নারায়ণগঞ্জ-৫ উপনির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের উৎসব

0
119
Print Friendly, PDF & Email

লিম ওসমানের ছবি ও তাঁর লাঙ্গল প্রতীকসংবলিত রঙিন পোস্টার শোভা পাচ্ছে নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রকাশ্যে অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন জাতীয় পার্টির এই প্রার্থী। তাঁর পক্ষে সাংসদ শামীম ওসমান ও লিয়াকত হোসেন প্রচারণা চালাচ্ছেন।
২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে উপনির্বাচন৷ প্রচারণার নামে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব চলছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনকে নিয়মে পরিণত করেছেন ওসমান পরিবারের সদস্য ও তাঁদের কর্মীরা। আজ মঙ্গলবার সকাল আটটায় প্রচারণা শেষ হচ্ছে৷
অভিযোগটা যেহেতু ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে, তাই একেবারেই নীরব রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। দেখেও না দেখার ভান করছেন উপনির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য নির্বাচন কমিশনাররাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কোনো নির্বাচন কমিশনার এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ দেখতে নারায়ণগঞ্জে যাননি। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও সেখানকার পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেননি। শুধু ঢাকায় একটি বৈঠক করেই দায়িত্ব শেষ করেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম এখন পর্যন্ত সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ১২টি অভিযোগ করেছেন। একটি অভিযোগের ব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। কিন্তু বাকিগুলোর ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অবশ্য সেলিম ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। যাদের কাছে অভিযোগ গেছে, তারা নিশ্চয়ই তা খতিয়ে দেখছে। এদিকে একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেলিম ওসমানের সমর্থক ও শামীম ওসমানের লোকেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। পীরগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দর এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের আহ্বায়ক মতিউর রহমান ও ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেল এলাকায় ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়াচ্ছেন। আকরামের পথসভায় বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে৷ গত রোববার আকরামের একটি পথসভার স্থান থেকে মঞ্চ ও মাইক সরিয়ে দেওয়া হয়৷ পুলিশের তালিকাভুক্ত এই দুই সন্ত্রাসীর ব্যাপারে কমিশনে অভিযোগ করা হলেও নির্বাচন কর্মকর্তারা একেবারেই নীরব।
জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা মিহির সারোয়ার মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁরা প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে দেখছেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সেখানকার নির্বাচন অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো তদন্ত করার পরিবর্তে এখানকার কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাঁকে ফোন করে অভিযোগের কথা জানিয়ে দেন। ফলে প্রার্থী আগে থেকেই সাবধান হয়ে যান।
নির্বাচনী আচরণবিধিতে জনসভা করার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু সেলিম ওসমান সেটাই করছেন। কখনো নির্বাচনী জনসভা, কখনো বা তাঁর ভাই নাসিম ওসমানের স্মরণসভার নামে জনসভা করছেন তিনি। এসব জনসভায় সাংসদ শামীম ওসমান ও লিয়াকত হোসেন ছাড়াও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুল হাইও যোগ দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সাংসদের যুক্ত হওয়ার কোনো নিয়ম আচরণবিধিতে নেই।
গত মঙ্গলবার রাতে দেওভোগে একটি তৈরি কাপড়ের মার্কেটে আগুন লাগে। এর পরদিন সেলিম ওসমান সেখানে গিয়েই ঘোষণা দেন, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেবেন তিনি। গতকাল সোমবার সেখানকার কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা সেলিম ওসমানের এই অনুদান দেওয়ার ঘোষণার কথা স্বীকার করেন। আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এ ধরনের ঘোষণা আইনবিরোধী। তা ছাড়া সেলিম ওসমানের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে দিনের বিভিন্ন সময়ে মাইক বাজতে দেখা গেছে। আচরণবিধি অনুযায়ী, বেলা দুইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মাইক বাজানোর নিয়ম আছে। এখানে সে নিয়ম মানা হচ্ছে না।
স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম প্রথম আলোকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি তাঁরা অনেকবার কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। কিন্তু কমিশন ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের আচরণ দেখে সংশয়ে আছি ভোট আদৌ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি না।’ আকরামের সমর্থনে গঠিত নাগরিক পরিষদের নেতা জহিরুল ইসলামের মতে, রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন।
সদর ও বন্দর থানার দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কয়েক বছর ধরেই নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধেও ওসমান পরিবারের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আছে। এই দুই থানার ওসির ব্যাপারে স্বতন্ত্র প্রার্থী অভিযোগ করলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে দুই সরকারি কর্মকর্তা সেলিম ওসমানের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন—এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পুলিশের উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে আর ভূমি অফিসের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের বরাবর চিঠি দিয়েছে কমিশন।
দুই কর্মকর্তার একজন হলেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) কর্মরত পরিদর্শক মহিউদ্দিন। তিনি ছুটি নিয়ে বন্দরে লক্ষ্মণখোলায় তাঁর বাড়িতে কয়েক দিন ধরে অবস্থান করছেন। তাঁর বাড়ি ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে। আর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা কামাল হোসেন৷ তাঁরা প্রকাশ্যে সেলিম ওসমানের পক্ষে প্রচারণা চালান বলে অভিযোগ আছে৷
কালোটাকা ছড়ানোর অভিযোগ: স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম অভিযোগ করেছেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের লোকজন ভোট কেনার জন্য টাকা ছড়াচ্ছেন এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। গতকাল নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
তবে সেলিম ওসমান প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন৷

শেয়ার করুন