আ’লীগে সংলাপ নিয়ে দুই মত

0
34
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপি’র সাথে সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগে এখন দুই মত। দলের বর্ষীয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলছেন, সংলাপ হতে পারে সংবিধান মেনে। আর যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মতে, অবৈধ সরকারের সাথে বৈধ সংলাপ হবে কিভাবে? তবে আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপ নিয়ে মতের ভিন্নতা যাই থাক না কেন- দাতাদেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখনই রাজনৈতিক ঐক্যমত চায়। এজন্যই তারা সরকারের সাথে বিএনপি’কে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছে।
সরকারের সাথে সংলাপ নিয়ে গত রোববার ইইউ’র এরকম আহ্বানের জবাবে ১৯ দল প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু সংলাপ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, প্রেসিডিয়াম মেম্বার ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ পৃথক মত দিয়েছেন। এদের কেউ বলছে, সংলাপে রাজি, কেউ বলছে এখনই প্রয়োজন নেই আবার কেউ বলছে সরকারই তাদের ভাষায় অবৈধ তাহলে বৈধ সংলাপ হবে কিসে? সরকার দলেল নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে সর্বগ্রাসী সঙ্কট চলছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য সংলাপের বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগের নেতারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন বলে দাবি করেছিলো কিন্তু এখন তারা সে অবস্থান থেকে সরে গেছে।
দেশে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সংকট তৈরি হয়। দেশের সুশীল সমাজ এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংকট নিরসনের জন্য বহির্বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের দূতিয়ালির প্রয়োজন হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংলাপ নিষ্ফলই রয়ে যায়। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে মানুষ একই চিত্র দেখছে। তারপরও আশাবাদী মানুষ। সর্বশেষ সংলাপে দূতিয়ালি করতে এসেছিল জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। তিনিও ব্যর্থ হন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব বানকি মুন। হতাশা ব্যক্ত করেছে আমেরিকা, কানাডা, কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন দেশ। একমাত্র ভারত ছাড়া কেউই এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার দলের পক্ষ থেকে বলা হয় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন। সকল দলের অংশগ্রহণে খুব শিগগিরই আরেকটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে এ নির্বাচনকে অবৈধ দাবি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গত রোবাবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে তিন সদস্য বিশিষ্ট ইইউ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ডারকিয়াস মেরি মেগেমেক। উপস্থিত ছিলেন ইইউর বিদায়ী মিশন প্রধান উইলিয়াম হানা। বৈঠকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় প্রতিনিধি দল সংলাপের উপর তাগিদ দেন। জবাবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানান, তার জোট মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য যে কোনো সময়ে সংলাপে বসতে আমরা প্রস্তুত আছে।
ইইউ’র এ বৈঠক ও সংকট নিরসনের আহ্বান এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের মতামতের ১২ ঘণ্টা পরই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। দলটির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দাতা দেশগুলো সংলাপের প্রতি গুরুত্ব দিলেও দুই-একজন বাদে তা আমলে নিতে নারাজ ক্ষমতাসীনরা।
গতকাল এ সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সব সময় আলোচনায় বিশ্বাসী। তবে কখন কোথায় কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন, সেটা আগে ঠিক করুন। সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব এলে সংলাপ না হওয়ার কিছু নেই।
গতকাল সাভারে দলটির প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলে। তাই তারা বাজেটের ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে তারা সংলাপের কথা বলেন। তাহলে অবৈধ সরকারের সঙ্গে বৈধ সংলাপ কিভাবে সম্ভব?
মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো আালোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি  বলেন, ‘আমরা তো সংবিধান মোতাবেক নির্বাচিত হয়েছি। তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা কেন আসছে? তিনি বলেন, বাংলাদেশে আলোচনা করার মত কোনো সংকট তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বর্তমানে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবছে না। তাছাড়া আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনার সময় এখনও হয়নি।
এদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মতদ্বৈতা প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ আজ গণতন্ত্র, রাজনৈতিক, অর্থণীতিকসহ মানুষের নিরাপত্তা সংকট চলছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য সংলাপের বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগের নেতারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন বলে দাবি করেছিলো কিন্তু এখন তারা সে অবস্থান থেকে সরে গেছে। যে কারণে আন্তর্জাতিক মহলও তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করছে। ১৯ দলীয় জোটনেত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে।

শেয়ার করুন