সিনো হাইড্রো চার লেন থেকে পদ্মায়

0
32
Print Friendly, PDF & Email

চীনের সেই সিনো হাইড্রো করপোরেশনই পদ্মা সেতুর নদীশাসনের কাজ পাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ না করা সিনো হাইড্রো নদীশাসনে আট হাজার ৭০০ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বনানীর সেতু ভবনে নদীশাসনের দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে তিনটি প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। অন্য দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোরিয়ার হুন্দাই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ১২ হাজার ১২১ এবং বেলজিয়ামের জান্ডিনাল ১৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করে। প্রাক্যোগ্য চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের ভ্যান অর্ড ড্রেজিং অ্যান্ড মেরিন কন্ট্রাক্টরস (যৌথ) আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়নি।
দর প্রস্তাব জমা হওয়ার পর যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও ঠিকাদারেরা কে কত টাকা দর প্রস্তাব করেছে, তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সেতু বিভাগ সূত্রে পরে উল্লিখিত দর প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
২০১১ সালে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে নদীশাসনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চার হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। প্রায় তিন বছরের ব্যবধানে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের শুরুতেই প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকার ওপরে গিয়ে ঠেকবে। ২০১১ সালে প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে মূল প্রকল্প প্রস্তাবে তা ছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।
সিনো হাইড্রো করপোরেশন এর আগে ১০ ভাগে বিভক্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজের মধ্যে সাত ভাগের কাজ পেয়েছিল। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও গত মে পর্যন্ত মাত্র ৩৪ দশমিক ৮০ শতাংশ কাজ করেছে। এ প্রকল্পে বাংলাদেশি দুটি প্রতিষ্ঠান রেজা কনস্ট্রাকশন ও তাহের ব্রাদার্স লিমিটেড তিনটি ভাগের কাজ পেয়ে ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়েরই অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) মহাসড়কের ১৯২ কিলোমিটার চার লেন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে৷
সময়মতো কাজ না করে সিনো হাইড্রো গত বছর সওজের কাছে ৫১১ কোটি টাকা বাড়তি দাবি করে। এর জন্য গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় চার মাস কাজ বন্ধ রাখে প্রতিষ্ঠানটি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস, সওজ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে চার দফা সালিস বৈঠকের পর কাজ আবার শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, সিনো হাইড্রো অনানুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর কাজ পেলে চার লেনের কাজ দ্রুত শেষ করার শর্ত দিয়েছিল।
অবশেষে গতকাল দরপত্রে পরিষ্কার হয়েছে যে সিনো হাইড্রোই পদ্মা সেতুর নদীশাসনের কাজ পাচ্ছে। এখন তাদের প্রস্তাবিত দর যাচাই-বাছাই করবে এ-সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটি। এরপর সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মিন্ত্রসভা কমিটির অনুমোদন পেলে চুক্তি সই হবে। সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপে যা হবে এর বেশির ভাগই আনুষ্ঠানিকতা। ছোটখাটো হেরফের বাদ দিলে বলা যায় সিনো হাইড্রোই নদীশাসনের কাজ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে শাস্তির পরিবর্তে নতুন করে পুরস্কারই পাচ্ছে চীনের সিনো হাইড্রো৷
এর আগে মূল সেতুর কাজও পায় চীনা কোম্পানি চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় তাদের সঙ্গে ১৭ জুন চুক্তি সই হয়। মেজর ব্রিজ কোম্পানি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পেরও একাংশের কাজ পেয়েছে। ওই প্রকল্পেরও কাজের গতি খুব কম।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, অতীত-বর্তমান—সব ক্ষেত্রেই চীনা কোম্পানি নিয়ে অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। কাজ পেয়ে তারা ঢিলেমি শুরু করে৷ এরপর সময় বৃদ্ধি, সঙ্গে ব্যয়ও বৃদ্ধি। এটাই চীনা কোম্পানির অতীত রেকর্ড। তাদের ওপর ভরসা করা কঠিন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল উপাদানগুলো হচ্ছে মূল সেতু, নদীশাসন, দুই পারের সংযোগ সড়ক এবং নির্মাণ অবকাঠামো (সার্ভিস এলাকা) তৈরি। নদীশাসন বাদে সবগুলোরই ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে গেছে। নদীশাসন ধরলে সবগুলোর ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর বাইরে নদীর তীর রক্ষায় ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছে আরও প্রায় ২৫০ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে নির্মাণকাজের ব্যয় ২২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। এর সঙ্গে জমি অধিগ্রহণে এক হাজার ১০০ কোটি, পুনর্বাসনে এক হাজার ৪০০ কোটি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে ৬০০ কোটি এবং বেতন-ভাতা-ভ্যাট-কর যোগ হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ শুরু হতেই এর ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকার ওপরে গিয়ে ঠেকবে।
নদীশাসনের চূড়ান্ত দরপত্র জমা দেওয়া উপলক্ষে গতকাল দুপুরেই বনানীর সেতু ভবনে উপস্থিত হন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দরপত্র খোলার পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই মাসের মধ্যে নদীশাসনের ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে যাবে। মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ একসঙ্গেই শুরু করা যাবে।
সিনো হাইড্রো আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অতীত কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। এ-সংক্রান্ত প্রশ্ন করলেই মন্ত্রী উঠে চলে যেতে থাকেন। যেতে যেতে তিনি বলেন, কার অতীত কী সেটা বিশেষজ্ঞ কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। আর চার লেনের কাজ এখন ভালোই চলছে।
মন্ত্রী সবার সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘আমি বিরোধী দলেরও সহযোগিতা চাই। সব শ্রেণির মানুষের সহযোগিতা লাগবে। এটা নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। আমরা ক্ষমতায় আছি, কতকাল থাকব তা আল্লাহ ও জনগণ জানে। অন্য কোনো সরকার এলে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সিনো হাইড্রো তাদের আর্থিক প্রস্তাবে আরও বেশি দর দিয়েছিল। কিন্তু দরপত্র খোলার আগ মুহূর্তে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ ছাড় দেওয়ার কথা চিঠি দিয়ে জানায়। এর ফলে তাদের দর দাঁড়ায় আট হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
সূত্র আরও জানায়, নদীশাসনের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। কিন্তু দেশীয় অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে নেদারল্যান্ডসের কোম্পানিটি কারিগরি প্রস্তাব জমা দিলেও আর্থিক প্রস্তাব থেকে সরে দাঁড়ায়। চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, নদীশাসনের নকশা পরিবর্তন করলে তারা অংশ নেবে। বেলজিয়ামের কোম্পানির দর প্রস্তাব অনেক বেশি।
পদ্মা সেতুর নদীশাসন ও মূল সেতুর ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে প্রাক্যোগ্যতা যাচাই শুরু হয় ২০১১ সালে। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অর্থায়ন না করার ঘোষণা দিলে চূড়ান্ত দরপত্র কার্যক্রম আটকে যায়। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলে গত বছর প্রাক্যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিদেশি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরে দাঁড়ায়।

শেয়ার করুন