল চালাচ্ছেন। এরশাদ ইচ্ছা করলেও আর দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন না। টাকা আর ক্ষমতার লোভ সংবরণ করতে না পেরে স্বামী এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার পদ দখল করে ‘পাপেট’ নেত্রী হয়ে গেছেন রওশন এরশাদ। নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন না। অন্যেরা যা করতে বলেন তিনি পাপেটের (প্রবীণ শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার বিটিভিতে এ ধরনের অনুষ্ঠান করেন) মতো তাই করেন। ওই নেতার কথার মাঝেই তরুণ একজন নেতা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলেন, লিডার; দালালদের হাতে দলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কে? স্যারই (এরশাদ) দায়ী। এরশাদ নিজেই দালালদের নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন; প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ছুড়ে ফেলেন। হাজার দোষ থাকলেও রুহুল আমিন হাওলাদারের সঙ্গে নেতাকর্মীরা ছিলেন। তিনি সকলকে ম্যানেজ করতে পারতেন। হঠাৎ তাকে ফেলে দিয়ে বাবলুকে মহাসচিব করলেন। অথচ এরশাদ ভালো করেই জানেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলুরা জাতীয় পার্টির নেতা অথচ আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন; এটা ওপেন সিক্রেট। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন ইস্যুতে বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের লিফটে এরশাদের মতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় জিয়াউদ্দিন বাবলুকে নাজেহাল করেছিল কয়েকজন নেতা। এরশাদ উল্টো ওই নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। এরশাদ কেন তাদের বেশি গুরুত্ব দেন সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। ছোট নেতাকে থামিয়ে দিয়ে অঙ্গ সংগঠনের পাতি এক নেতা বলেন, ৫ বছর আগে রিক্সায় চড়তে পারতো না, বাসে যাতায়াত করতো, সেও এখন গাড়ি চালায়। শুধু তাই নয় দু’বছর আগেও যে পিয়নের চাকরি করেছে; ৫০/১০০ টাকার জন্য নেতাদের অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছেন; সেও এখন গাড়ি হাঁকায়। তারা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে না এরশাদের স্বার্থ দেখবে?
গরুর দালাল, জমির দালাল শব্দগুলোর সঙ্গে দেশের মানুষ পরিচিত। বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং সুশীলদের কিছু ব্যক্তি একে অন্যকে ভারতের দালাল, পাকিস্তানের দালাল সম্বোধন করে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলে ‘অন্য দলের দালাল’ থাকেন এমন নজির বেশি নেই। জাতীয় পার্টিতে বেশ কয়েক বছর ধরে সেটা চলছে। ২০০৭ সাল থেকে এ অবস্থা বিরাজমান। টিভির টকশোর আলোচকদের মতে নীতিজ্ঞান বিসর্জন দেয়া দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, তেলবাজ, চাদাবাজ, প্রতারক, চোর, ডাকাত, লুটেরা, দুর্বৃত্ত, দুর্জন, স্বজনপ্রীতিবাজ, আগ্রাসী মানসিকতার কিছু ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ করছে ১৮ দফা কর্মসূচি নিয়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় পার্টিকে। সরকারের দালালী ও দোষামোদী করে প্রচুর অর্থকড়ির মালিক হওয়া এই নেতারা জাতীয় পার্টির আদর্শ নীতি, নৈতিকতার কাছে দায়বদ্ধহীন। তারা দায়বদ্ধ আওয়ামী লীগের কাছে। এরশাদকে কখনো ভুল বুঝিয়ে কখনো বা জেলের ভয় দেখিয়ে এবং রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে পাপেট বানিয়ে রেখে দলকে পরিচালিত করছেন ইচ্ছামতো। এরশাদকে ভালবাসার নামে নিজেদের কুৎসিত চেহারা তথা ছেঁড়া অন্তর্বাস, ছেড়া নোংরা স্যান্ডো ঢাকতে এই লোকগুলো উপরে ভালো মানসির আস্তিন চাপিয়ে সৎ এবং এরশাদপ্রেমী সাজার বৃথা চেষ্টা করছে নির্লজ্জের মতোই। এরশাদ সেটা বুঝেও বুঝছেন না। জাতীয় পার্টির সাবেক এক এমপি বলেন, যারা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, এরশাদের দুর্দিনে জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করে দলে রয়েছেন তাদের মূল্যায় করা হয় না। মূল্যায়ন করা হয় যারা এরশাদকে তোয়াজ করতে পারেন এবং অন্যভাবে দলীয় চেয়ারম্যানকে খুশি করতে পারেন। যার কারণে দলের নিবেদিতপ্রাণ অনেকেই চলে গেছেন আবার অনেকেই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে বর্তমানে দালালচক্রের কারণে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কৌশলের যে খাদে পড়েছে সেখান থেকে তুলে আনা কঠিন হবে। আরেক নেতা বলেন, বর্তমানে দেশ যেভাবে চলছে এভাবে বেশিদিন চলবে না। পরিবর্তন হবেই। তখন জাতীয় পার্টির এই সুবিধাভোগী দালালদের ইরাকের ক্ষমতাসীন নূরে আল মালিকী সরকারের মন্ত্রী এমপিদের মতো বোরকা পড়ে পালাতে হবে। তিনি জানালেন, ইরাকের আইসিস বিভিন্ন শহর বন্দর দখল করছে আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জীবন বাঁচাতে বোরকা পড়ে, নর্তকীর পোশাক পড়ে পালাচ্ছেন; জনগণ থেকে দলকে বিচ্ছিন্ন রাখলে জাপার নেতাদের সে পরিণতি হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

শেয়ার করুন