মেয়াদ শেষের আগে নির্বাচনে যাবে না আওয়ামী লীগ

0
61
Print Friendly, PDF & Email

মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে আগ্রহী নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাকে পাঁচ বছর মেয়াদি করতে মহাপরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ মহাপরিকল্পনা উন্নয়ন ঘিরে। সরকারকে টেনে নিতে দেশে-বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দলকে শক্তিশালী করার কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নিতে পারেনি। জানা গেছে, এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ ফোর লেনের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরেই শুরু হবে উড়াল সড়ক নির্মাণের কাজ। আর নগরবাসীর দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত মেট্রোরেলের কাজ শুরু হবে ডিসেম্বরে। ইতিমধ্যে মেট্রোরেল স্থাপনের প্রয়োজনীয় কিছু কাজও সম্পন্ন হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে আগামী মাসেই। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোনের উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়িয়েছে চীন ও জাপান সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কর্ণফুলীতে টানেল নির্মাণসহ বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পসমূহে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন। বিদেশি অনুদান কাজে লাগিয়ে সরকার বদলে দিতে চায় উন্নয়নের ধারাকে। সরকার তার সব কাজ ঘিরে নিয়েছে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সরকারের ভেতর অস্বস্তি রয়েছে। এ কারণে উন্নয়ন দিয়ে অস্বস্তি দূর করতে চায় সরকার। আর বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপিকে ছাড় দেওয়ার কোনো যুক্তি সরকারের নীতিনির্ধারকরা খুঁজে পাচ্ছেন না। তারা মনে করছেন, সরকারি দল নয়, এখন দুঃসময় অতিক্রম করছে বিএনপি। নির্বাচনে না আসার কারণে বিএনপির ভেতরে-বাইরে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই তাদের কোনো দাবিরও আপাতত যৌক্তিকতা নেই। এমনকি প্রয়োজন নেই সংলাপের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতারা জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন। তারা মনে করেন, মেয়াদ শেষ হলে সংলাপ হবে বলে রাষ্ট্রপতি যে বক্তব্য রেখেছেন, তা ধরেই আওয়ামী লীগ সামনে এগিয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ নেতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আগাম নির্বাচন কিংবা সংলাপ নয়, বরং আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে প্রাধান্য দিচ্ছে একমাত্র উন্নয়ন পরিকল্পনাকেই। সরকারের উন্নয়ন মহাপরিকল্পনায় এবার বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে চায় সরকার। গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি (লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস) আনার চিন্তাভাবনা করছে। রাজশাহী অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর দাবি পূরণে সরকার চলতি মেয়াদে সেখানে গ্যাস সরবরাহের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন খাতে জাপান সরকারের ছয় বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস মিলেছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করতে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে চলছে নানামুখী সমীকরণ। ঢাকার ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণসহ রাজধানীর চারপাশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদীকে দূষণমুক্ত করতে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ২০১৯ সালের নির্ধারিত মেয়াদ পূরণের আগেই সরকার শেষ করতে চায় যমুনা নদীর নিচে বহুমুখী টানেল নির্মাণের কাজ, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন, বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরাল অপর একটি রেল সেতু নির্মাণের কাজ। শিক্ষার হার বাড়ানোর পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর বাড়াতেও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সর্বোপরি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রকল্পের কাজ আরও বিস্তৃত পরিসরে করতে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকার যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে, তা নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কোনো উন্নয়নের ফাইল অলস পড়ে থাকার সুযোগ নেই।

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গত পাঁচ বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। বর্তমান মেয়াদেও যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সর্বব্যাপী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প খাতেও নেওয়া হয়েছে নানামুখী পরিকল্পনা। চলতি মেয়াদে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণসহ দেশের উন্নয়ন খাতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে কাজ করছে সরকার। বিএনপির সঙ্গে সংলাপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘বিএনপি খাদে পড়েছে। তাই তারা সংলাপ চাইছে। খাদ থেকে তাদের উদ্ধারের দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়। সংলাপে যে সময় ডেকেছিলাম সাড়া দেয়নি। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে গেছে। সংসদ গঠিত হয়েছে। আগামী নির্বাচনও সংবিধান অনুযায়ী হবে। তাই সংলাপের নামে সময় অপচয়ের কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকার বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরিশ্রম করছে। তাই বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করতে কেউ এগিয়ে এলে তার মূল্যবান পরামর্শ অবশ্যই গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কোনো ধরনের অবৈধ দাবি সমর্থন করা হবে না। বিগত সরকারের নেওয়া অসমাপ্ত মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দৃশ্যমান করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে সামনে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সংলাপের বিপক্ষে নয়। তবে কী নিয়ে সংলাপ করব। নির্বাচনের বাকি এখনো সাড়ে চার বছর। যখন প্রয়োজন হবে তখন সংলাপ করব। আমাদের লক্ষ্য সংগঠনকে শক্তিশালী করা। জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। কারণ, সংগঠন শক্তিশালী না হলে ভোটের মাঠে ফলাফল ভালো হবে না।

শেয়ার করুন