দোষীদের শাস্তি হয় না বলেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি

0
142
Print Friendly, PDF & Email

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের পর দিন খুন, সঙ্ঘাত, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই ক্যাম্পাসে দিন দিন সহিংসতা বেড়েই চলেছে। বিগত ছয় বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রতিপরে সাথে সংঘর্ষে পাঁচ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় গঠন করা হয়েছে পাঁচটি তদন্ত কমিটি। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংগঠনের মাঝে সংঘর্ষের কারণে গঠন করা হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দোষীরা বারবার পার পাওয়ার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন শিক-শিার্থীরা।
সর্বশেষ গত সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের দক্ষিণ গেটের ভেতরে সিঁড়ির নিচে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এক শিবির নেতাকে ধরে নিয়ে কুপিয়ে তার পা থেকে গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তার দুই পায়ে গুলি করে। দিনে-দুপুরে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের এমন বর্বোরোচিত ঘটনা এখন ক্যাম্পাসের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। ভুক্তভোগী পা হারানো ওই শিক্ষার্থী এখন নায্য বিচার পাবেন কি-না এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা ক্যাম্পাসে।
এ ব্যাপারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় সরকরদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নৈতিকতা বিলীন করে ছাত্রলীগের এসব কুকর্মের সমর্থন দিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু ক্যাম্পাসে নয় গোটা দেশেই আজ দখলদার আর প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়েছে। এ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের অবশ্যই সম্মিলিত প্রতিরোধ করতে হবে বলে জানান তিনি।’
গত ছয় বছরের আলোচিত ঘটনা
মহাজোট সরকার মতায় আসার পর ২০০৯ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফেসর ড. এম আব্দুস সোবহান। এক সপ্তাহ পর ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শের-ই-বাংলা হলে অর্ধশতাধিক শিবির কর্মীকে আটকে মারধর করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। এ দিন রাবি শিবিরের সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানী ওই হলে আটক নেতাকর্মীদের উদ্ধার করতে গেলে তার ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় ঘটনাস্থলে নিহত হন নোমানী।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয় রাবি ছাত্রশিবির, ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে। এ দিন পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় গণিত বিভাগের ছাত্র ফারুক হোসেনকে। এ বছরের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ইফতারির টোকেন ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে রাবি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মাঝে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মী ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিার্থী নাসিরুল্লাহ নাসিমকে শাহ্ মখদুম হলের দুই তলার ছাদ থেকে ফেলে দেয় দলীয় কর্মীরা। এর এক সপ্তাহ পর ২৩ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় নাসিমের।
২০১১ সালের ১৬ জুলাই পদ্মা সেতুর টাকা ভাগবাটোয়ারা করাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় মাদার বখ্শ হলের সামনে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল সোহেল। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ২৩০ নম্বর কে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ। এ হত্যার সাথেও ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্সবিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কয়েক হাজার শিার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়ে। এতে ৪০ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। সর্বশেষ গত সোমবার বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনের দক্ষিণ গেটে বিশ্ববিদ্যালয় নবাব আব্দুল লতিফ হলের শিবিরের সেক্রেটারি রাসেল আলমকে কুপিয়ে তার ডান পা থেকে গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করে দেয় ছাত্রলীগ। এ সময় নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন প্রত্যক্ষভাবে ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।
এ ছাড়াও ক্যাম্পাসে ছাত্রী উত্যক্ত করা, যৌন নিপীড়ন, সংঘর্ষসহ অনেক ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার নেপথ্যে ছিল ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিচার হয়নি কোনো ঘটনার
২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্যাম্পাসে সহিংস হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিপক্ষের সাথে এসব সংঘর্ষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘নামকা ওয়াস্তে’ একটি বা দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ছাত্রলীগের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন অনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারে বলেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না প্রশাসন। অবশ্য সম্প্রতি ক্যাম্পাসে সহিংস ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন মহলের বক্তব্য
রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, ছাত্রলীগ সন্ত্রাসে নয় শান্তিতে বিশ্বাসী। ছাত্রলীগ সব সময় চায় ক্যাম্পাসে শিার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে গুপ্ত হামলা চালিয়ে যারা সহিংসতা সৃষ্টি করতে চায় তাদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
এ ব্যাপারে রাবি ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক শোয়েব শাহরিয়া বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় না আনেন তাহলে ইসলামী ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে এর সমুচিত জবাব দেবে।
রাবি ছাত্রফ্রন্ট সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেকটি দলেই কিছু না কিছু সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমর্থিত ছাত্রলীগ দ্বারাই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ছাত্রলীগকে বাঁচাতেই কোনো বিচার সম্পূর্ণ করা হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
রাবি বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. এম আবুল হাশেম বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর সব প্রশাসনই নামকাওয়াস্তে মিডিয়া ও জনগণের আইওয়াশ করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করে থাকে। কারণ প্রশাসনের সমর্থিত ছাত্রসংগঠনগুলোই এসব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকে। নিজ দলের ক্যাডারদের বাঁচাতেই এর বিচার করা হয় না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘আপরাধীরা কোনো দলের নয়। অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আমরা চাই সব সহিংসতার বিচার হোক। সব অপরাধীর শাস্তি হোক। ক্যা¤পাসের অপরাধ দমনের জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক-শিক্ষার্থীকেই এক হয়ে কাজ করতে হবে।’

শেয়ার করুন