লিজেন্ড : এক কিংবদন্তির কথা

0
117
Print Friendly, PDF & Email

What is a genius? What is a luring legend? What is a megastar? Michael  Jackson- that’s all…   -Elizabeth Taylor, 1987

Michael Jackson was not an artist who comes along once in a decade, a generation, or a lifetime. He was an artist who comes along only once, period. He studied the greats and became greater. He raised the bar and then BROKE the bar!, I was mesmerized when he did his iconic moonwalk, I was shocked! It was magic!! He soared into orbit… and never came down. The more I think about Michael Jackson, the more I feel the ‘king of Pop’ was not big enough for him. I think he was simply ‘The greatest Entertainer that ever lived?  -Berry Gordy, 2009

উপরের এই উদ্ধৃতি এমন একজন শিল্পীর জন্য, যে গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী সর্বকালের সবচেয়ে সফল এন্টারটেইনার। ২০০৯ সালের আজকের দিনে (২৫ জুন) ৫১ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। যে জীবিত অবস্থাতেই আর্টিস্ট অফ দ্য সেঞ্চরি হয়েছেন। সে ১৩টি গ্র্যামিসহ একাধিকবার আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, বহুবার MTV অ্যাওয়ার্ড এবং দেশ-বিদেশের অগণিত অ্যাওয়ার্ডস পেয়েছেন। যার দীর্ঘ সংগীতজীবনে আমেরিকার সব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনোভাবে তার সঙ্গে সংযোগ রেখেছেন। যাতে তার অবিশ্বাস্য ভক্তকুল দ্বারা তাদের নির্বাচনী সমর্থন বাড়াতে পারেন। একমাত্র যার আছে সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবামের রেকর্ড— মাইকেল জ্যাকসনের কথাই উল্লেখ করা হচ্ছে। একমাত্র এই শিল্পীর স্কুলিং ও নিজস্বতায় প্রভাবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছে একঝাঁক খ্যাতনামা শিল্পী। এমনকি  আজকের জাস্টিন বিবার পর্যন্ত।

প্রথম দিকের জীবন

পুরো নাম : মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। জন্ম ২৯ আগস্ট, ১৯৫৮, গ্যারি ইন্ডিয়ানায়। বাবা-মা যথাক্রমে জোসেফ ওয়াল্টার জ্যাকসন ও ক্যাথরিন জ্যাকসন। পাঁচ ভাই ও তিন বোন, সবাই কোনো না কোনো সময় পেশাগতভাবে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ছোট বোন জ্যানেট জ্যাকসন একজন সফল সংগীত শিল্পী।স্টিল টাউন নামে-খ্যাত গ্যারি ইন্ডিয়ানার এক স্টিল ফ্যাক্টরির ক্রেন-চালক ছিলেন মাইকেলের পিতা। সংগীতের প্রতি তার ছিল দুর্বার আকর্ষণ। অবসর কাটানোর জন্য ‘ফেলকন’ নামে একটি ব্যান্ডও গড়েছিলেন তিনি। পরে তিনি নিজের বড় তিন ছেলে টিটো, জ্যাকি ও জারমেইনকে নিয়ে গড়ে তোলেন সংগীত দল ‘দ্য জ্যাকসন ব্রাদার্স’। অল্প সময়ের মধ্যেই এই দলে মার্লোন ও মাইকেলকে অন্তর্ভুক্ত করে দলের নামকরণ করা হয় ‘দ্য জ্যাকসন-5’। সময়টি ১৯৬৩ সাল। দলটি গ্যারি ইন্ডিয়ানা ও আশপাশের শহরগুলোতে নিয়মিত শো করার মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৭/৮ বছর বয়সেই মাইকেল তার অসাধারণ পারফরমেন্সের কারণে লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। স্টেজের ওপর সে ছিল জাদুর মতো। দর্শকদের নিমেষে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলত। ওই সময় দলের প্রধান গায়ক ছিলেন জারমেইন জ্যাকসন। মাইকেলের ক্ষণজন্মা প্রতিভা পেছনে অন্যদের সঙ্গে কোরাস গাইবার জন্য ছিল না। অল্প দিনের মধ্যেই ছোট্ট মাইকেল দলটির প্রধান গায়কে পরিণত হয়। তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর, সালটি ১৯৬৭।

১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ‘জ্যাকসন-5’ বিভিন্ন ট্যালেন্ট শোতে অংশ নিয়ে বিজয়ী হলে তাদের প্রচার আরও প্রসারিত হয়। অ্যাপেলো এবং রিগ্যাল থিয়েটারসহ বিখ্যাত সব থিয়েটারে অনুষ্ঠান করার সময় মাইকেল গভীর মনযোগের সঙ্গে সে সময়ের সেরা সব শিল্পীর পারফরমেন্স পর্যবেক্ষণ করত। অলক্ষ্যে এভাবে সে নিজেকে অনন্য সাধারণ এক শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে থাকে। মাইকেলের আইডল ছিল জোমস ব্রাউন, স্যামি ডেভিস জুনিয়র, মার্ভিন গ্রে, জ্যাকি উইলসন, জেন কোল এবং ফ্রেন্ড অ্যাসটেয়ার মতো শিল্পীরা।এ সময় ‘স্টিল টাউন রেকর্ড’ লেবেলের অধীনে তাদের একাধিক রেকর্ড (সিঙ্গেলস) রিলিজ হয়। ববি টেইলর নামে তখনকার এক প্রসিদ্ধ গায়ক জ্যাকসন-5 স্টেজ শো দেখে বিশেষত মাইকেলের পারপরমেন্সে বিমোহিত হন। তিনি ‘মো টাউন রেকর্ড’-এর অধিকর্তা বেরি গর্ডিকে তাদের কথা বলেন। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে বেরি গর্ডির পক্ষে জ্যাকসন 5-এর অডিশন নেওয়া হয়।মো টাউনে প্রবেশ

১০ বছরের মাইকেল তার বিরল ‘হাই পিচ’ কণ্ঠে ‘হু ইজ লাভিং ইউ’ গানটি গান। এর অরিজিনাল গায়ক ছিলেন স্মোকি রবিনসন। যে নিজেই সব সময় মজা করে বলতেন, মাইকেল তার থেকেও ভালো করে গানটি গাইতে পারে। যা হোক, সেদিন থেকে সেই যে সত্যিকার অর্থে তার সাফল্যের শুরু, আর কখনই তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭০ সাল। অর্থাত্ পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত যে সুপার হিট গানগুলো সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো— ( ABC ( Rocking Robin ( I want you back ( Can you remember? ( I’ll be there ( Who’s loving you? এবং Never can say good buy ইত্যাদি। গানগুলোর প্রধান গায়ক ছিলেন মাইকেল এবং তার পাঁচ ভাই শুধু কোরাস ও হামিংয়ে অংশ নেন।

এ সময় মা এবং তিন বোন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাবা-ভাইদের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়াতে বাস করছিলেন মাইকেল। মায়ের অসম্ভব অনুরক্ত মাইকেল ভীষণ হোম সিক ছিলেন। এ ছাড়া তাকে গ্রুমিংয়ের কারণেও বিখ্যাত গায়িকা ডায়ানা রসের বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ডায়ানা রস TV-তে দলটিকে এভাবে উপস্থাপন করেন— ‘Here comes Michael Jackson and The Jackson-5!’ অবধারিতভাবে মাইকেল সবাইকে ছাপিয়ে উঠছিলেন। এ সময় মা-বোনেরা ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে এসেছে।

TV চ্যানেলগুলোতে ‘Jackson-5′ ভিত্তিক কার্টুন সিরিজ শুরু হয়, টি মার্টে, আইসক্রিমের র্যাপারে, ম্যাগাজিনের কভারে, শহরের যত্রতত্র বিশাল সব পোস্টারে মাইকেলের মুখ, পেছনে তার পাঁচ ভাই। এ সময় তার ভাই জারমেইন ঠাট্টা করে বলেন, If we die in a plane crash, the headline will be “Michael died in a plan crash and his brothers were also there!’১৯৭২ সালে তার সোলো ব্যতিক্রমী গান ‘BEN’ চার্টের এক নম্বরে জায়গা করে নেয়। এক মিলিয়ন কপি বিক্রি হওয়া অবাক করা মেলোডিয়াস এ গানটি গাওয়া হয়েছিল একটি ‘ইঁদুর’কে নিয়ে। গানটি অস্কার পুরস্কার জিতে নেয় এবং আশ্চর্য রকম পরিপক্বতার সঙ্গে ১৪ বছরের মাইকেল গানটি অস্কার অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে উপস্থিত সব বোদ্ধা-দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেন। নিজেদের অজান্তেই বিশাল হলজুড়ে দর্শকরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হলটিকে করতালিতে মুখরিত করে তোলে।

বিশ্বজুড়ে মাইকেলরা শো করে বেড়াচ্ছেন। একটি বয় ব্যান্ড হিসেবে তাদের সাফল্য তখন ‘বিটলস’-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সাফল্যের সঙ্গে বাড়ছে বিড়ম্বনা। হুজুগে ভক্তকুল দিয়ে মবড হওয়া, শো শেষে নিঃশব্দে ব্যাক ডোর দিয়ে ভ্যানে ওঠা এবং প্রতি মুহূর্তে ১০/১৫ জন দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত থেকেও নিস্তার ছিল না।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ সাতটি বছর মো টাউন রেকর্ডের অধিকর্তা বেরি গর্ডির কাছ থেকে শো বিজনেসে উত্থান-পতন, এর অন্ধকার দিক সম্পর্কে অনেক শিখেছেন মাইকেল। পরবর্তী জীবনে যা তার পাথেয় হয়েছিল। তাদের মধ্যে এই চমত্কার বন্ড থাকা সত্ত্বেও কোথায় যেন তার সৃষ্টিশীল মনে একটা অভাব বোধ ছিল। সবটুকু যেন প্রকাশ করা যাচ্ছে না। শ্রেষ্ঠ কাজটি যেন ঠিক তৈরি হচ্ছে না। আরও একটু নতুনত্ব, আরও একটু অভিনবত্ব চাই। মো টাউনে মাইকেলের গান লেখার স্বাধীনতা ছিল না। এ জন্য বেতনভোগী গীতিকাররা ছিলেন। অথচ পরবর্তীকালে মাইকেলের বিখ্যাত সব গানের লিরিকস তার নিজেরই লেখা।

দ্য জ্যাকসনস- এপিক রেকর্ডে যোগদান

মাইকেল তার বাবার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি মাইকেলের সঙ্গে একমত হন। অনেক আইনি ঝামেলার মধ্য দিয়ে এমন কি ‘জ্যাকসন-5’ নামটি ও খোয়াতে হয়, অবশেষে ১৯৭৫ সালে শুধু জারমেইন জ্যাকসন বাদে (বেরি গর্ডির মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন তিনি) সব জ্যাকসন ভাইরা মো টাউনের চুক্তি থেকে মুক্ত হয়ে ‘এপিক রেকর্ড’-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। মো টাউনের সঙ্গে কিশোর মাইকেলের সোলো এবং প্রধান গায়ক হিসেবে মোট ৫২টি গান রিলিজ হয়েছিল। মাইকেলের অন্যসব গানের মতো এসব গানের চাহিদা এবং বিক্রি তার মৃত্যুর পর আরও একবার হু হু করে বেড়ে যায়।

এপিক রেকর্ডের জন্য ‘দ্য জ্যাকসনস’ তাদের প্রথম গোল্ড রেকর্ড সার্টিফিকেট পায় ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ সময় মাইকেলের জনপ্রিয়তা এতটাই উচ্চ মার্গে ছিল যে, বেরি গর্ডি আগে না রিলিজ করা মাইকেলের ১১টি গান, ‘মো টাউন স্পেশাল— দ্য জ্যাকসন ফাইভ’ নামে রিলিজ করেন। ১৯৭৭ সালের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল মে মাসে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের রজতজয়ন্তীতে দ্য জ্যাকসনসের সংগীত পরিবেশন। পরবতী সময়ে মাইকেল এটিকে তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান বলে উল্লেখ করেন।সে বছরই মাইকেল লেজেন্ডারি সংগীত পরিচালক কুইন্সি জোন্সের সঙ্গে ‘The wiz’ এর সেটে পরিচিত হন। এই ছবিটিতে মাইকেল অভিনয় এবং কুইন্সি সংগীত পরিচালক ছিলেন। গায়িকা ডায়ানা রস ছিলেন প্রধান নারী চরিত্রে। বয়সের দুস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও কুইন্সের সঙ্গে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নিউইয়র্কে একাকী জীবনে মাইকেল তখন স্বতন্ত্র ক্যারিয়ারের কথা ভাবছেন। কুইন্সি জোন্সকে সে তার জন্য একটি অ্যালবাম প্রযোজনা করতে অনুরোধ করে। কুইন্সিও মাইকেলের প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

অফ দ্য ওয়াল

১৯৭৯ সাল পর্যন্ত মাইকেল ও তাদের দল এক কন্টিনেন্ট থেকে অন্য কন্টিনেন্টে বিরামহীনভাবে স্টেজ শো করেন। এরই মধ্যে কুইন্সির সঙ্গে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘Of the wall’-এর পরিকল্পনাও শেষ করেন। সে বছরের আগস্টে এটি রিলিজ হয় তার সহ-প্রযোজনায়। মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পায় অ্যালবামটি। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির আগের সব রেকর্ড ভেঙে একই অ্যালবাম থেকে চারটি গান শীর্ষ দশের এক থেকে চার পর্যন্ত আসন দখল করে নেয়। এমনকি দুটি গান ‘Dont stop Till you get Enough’ এবং I want to Rock with you’ টপ চার্টে এন্ট্রির পর অ্যালবামটি প্লাটিনাম সার্টিফিকেট পায়। পৃথিবীজুড়ে ১২ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। কণ্ঠের অভিনবত্ব, বিশেষ ভঙ্গি, গায়কী ও পরিপক্বতার জন্য আজ অবধি অ্যালবামটি মাইকেলের সৃষ্ট অন্যতম ক্ল্যাসিক হয়ে আছে। দুই ক্যাটাগরিতেই ‘অব দ্য ওয়াল’ গ্র্যামি লাভ করে।

থ্রিলার

১৯৮২ সালে রিলিজ হয় তার গ্রাউন্ড ব্রেকিং অ্যালবাম ‘থ্রিলার’। যা সর্বকালের সর্বোচ্চ বিক্রীত অ্যালবাম হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করে। থ্রিলার একটি মিউজিক ভিডিও, যাকে মাইকেল বলতেন শর্ট ফিল্ম। যা দর্শকদের সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়। MTV-তে এর আগে ব্ল্যাক আর্টিস্টদের গান প্রদর্শিত হতো না। থ্রিলারের অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা এমনই দুর্বার ছিল যে, MTV কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থেই সব নিয়ম ভেঙে থ্রিলার প্রদর্শন শুরু করে। ফল স্বরূপ MTV একটি সাধারণ মিউজিক চ্যানেল থেকে উন্নীত হয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে। মাইকেল জ্যাকসনের ম্যাজিক এবং মানুষের মধ্যে তার জন্য ম্যাডনেস ছিল এমনই!

এত কম বয়সে সর্বকালের সেরা রেকর্ড গড়ার মতো সাফল্য পেলেও সে জোয়ারে ভেসে যাননি মাইকেল। শুধু ভাইদের জীবিকা ও ক্যারিয়ারের খাতিরে তখনো ‘দ্য জ্যাকসনস’-এর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন। ১৯৮২ সালজুড়ে ভাইদের সঙ্গে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ‘Victory’ ট্যুরে ঘুরেছেন। এ সময় তার জন্য ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং ক্রমেই অনুধাবন করছিলেন যে, এভাবে তার প্রতিভার ক্ষয় হচ্ছে। অবশেষে মাইকেল জানিয়ে দিলেন, এটাই তার দ্য জ্যাকসনসের সঙ্গে শেষ ট্যুর। এর পর আর তিনি এই পারিবারিক দলটির সঙ্গে যুক্ত থাকেননি। যদিও আজীবন মাইকেল আর্থিকভাবে তার সমগ্র পরিবারকে সহায়তা করে গেছেন।

একই সঙ্গে আটটি গ্র্যামি লাভের রেকর্ড

১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই সঙ্গে আটটি গ্ল্যামি জেতার পর মাইকেল আরও একবার প্রমাণ করেন, তিনিই সেই ব্যতিক্রমী শিল্পী, যে সংগীত ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত সব ধারা বদলে দিতে পারেন। কুইন্সি জোন্স যথার্থই বলেছেন, Michael re-shaped the music industry’ থ্রিলারের সর্বমোট সাতটি গান একে একে টপ চার্টের শীর্ষে যায় এবং প্রতিটি গান সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করে। এভাবে শুধু থ্রিলারেরই অন্য একটি গান চার্টের শীর্ষে এসে আগেরটি দুই নাম্বারে নামিয়ে আনে। টানা এক বছর চার্টের এক থেকে সাত নম্বরের জায়গাগুলো একা থ্রিলারই দখল করে রেখেছিল। গানগুলো হচ্ছে — Thriller ( Beat it ( Billie jean ( The girl is mine ( Human Nature ( Pretty young thing এবং Wanna be starting something.

প্রথম ‘মুন ওয়াক’

এ সময় ‘মো টাউন রেকর্ড’ কোম্পানি তাদের ২৫তম অর্থাত্ রজতজয়ন্তী মহা আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করার প্রস্তুতি নেয়। বেরি গর্ডি স্বয়ং মাইকেলকে তার ভাইদের নিয়ে এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। একজন চৌকস শো ম্যানের মতো মাইকেল শর্ত জুড়ে দিলেন, তাকে থ্রিলারের একটি গানে এককভাবে পারফর্ম করতে দিলে তিনি অংশগ্রহণ করবেন। যদিও থ্রিলার ‘এপিক রেকর্ড’ লেবেল থেকে রিলিজ হয়, তথাপি বেরি গর্ডি মরিয়া ছিলেন মাইকেলের একটি পারফমেন্সের জন্য এবং শর্তে রাজি হন। ১৬ মে, ১৯৮৩ সালের সন্ধ্যার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ৪৭ মিলিয়ন আমেরিকান অবাক-বিস্ময়ে দেখল ইলেকট্রিফাইং এক মাইকেল জ্যাকসন ও তার ‘মুনওয়াক’। প্যাসাডোনা সিভিক অডিটোরিয়ামে বিলি জিন গানটির সঙ্গে মাইকেল যখন পারফর্ম করছিলেন, উপস্থিত প্রতিটি দর্শক চোখের পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছিলেন। যেন এই স্পেলবাইন্ডিং চারটি মিনিটের একটি মুহূর্তও অদেখা চলে না যায়।

বিশ্বের সর্বকালের সর্বোচ্চ বিক্রীত অ্যালবাম

পরের দিন টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাফ, ফ্যাক্স ও টেলিফোনে দিশাহারা অবস্থা মাইকেলের। এর মধ্যে একটি ছিল হলিউড মিউজিক্যালস-খ্যাত লিজেন্ডারি অভিনেতা/নৃত্যশিল্পী ফ্রেড অ্যাসটেয়ারের। যিনি  লিখেন ‘you are hell of moves man! Teach me how do moonwalk’ থ্রিলারের বিক্রি বিদ্যুত্ গতিতে বাড়তে থাকে। এমনই ছিল মাইকেলের শিল্পসম্মত বাণিজ্যিক কৌশল! অথচ এই থ্রিলারের প্রথম ‘লুক’ দেখে মাইকেল শিশুর মতো দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদেছিলেন, জানান কুইন্সি জোন্স। পুরো মিউজিক ভিডিওটি তিন/চার মাস সময় নিয়ে রি-শুট করা হয়েছিল। এতটাই পারফেকশনিস্ট ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন!

বিটলসের ক্যাটালগ কিনলেন

১৯৮৪ সালের জুলাইয়ে মাইকেল ATV  মিউজিক পাবলিশিং কোম্পানিটি ৪৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনে নেন। এর মাধ্যমে মাইকেল শুধু নিজের গানের পাবলিশিং রাইটই নয় বরং বিটলস এবং এলভিস থেকে শাকিরাসহ অন্যান্য আরও কিছু বিখ্যাত শিল্পীর গানের কপিরাইটের মালিকানা লাভ করেন। এটি ছিল মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি সিদ্ধান্ত। ওই বয়সে তার সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক বুদ্ধি আজ মৃত্যুর পরও তাকে মিলিয়ন, মিলিয়ন ডলার আয় এবং জীবিত বিখ্যাত সব সংগীত শিল্পী থেকে অধিক আয়ের খ্যাতি এনে দিয়েছে।এ সময় মাইকেল তার বাবাকে অ্যাটর্নির মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে তার ম্যানেজারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।

এক কিংবদন্তির মৃত্যু

২৫ জুন, ২০০৯ মাত্র ৫০ বছর বয়সে নিজের ডাক্তারের উপস্থিতিতে তারই দেওয়া ঘুমের ওষুধের ওভার ডোজে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। যে মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিশ্বজুড়ে লিজেন্ডে পরিণত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর খবর অপ্রতিরোধ্য আগুনের মতো মুহূর্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীকে তার শোকে মুহ্যমান করে দেয়। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবারই অনুভূতি একাকার হয়ে যায়। যা সমগ্র বিশ্বকে এক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। ইন্টারনেট, রেডিও, টিভি চ্যানেলসহ সব রকম মিডিয়ায় খবরটি প্রতি মিনিট প্রচারিত হতে থাকে।  গুগলসহ অন্য সব সার্চ ইঞ্জিন অত্যধিক ট্রাফিকের কারণে কয়েক ঘণ্টার জন্য অচল হয়ে যায়। CNN-কে এক ঘণ্টায় ২০ মিলিয়ন পেজ’ রিপোর্ট তৈরি করতে হয়, যা তাদের জন্য রেকর্ড সৃষ্টি করে। কোনো মানুষের জন্য এমনটি আগে কখনো হয়নি।পৃথিবীকে তিনি এক বর্ণ-বৈষম্যহীন আবাস হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। আজীবন এ জন্য চেষ্টা করে গেছেন। মৃত্যুর দুবছর আগে সম্পাদন করা উইলে তার এস্টেটের এক তৃতীয়াংশের আয় তিনি দুস্থ এবং বর্ণবাদের শিকারদের জন্য প্রতি মাসে নিয়মিত ডোনেট করে যেতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

The Final Curtain call

জগেক মাইকেল জ্যাকসন পূর্ণ করে গেছেন তার সংগীত আর মানবতার উদাহরণ দিয়ে। এভাবে তার আগে কেউ পারেনি, পরেও পারবে কিনা সন্দেহ। জীবনে করা সব পারফর্মেন্সের মতোই মৃত্যুর পর তার মেমোরিয়াল সার্ভিসও ছিল লার্জার দেন লাইফ। সে দিন তার ১১ বছরের মেয়ে বাবা হিসেবেও তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে— “Ever since I was born, daddy has been the best father you can ever imagine… I just want to say, I love him so much.” তার কান্নায় ভেঙেপড়া শব্দ …নিঃশব্দ মেমোরিয়াল হলের প্রতিটি মানুষকে অশ্রুসজল করে তোলে। পেছনে জায়েন্ট স্ক্রিনে মাইকেল! আর স্টেজের উপর লাল গোলাপে ঢাকা মাইকেলের কফিন। তার অনুরক্ত এক গায়ক আবার তারই গান গাইলেন— Born to amuse, To inspire, To delight, Here one day, gone one night,/ like a sunset,/ Dying with the rising of the moon/ Goon too soon…

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন