রাবিতে পুলিশের ছত্রছায়ায় ৫ মাসে ১২ সহিংসতা : ক্ষোভে ফুসছে ক্যাম্পাস

0
31
Print Friendly, PDF & Email

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় একের পর এক ঘটেই চলেছে সহিংস কর্মকান্ড। সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ পুলিশের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। একের পর বিরোধী মনোভাবাপন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের রগ কাটা, পা বিচ্ছেদসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করছে। গত ৫ মাসে ক্যাম্পাসে ১২ সহিংস ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনার পিছনে পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের দক্ষিণ গেটের ভিতরে সিঁড়ির নিচে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এক শিবির নেতাকে ধরে নিয়ে কুপিয়ে তার পা থেকে গোড়ালী বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তার দুই পায়ে গুলি করে দ্রুত সটকে পরে। পুলিশ এবং ছাত্রলীগের এসব বিতর্কিত কর্মকান্ডে ক্যাম্পাসে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার ব্যাপারে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তবে ক্যা¤পাসের সকল বিষয় এখন হয়ে গেছে রাজনৈতিক। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন বিভিন্ন মতের সেখানে আমি উপাচার্য একাই কি করবো? তবে আমরা চাই সকল সহিংসতার বিচার হোক। সকল অপরাধীর শাস্তি হোক। ক্যা¤পাসের অপরাধ দমানোর জন্য প্রশাসনের পাশা পাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিককেই এক হয়ে কাজ করার কথা বলেন তিনি।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শের-ই-বাংলা হলের ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি শরিফুজ্জামান নোমানীকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদালয়ের সকল আইন-শৃংখলার দায়িত্ব পুলিশের উপর দেওয়া হয়। পুলিশ শৃংখলার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ পুলিশের সহযোগীতায় ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের উপর চালায় চরম নির্যাতন। ছাত্রলীগ এবং পুলিশের চলাম এ নির্যাাতন দিন দিন বেড়েই চলেছে। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে গত ৫ মাসে ক্যা¤পাসে সংগঠিত হয়েছে ১০টি সহিংস ঘটনা। এতে ১ শিক্ষার্থী নিহতসহ আহত হয়েছেন প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২ শিক্ষার্থী।
সর্বশেষ গত সোমবার বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনের দক্ষিণ গেটে বিশ্ববিদ্যালয় নবাব আব্দুল লতিফ হলের শিবিরের সেক্রেটারি রাসেল আলমকে কুপিয়ে তার ডান পা থেকে গোড়ালী বিচ্ছিন্ন করে দেয় ছাত্রলীগ। এসময় নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন প্রত্যাক্ষ ভাবে ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করেছে বলে প্রত্যাক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছে।
এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্স বিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়ে। এতে ৪০জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।
এর পর গত ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুয়ার্ট শাখার সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্স বিরোধী আন্দোলনের কর্মী সাজু সরদার (মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষ) নামে এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে আহত করে দুর্বৃত্তরা।
গত ২৮ মার্চ শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলে শিবির সন্দেহে আবদুল হান্নান নামে এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গত ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও পিস্তুল দেখিয়ে হুমকি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ স¤পাদক গোলাম কিবরিয়া। এ ঘটনার পরের দিন গত ৩০ মার্চ চাঁদা না দেওয়ায় বিশ্বদ্যিালয়ে ইসলামিক স্টাডিস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল মুয়িজ ও ইমরান নামের দুই শিক্ষার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাথা থেতলে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গত ৪ এপ্রিল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ২৩০ নম্বর কক্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা রুস্তুম আলী আকন্দ। গত ২৬ এপ্রিল রাত ১১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মাদার বখশ হলে ছাত্রলীগের হাতে মারধরের শিকার হন ওই হল শাখা ছাত্রশিবিরে সভাপতি ওয়ালিউল্লাহ। গত ২৭ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী ইসমাত জাহান সিগমাকে পুলিশ ও জনসম্মুখের সামনে হামলা করে বহিরাগত সন্ত্রাসী হিমু। গত ২৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে ব্যক্তিগত শক্রুতার জেড়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ইমরান হাওলাদার নামের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ২৯ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে হামলার শিকার হন ছাত্রলীগের দুই নেতা। দুর্বৃত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের ছাত্র বৃত্তি বিষয়ক স¤পাদক টগর মোহাম্মদ সালেহীকে হামলা করে। এসময় দূর্বৃত্তরা ছাত্রলীগ কর্মী ও ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মাসুদ রানাকে কুপিয়ে শরীর থেকে পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
এসব ঘটনায় পুলিশের প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা একের পর এক এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব ঘটনার যেন পূর্ণাবৃত্তি না হয় সেজন্যও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীদের মাঝে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যে কোন সময় এ ক্ষোভ থেকে আন্দোলনেরও সৃষ্টি হতে পারে বলে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীরা বলেন, ক্যাম্পাসে মুষ্টি কয়েক জন শিক্ষার্থী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। এদের জন্য শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ঠ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে এদের যে কোন সময় গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু প্রশাসন তাদের নিজেদেও সার্থ হাসিলের জন্য এসব সন্ত্রাসীদের লালন করছে বলে তিনি অভিমত ব্যাক্ত করেন।
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তারিকুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ক্যা¤পাসে পুলিশ রাখা হলেও একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। আমরা সর্বাত্তক চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার। অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা (ওসি) আলমগীর হোসেন।

শেয়ার করুন