সুষমাকে ইলিশ চাখার পরামর্শ মমতার : আনন্দবাজারের খবর

0
54
Print Friendly, PDF & Email

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে তিনি যেন বিখ্যাত পদ্মার ইলিশ চেখে দেখেন তাকে সেই পরামর্শ দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে সুষমা-মমতা ফোনালাপ প্রসঙ্গে বলা হয় যে অনেকে মনে করছেন, এই সফরের আগে মমতার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সুষমা এই বার্তাই দিলেন, পশ্চিমবঙ্গকে এড়িয়ে বাংলাদেশ নিয়ে নতুন কোনো অবস্থান নরেন্দ্র মোদির সরকার নেবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা-মেঘনার বুকে এখন আষাঢ়ের কালো মেঘের আনাগোনা। এই ভরা বর্ষায় ঢাকায় গিয়ে ও-দেশের নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে ভারী ভারী আলোচনা তো হবেই, কিন্তু বরিশাল বা ভোলার ইলিশের স্বাদ নিতে যেন ভুল না-হয় নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সে পরামর্শই দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরুদ্দিন আজ বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরের জন্য সুষমা নিরলস প্রস্তুতি নিয়েছেন। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসাবেই তিনি আজ (বুধবার) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।’ কিন্তু পাতের ইলিশে যে কাঁটার ঝকমারিও কম নয়, সফরের প্রস্তুতির সময়ে তা বিলক্ষণ অনুধাবন করেছেন সুষমা। কারণ শুধু তো মমতা নন, ঢাকাকে দেয়া আগের সরকারের প্রতিশ্রুতি পালন করতে না-পারার পিছনে সুষমার নিজের দল বিজেপি-র পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম শাখার কড়া বিরোধিতাও সমান দায়ী।
সন্ধ্যায় ঢাকার বিমান ধরার আগে মমতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন সুষমা। নেহাতই সৌজন্যের ফোনালাপ। সংসদ সদস্য হিসেবে দুজনের পরিচয় দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন বিষয়ে কখনো একসঙ্গে, কখননো পরস্পর-বিরোধী বিতর্কে অংশ নিয়েছেন দুজনে। এনডিএ আমলে বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার সতীর্থও ছিলেন মমতা-সুষমা। অনেকে মনে করছেন, এই সফরের আগে মমতার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সুষমা এই বার্তাই দিলেন, পশ্চিমবঙ্গকে এড়িয়ে বাংলাদেশ নিয়ে নতুন কোনো অবস্থান নরেন্দ্র মোদির সরকার নেবে না।
ঢাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মসৃণ ভাবে এগিয়ে চলায় সবচেয়ে বড় বাধা দুটি বকেয়া বিষয় তিস্তার জলবণ্টন ও স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত করা। এই দুটি বিষয়েই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি রয়েছে। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশে যাওয়ার আগে তাকে ফোন করে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরির একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও শুরু করে দিলেন সুষমা। তবে ওয়াকিবহাল সূত্রের খবর, ফোনালাপে তিস্তা বা স্থলসীমান্ত চুক্তিতে রাজ্যের আপত্তির বিষয়টি সুষমা যেমন তোলেননি, মমতাও সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন। তবে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেন এই ভরা বর্ষায় বাংলাদেশে গিয়ে ইলিশ খেতে না-ভোলেন, সে বিষয়টি বিশেষ করে মনে করিয়ে দিয়েছেন মমতা।
স্থলসীমান্ত চুক্তির জন্য ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। গত লোকসভায় তৃণমূলের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও সমানে বিরোধিতা করায় তা হতে পারেনি। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ও অসম শাখাই মূলত তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। সেই বিজেপি ভোটে জিতে দিল্লির গদিতে বসার পরে মুখে যাই বলুক, আস্থার কিছুটা অভাব অবশ্যই রয়েছে ঢাকার। ভোটের প্রচারে মোদি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বিতাড়নের যে জিগির তুলেছিলেন, তা-ও কপালে ভাঁজ ফেলেছিল ঢাকার।
কূটনীতিকরা মনে করেন, নরেন্দ্র মোদীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ এড়িয়ে জাপান চলে গিয়ে সেই অনাস্থার বার্তাই দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোদিও তা নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন। সে জন্য শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আসা হাসিনার প্রতিনিধি বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার শিরিন শরমিন চৌধুরীকে তিনি বলেন, জঙ্গি উচ্ছেদ ও নিরাপত্তার নানা ক্ষেত্রে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ভারতকে যে ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, দিল্লি তাতে কৃতজ্ঞ। আগের সরকার বাংলাদেশকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নতুন সরকার তার সব ক’টি বাস্তবায়নে আগ্রহী। মোদি বলেন, তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্ব থাকবে।
কূটনীতিকরা বলছেন, দিল্লির নতুন সরকারের তরফে ঢাকার নেতৃত্বকে সেই আস্থার বার্তা দিতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তার প্রথম একক বিদেশ সফরের জন্য বাংলাদেশকে বেছেছেন। সুষমার হাত দিয়ে শেখ হাসিনার জন্য দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ বার্তাও পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। আগামী দুদিনে বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সঙ্গেও আলোচনায় বসবেন সুষমা। তিস্তা এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি রূপায়ণে দিল্লির আন্তরিকতার কথা আরও এক বার বলবেন সুষমা।
বুধবার রাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন সুষমা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, ভারতের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা। তার আতিথ্যের খুঁটিনাটি দেখভাল করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, ফিরতি বিমানে ওঠার আগে শুক্রবার সকালে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সুষমা দেখা করতে পারেন। গত বছর রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েও যাননি খালেদা। ঘটনায় প্রণববাবু যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, বিএনপি-র সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কেও তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। ঢাকার রাজনৈতিক সূত্রের খবর, খালেদাই এখন সে সম্পর্ক মেরামতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সুষমাও বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনতে সময় দিয়েছেন।

শেয়ার করুন