মনা বোমা হামলা মামলা৮ জনের ফাঁসি, ৬ জনের যাবজ্জীবন

0
66
Print Friendly, PDF & Email

রমনা বোমা হামলা মামলার রায়ে মুফতি হান্নানসহ ৮ জনের ফাঁসি ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- মুফতি হান্নান, আরিফ হাসান সুমন, মওলানা আকবর হোসাইন, মওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আব্দুল হাই।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মওলানা আবু তাহের, মওলানা আব্দুর রউফ, মওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, মওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ ও হাফেজ মওলানা ইয়াহিয়া।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, আরিফ হাসান সুমন, মওলানা আকবর হোসাইন কারাগারে আটক বাকীরা পলাতক রয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের অনাদায়ে আরও এক বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।

রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ইতিহাসের বর্বরোচিত বোমা হামলার ঘটনার ১৩ বছর পরে সোমবার এ রায় ঘোষিত হলো। রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. রুহুল আমিন।

বেলা পৌনে বারটায় বহুল আলোচিত এ মামলার রায় পড়া শুরু করেন বিচারক। রায় পড়া শেষ হয় বেলা বারটায়।

আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, আরিফ হাসান সুমন, শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মওলানা আবু তাহের, মওলানা আব্দুর রউফ, মওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, মওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মওলানা ইয়াহিয়া ও মওলানা আকবর হোসাইন কারাগারে ছিলেন। তাদেরকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।

আসামি মওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আব্দুল হাই পলাতক আছেন।

এর আগে গত ১৬ জুন মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রায় প্রস্তুত না হওয়ায় বিচারক ২৩ জুন রায়ের জন্য দিন পুনর্নির্ধারণ করেন।

গত ৮ ও ১৮ মে রাষ্ট্রপক্ষে ও আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। গত ১৮ মে আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন রাষ্ট্রপক্ষের এসএম জাহিদ সরদার। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সকল আসামির বিরুদ্ধে ৩০২ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সকলেরই মৃত্যুদণ্ড আশা করেছিলাম। ৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় তিনি হতাশ। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন।

অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী টিএম আকবর যুক্তিতর্কের জবাবে আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে সকল আসামির খালাস দাবি করেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ ও জসিম উদ্দিন বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। এ রায়ে তারা ক্ষুব্ধ। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তারা আপিল করবেন।

বিচারক রায়ের পর্যালোচনায় বলেন, বাঙালি জাতি ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শ নির্বিশেষে চিরন্তনভাবে বাংলা বছরের ১ম দিন তথা পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ করে আসছে। এটি ধর্মীয়, গোত্রীয়, সামাজিক সবসীমা অতিক্রম করে সব বাঙ্গালীকে একই সূত্রে আবদ্ধ করে।

ছায়ানট ৬০ এর দশক থেকে রমনা উদ্যানের রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আসছে। সারাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হলেও রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আবেদন অনেক বেশি। লোক সমাগমও হয় বেশি। এ অনুষ্ঠানের কোনো পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি, ধর্ম বা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে কোনো প্রচারণা থাকে না। এটি একটি সার্বজনীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুতরাং এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কারও বিরোধ থাকার কথা নয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, যুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের কোনো অনুষ্ঠান, লোকালয় কিংবা জনসমাবেশে আত্মঘাতী কিংবা দূর নিয়ন্ত্রিত বোমা হামলা হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বোমা হামলা হয়েছে। হামলাগুলোর কোনোটির লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কখনও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কখনও কোনো সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, কখনও বিচারক, আদালত কিংবা আইনজীবী। কিন্তু রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলায় কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ের কারও বিরুদ্ধে মামলাটির বিশ্লেষণে পাওয়া যায়নি।

হামলাকারীরা নিছক ত্রাস সৃষ্টি, জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো ও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যেই বাঙালি জাতির এ মিলনমেলায় হামলা করা হয়েছে। যা ছিল নৃশংস, নির্মম, বর্বর, জঘন্য ও ক্ষমার অযোগ্য।

আরও বলা হয়, এটি ক্লূ-লেস বা সূত্রবিহীন হত্যাকাণ্ড। মামলাটি দীর্ঘদিন তদন্ত না হওয়ায় হত্যাযজ্ঞের কোনো রহস্য উন্মোচিত হয়নি। মওলানা আকবর গ্রেফতার হওয়ার পর মামলার জট খুলতে শুরু করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তথা জাতি হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে ধারণা পায়। এ মামলার অন্যতম আসামি আরিফ হাসান সুমন বোমা হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন মর্মেও বক্তব্য পাওয়া যায়।

গত ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর আবু হেনা মো. ইউসুফের পুনঃসাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পুনঃসাক্ষ্য প্রদানের সময় মোহাম্মদপুরের যে বাড়িতে হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল, সে ঘটনাস্থলের মানচিত্র আদালতে উপস্থাপন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা শেষ করেন।

গত বছরের ১৪ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু হেনা মো. ইউসুফ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মোহাম্মদপুরের যে বাড়িতে হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল, সে ঘটনাস্থলের মানচিত্র আদালতে উপস্থাপন করেননি। আইনজীবীদের ভুলে তা উপস্থাপন ছাড়াই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেন রাষ্ট্রপক্ষ।

এরপর শুরু হয় মামলার প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক। এর শেষ পর্যায়ে আসামিপক্ষ তদন্ত কর্মকর্তার ভুলের সুযোগ নিতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এসএম জাহিদ সরদার তড়িঘড়ি করে তা উপস্থাপন করার জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদানের (রি-কল) জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন।

কিন্তু আসামিপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তার পুনরায় সাক্ষ্য প্রদানের বিরোধিতা করা হয়। তাদের দাবি, যুক্তিতর্কের পর্যায়ে মামলার ত্রুটি সারাতে কোনো সাক্ষীকে রি-কল করা যাবে না।

আসামিপক্ষের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিচারক রুহুল আমিন রি-কলের আবেদন মঞ্জুর করলে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক হোসেন ওই আদেশ আইনানুগ হয়নি বলে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু মামলার তিনটি তারিখেও হাইকোর্টের আদেশ দাখিল করতে না পারায় আদালত পুনঃসাক্ষ্যগ্রহণের নির্দেশ দেন।

আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, আরিফ হাসান সুমন ও মওলানা আকবর হোসাইন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে জঙ্গিদের বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ঘটনাস্থলে ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। আহত হন অনেকে।

নৃশংসতম এ বোমা হামলা মামলাটির তদন্তে দীর্ঘদিন কালক্ষেপণ করা হয়। বারবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন হয়। বিপাকে পড়ে তদন্তকাজ।

অবশেষে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঘটনার প্রায় ৮ বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলাটিতে ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন আদালত।

শেয়ার করুন