শ্যামনগরে সহস্রাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে, ত্রাণ নেই

0
436
Print Friendly, PDF & Email

শ্যামনগরে টর্নেডোর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ১২শ’ ২৭টি পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনাহারে বেড়ি বাঁধের উপর রাত কাটছে অনেকের। এখনো পর্যন্ত এসব এলাকায় কোন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, পূজামণ্ডপ ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে রমজান নগরে। এখানে একশ’টি বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্তসহ দুই শতাধিক বাড়িঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুধবার সকাল থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা ঘরে ফিরতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তারা আবারও মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে চেষ্টা করছে। প্রাথমিকভাবে শত কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি।

উপদ্রুত এলাকাতে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকে দূষিত পানি পান করে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

সরকারি হিসাব মতে টর্নেডোর আঘাতে পাঁচটি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রামের ৮৭২টি বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ২৬০টি বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। ৬২০টি বাড়িসহ সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দু’টি মন্দির ও একটি করে মসজিদ এবং মাদ্রাসা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে বেসরকারি হিসাব মতে, রমজান নগরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩শ’ ১১টি বাড়িঘর, ঈশ্বরীপুরে ১৫৬টি, মুন্সিগঞ্জে ৩৬০টি ও কৈখালিতে তিনশ’টি বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থানে আরো দুই শতাধিকের মত বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১২শ’ ২৭টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্তের সংবাদ পাওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন এনজিও এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বুধবার সকালে সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত আশরাফ হুসাইন হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বলেন, বাবারে আপনারা আমাগো কিছু সাহায্য দিবেন। আমার কিছুই অবশিষ্ট নেই বলে সংবাদ কর্মীদের জড়িয়ে ধরেন। বলেন, গতকাল সকালে সে নদীতে মাছ ধরতে যায়। বাড়ি ফিরে দেখে তার বাড়িঘর কিছুই নেই। সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কোন রকমে তার স্ত্রী ও এক ছেলে মেয়ে প্রাণে বেঁচে আছে। সবকিছু হারিয়ে তার পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে।

একই অবস্থা মুন্সিগঞ্জের যতিন্দ্রনগর গ্রামের মুজিব গাজীর ছেলে মোহর গাজীর। বাড়ি-ঘর কিছুই নেই। টর্নেডো তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন তার পরিবার খোলা আকাশের নিচে বেড়িবাঁধের ওপর মানবেতর জীবনযাপন করছে। একই অবস্থা এলাকার হেতেলখালী গ্রামের মৃত সলেমান সরদারের ছেলে জাহাঙ্গীর পরিবারের। কান্না দেখারও কেউ নেই। ঘরে চাল-ডাল সব ছিল। কিন্তু ঝড়ে তা সব উড়িয়ে নিয়ে গেছে।

ঈশ্বরীপুরে গেলে দেখা যায় একই অবস্থা। ধুমঘাটা এলাকার হযরত আলীর ছেলে মোবারক শীর্ষ নিউজকে জানান, সব হারিয়ে সে এখন পথের ভিখারি। সকাল হলে কি খাবে তাও সে জানে না।

স্থানীয় উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোন আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল বারী শীর্ষ নিউজকে জানান, আমি ঢাকাতে ট্রেনিং-এ আছি। বিষয়টি শুনেছি। তার এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন তাকে টর্নেডোর খবর জানিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে এলাকাতে এসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সাহায্য করা হবে। তবে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এ সাহায্য সীমিত। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ বরাদ্দ না পেলে এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

আইলা ও সিডরের পরে এটাই এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। দুর্যোগপ্রবণ এ অঞ্চলের মানুষের সুন্দরবনের বাঘ ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্যের কথা বলা হলেও বেশির ভাগ ত্রাণ সামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা যায় সরকার দলীয় নেতাদের পকেটে।

আইলার পরে এ অঞ্চলে প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল ঘরবাড়ি নির্মাণ। যার সিংহভাগ অর্থ লুটপাট হয়েছে। সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টি মনোনীত এইচএম গোলাম রেজা ও স্থানীয় আ’লীগের কয়েক নেতার মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে চলে তুলকালাম কাণ্ড। হয় কয়েক দফা সংঘর্ষ। সর্বশেষ এসব বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয় স্থানীয় এমপি। সরকারের বিগত সাড়ে পাঁচ বছর পুরোটাই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের লুটপাট ও শোষণের বছর।

১৫ মিনিটের টর্নেডোয় শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী, ভেটখালী ও ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এতে বিধ্বস্ত হয়েছে সহস্ররাধিক ঘরবাড়ি। উপড়ে পড়েছে কয়েক হাজার গাছপালা। ঘরচাপা পড়ে নারী ও শিশুসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। মৃত্যু হয়েছে সাতটি গবাদি পশুর।

মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে উপকূলবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হওয়া টর্নেডোয় ২৩টি গ্রাম এ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এর পরপরই উপজেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চালান।

স্থানীয় গ্রামবাসী নাজমুল, আহসানসহ অন্যরা শীর্ষ নিউজকে জানান, সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ করেই টর্নেডো উপকূলীয় ঐ জনপদে আঘাত হানে। ১৫ মিনিট ধরে চলা টর্নেডোর আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে চুনকুড়ি, মীরগাং, হেতালখালী, পার্শ্বেখালী, ছোটভেটখালী, টেংরাখালী, নুতনঘেরী, কালিঞ্চি, গোলাখালী, ভেটখালী, রমজাননগর, ও জয়াখালীসহ প্রায় ২৩টি গ্রামের আট শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।

এছাড়া ভেটখালী বাগদিপাড়ার শিবমন্দির ও ঠাকুরঘেরীর বনবিবি মন্দির, ভেটখালীর আলম চেয়ারম্যান বাড়ির মাদ্রাসা ও মসজিদ, নতুনঘেরী এলাকার জাগরণী চক্রের একটি বিদ্যালয়সহ সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিহ্ন হয়।

এদিকে টর্নেডোর সময় ঘরচাপা পড়ে মীরগাং গ্রামের মনিরা খাতুন, সিংহড়তলী গ্রামের পরিতোষ মণ্ডল, স্বরসতি বালা, চুনকুড়ি গ্রামের ইস্রাফিল হোসেন ও যতীন্দ্রনগর গ্রামের কদম আলীসহ প্রায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়। এছাড়া বজ্রপাতের আঘাতে শৈলখালী মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী, রজব আলীর মেয়ে খাদিজা আক্তার ও সুন্নত গাজীর মেয়ে খাদিজা মারাত্মক আহত হয়।

টর্নেডোর আঘাতে চুনকুড়ি গ্রামের আবুল বাসার মোড়ল, ইয়াকুব মোল্যা, ভেটখালীর আকরাম তরফদার, বিমল সরদার, টেংরাখালীর শহীদ কয়াল, রনজিত কাহার, স্বরজিত কাহার, দুখে ঢালী, সুনীল বদ্যি, নওশাদ সানা, আব্দুর রাজ্জাক, জয়াখালীর আবুল গাবইন, মিজানুর, সফিকুল, কিনি বেগম, আবুল গাইন ও মিজানুর রহমানসহ ২৩ গ্রামের প্রায় সহস্ররাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। টর্নেডোর আঘাতে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর প্রায় ছয় হাজার মানুষকে খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

টর্নেডোর পরেই সকাল ১০টার দিকে শ্যামনগরের ইউএনও সৈয়দ ফারুক আহমেদ (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জালাল উদ্দীন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জালাল উদ্দীন শীর্ষ নিউজকে জানান, টর্নেডোর আঘাতে পাঁচটি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ২৬০টি বাড়ি সম্পূর্ণ, আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬২০টি বাড়িসহ সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দু’টি মন্দির ও একটি করে মসজিদ এবং মাদ্রাসা। তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আট মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া নগদ অর্থ সহায়তার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আব্দুল জলিল জানান, বুধবার সকাল থেকে জামায়াত শিবিরের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সামগ্রীসহ ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রায় তিনশ’ পরিবারকে জামায়াতের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

শেয়ার করুন