করোনারি হৃদরোগ প্রতিরোধ

0
126
Print Friendly, PDF & Email

সভ্যতার উন্নতির সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মানও পরিবর্তন হয়েছে। সেই সাথে রোগব্যাধির প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে। হৃদরোগের ব্যাপকতা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এত ছিল না। মানুষ যত বেশি নাগরিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে, হৃদরোগের ব্যাপকতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হৃদরোগকে জনস্বাস্থ্যের এক নম্বর শত্রু হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে হৃদরোগে সারা বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি ৭৫ লাখ লোক মারা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ উন্নয়নশীল দেশে করোনারি হৃদরোগ ও স্ট্রোকে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে এবং সাবেক সোভিয়েত ব্লক ও উন্নত বিশ্বে এই হৃদরোগ এখনো এক নম্বর ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত। সারা বিশ্বে বছরে মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশই হৃদরোগী। উন্নত বিশ্বে হৃদরোগ এক নম্বর ঘাতক। ৫০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে এই রোগে। উন্নয়নশীল বিশ্বে হৃদরোগ এখনো তিন নম্বরের ঘাতক। এখানে প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ লোকের মৃত্যু হয় এই রোগে। উন্নয়নশীল বিশ্বে হৃদরোগ এখনো তিন নম্বর ঘাতক হলেও মাত্র এক দশকের মধ্যে প্রধান ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রধান ঘাতক রোগ এখন সংক্রামক ব্যাধি।
করোনারি হৃদরোগে অনেক ক্ষেত্রে রোগী হঠাৎ আক্রান্ত হন আবার অনেক ক্ষেত্রে ধীরে আক্রান্ত হন। হৃদরোগের মধ্যে করোনারি হৃদরোগই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এ রোগে সাধারণত দুই ভাবে উপসর্গ ও লক্ষণ দেখা হয়। এনজিনাল পেইন অর্থাৎ পরিশ্রম করলে বুক ব্যথা হয় এবং বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যায়। হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া বা বুকে পাথরচাপা অনুভব করাÑ যা এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে শুরু হয়। একে ডাক্তাররা হার্ট অ্যাটাক বলে থাকেন। হার্ট অ্যাটাক যখন মারাত্মক ধরনের হয় তখন রোগীর বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে মারা যান।
হৃৎপিণ্ডের মাংসল দেয়ালে দুটো বড় ডান ও বাম করোনারি ধমনী ও এর শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড থেকেই রক্ত প্রবাহিত হয়। রক্তের এই প্রবাহ হৃৎপিণ্ডকে প্রতি মিনিটে ৭০-৮০ বার সঙ্কোচন ও সম্প্রসারণে সাহায্য করে। হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনীতে চর্বিজাতীয় পদার্থ কোলেস্টেরল জমে গেলে ধমনীর দেয়াল সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। ফলে হৃৎপিণ্ডে রক্তসঞ্চালন কম হয় এবং করোনারি হৃদরোগে দেখা দেয়। যখন কোনো কারণে করোনারি ধমনীতে চর্বির আস্তরণ ছিঁড়ে যায় বা ফাটল ধরে তখন সেখানে রক্ত জমাট বাঁধে এবং ধমনীর দেয়াল বন্ধ হয়ে হৃদযন্ত্রের সংশ্লিষ্ট দেয়ালের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে সেই অংশটি মারা যায়। তখনই তীব্র বুক ব্যথা হয়ে রোগী হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। এই ঘাতক রোগটি সম্পর্কে জনগণের সচেতনতার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে। সতর্কতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এ রোগপ্রতিরোধে নিচের গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত।
কম চর্বি ও কোলেস্টেরেলযুক্ত খাবার খানÑ গরু ও খাসি গোশত, চর্বিজাতীয় খাবার যেমনÑ ঘি, মাখন, দুধের সর, পনির, ডিমের কুসুম, মগজ, কলিজা প্রভৃতি আপনার খাবার তালিকা থেকে বাদ দিন। ভেজিটেবল অয়েল যেমনÑ সয়াবিন, অলিভ অয়েল ও সূর্যমুখী তেল প্রভৃতি ব্যবহার করুন।
ধূমপান ছাড়–নÑ আপনি যদি অধূমপায়ী হন, তবে আপনার জন্য বড় সুবিধা, সে পথেই থাকুন। আর যদি দীর্ঘ দিন ধরে ধূমপানের অভ্যাস থাকে তবে তাড়াতাড়ি এ বদ-অভ্যাস ত্যাগ করুন। এর ফলে হৃদযন্ত্রের ওপর ধূমপানের বিরূপ প্রভাব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। সে জন্য কখনো ধূমপান ছাড়াতে বেশি দেরি করবেন না। মনে রাখবেন, নিরাপদ সিগারেট বলতে কিছু নেই। ফিল্টার সিগারেট কম নিকোটিনযুক্ত বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। নিরাপদ বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু এই সিগারেট বেশি ও দীর্ঘ দিন পান করলে হৃৎপিণ্ডের ধমনীর দেয়ালের ক্ষতি করেÑ হার্টে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং করোনারি রোগের সহায়ক হয়। এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ধূমপান হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য অতি জরুরি।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুনÑ যদি আপনি ডায়াবেটিসের রোগী হন, আপনার রক্তের চিনির মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে সীমিত রাখুন। যদি আপনার রক্তের চিনির মাত্রা নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন হ্রাস ও খাবার কম খাওয়া সত্ত্বেও স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন ও ব্যবস্থামতে ওষুধ সেবন করুন। প্রতি বছর মেডিক্যাল চেকআপ করাবেন, তা হলে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
রক্তের চাপ স্বাভাবিক মাত্রায় রাখুনÑ আপনার রক্তের চাপের মাত্রা ১৪০-৮০-এর মধ্যে রাখুন। আপনি যদি উচ্চরক্তচাপের রোগী হন, তবে খাবারের সাথে আলগা লবণ খাওয়া বন্ধ করুন। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন। শরীরের ওজন কমাতে চেষ্টা করুনÑ চর্বি, শর্করা ও খাবারের ক্যালরির মাত্রা কমিয়ে দিন। এত কিছুর পরও যদি আপনার ওজন না কমে তবে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ও তার উপদেশমতো চলুন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুনÑ শারীরিক ব্যায়াম সারা শরীরে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে। অনেক চুপসে যাওয়া রক্তনালীর মধ্যেও রক্তপ্রবাহ এনে দেয়। ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী প্রবীণদের বেলায়Ñ দৈনিক ২০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করাই ব্যায়ামের জন্য যথেষ্ট। তরুণেরা বহির্বিভাগের নানারকম খেলা যেমনÑ ব্যাডমিন্টন, টেনিস, ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে পারেন। কেউ হার্ট অ্যাটাকে আগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে বা সম্প্রতি তা থেকে আরোগ্য লাভ করে থাকলেÑ তাদের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ব্যাপারে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দেয়া উচিত।
মেদভুঁড়ি কমানÑ আপনার বয়স যদি ৩০ হয়, শারীরিক গঠন স্বাভাবিক, উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি হয়ে থাকেÑ তবে আপনার ওজন ১৩০ পাউন্ডের অধিক হওয়া উচিত নয়। এর বেশি হলে আপনার ওজন বেশি। ১৫০ পাউন্ডের বেশি হলে আপনি মেদবহুল স্থূলকায়Ñ যা হৃদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার। খাবার কমিয়ে স্থূলতা এড়াতে পারেন। এর জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ভাত, মিষ্টি, চর্বিজাতীয় খাবার, গরু-খাসির গোশত, কলিজা, মগজ, সরযুক্ত দুধ, মাখন, ঘি, তৈলাক্ত পিঠা কম খাওয়া। আপনার যদি শারীরিক পরিশ্রম না করতে হয় তা হলে ২০০০ ক্যালরির বেশি খাবারের প্রয়োজন নেই। প্রতি সপ্তাহে আপনার ওজন মাপুন। যদি দেখেন ওজন বাড়ছে, তা হলে মিষ্টি, ভাত ও চর্বিজাতীয় খাবার কমিয়ে দিন। প্রচুর শাকসবজি ও তাজা ফল খান। বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি ও মিষ্টি ফল যেমনÑ কলা, আম বেশি খাবেন না।
রাগ ও উত্তেজনা পরিহার করুনÑ শান্ত ও সুস্থির থাকুন, ধৈর্যশীল হওয়া ভালো গুণ এবং অপরের কথা শুনুন। কারো সাথে যখন মতানৈক্য হয়, তখন শোরগোল করবেন না বা উত্তেজিত হবেন না। যদি আপনার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ও তথ্যাদি থাকে, তবে ধীর ও শান্তভাবে তর্ক করুন।
পরিশ্রম ও কঠিন কাজে নিজেকে জড়াবেন না। নিয়মানুবর্তী হওয়া ভালো অভ্যাস। যখন কোনো পরিশ্রমের কাজ করতে যান তখন অত্যধিক পরিশ্রম করবেন না। ভদ্র ও শান্তশিষ্ট হতে চেষ্টা করুন। আপনার কাজকর্ম যুক্তিসঙ্গতভাবে পরিচালনা করুন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করুন; ভালো ফল পাবেন।
লেখক: নিশাত মেডিক্যাল সেন্টার,
হালদারপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

শেয়ার করুন