সরকারের কাছে কি আমাদের খবর পৌঁছায় না

0
578
Print Friendly, PDF & Email

একদিন বিকেলে খুব বৃষ্টি শুরু হলো। ওই অবস্থায় পাশের হাট রাজীবপুর বাজারে গেলাম খরচ করতে। সেখানে গিয়ে বৃষ্টি আরো বেড়ে গেল। বৃষ্টি ছাড়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বেজে গেল রাত নয়টা। কিন্তু, বৃষ্টি থামছে না। মনতো শুধু বাড়ির দিকে টানছে। কারণ বাড়ি থেকে পাঁচশ হাত দূরেই রাক্ষসী ব্রক্ষ্মপুত্রের অবস্থান। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির পাশেই চলে এসেছিল নদীটা। তারও আগে এক কিলোমিটার দূরে ছিল এর অবস্থান।

বৃষ্টি বাড়ছে, নদীতে পানিও বাড়ছে। কখন যে বাড়িতে আমার নদী চলে আসবে এই চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারছিলাম না। বৃষ্টি শেষে তারাহুড়ো করে বাড়িতে এসে দেখি বাজারে যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। যেখানে আমার বাড়ি ছিল সেটি পানি দিয়ে ভরপুর।

আমার স্ত্রী তিন সন্তানকে নিয়ে তখন ঘরের মধ্যেই ছিলো। এমন সময় ঘর ডেবে যেতে শুরু করলে কোনো মতে বাচ্চাদের নিয়ে গাছ তলায় ঠাঁই নেয় সে। চারদিকে খুব অন্ধকার ছিল তখন। ভেবেছিলাম আমার সব কিছু নিয়ে গেছে এই রাক্ষসী নদী। এ সময় আমার স্ত্রী ও সন্তানরা চিৎকার করে বলে, আমরা বেঁচে আছি।

নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে যাওয়া আশির উদ্দীন (৫০) বাংলানিউজের এ প্রতিবেদকের কাছে তার বসত হারানোর  বর্ণনা দেন।

গত ৫ মাস আগে নদী ভাঙনে তার বাড়ি-ঘর, আবাদি জমি, পশুসহ সব কিছুই শেষ হয়ে গেছে। বেঁচে আছে শুধু তার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

আশির উদ্দীন রাজীবপুর উপজেলার হাজীপাড়া এলাকায় তার দেওয়া জমিতে থাকতেন। নদী সব কেড়ে নেওয়ার পর এখন তার ঠাঁই হয়েছে ব্রক্ষ্মপুত্রে জেগে ওঠা বড় চরে।

সরেজমিনে ওই চরে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ফাঁকা, মাঝখানে এক ঘরের একটি বাড়ি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোনো মতে থাকার জায়গা করেছেন তিনি।

চারপাশে ফাঁকা, এখানে পরিবার নিয়ে থাকেন কিভাবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে আশির উদ্দীন বাংলানিউজকে বলেন,  মানুষ সাধে কী চরে ঘর বাধে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমার। কী খাব, কী পড়বো, কিছুই নেই আমার।

তিনি বলেন, আমার প্রায় তিনবিঘা আবাদি জমি ছিল। বাড়িতে গরু, ছাগল ও মুরগি ছিল। খুব সুখেই ছিলাম। কিন্তু নদী আমার সেই সুখ কেড়ে নিয়েছে। ফকির বানিয়ে দিয়েছে আমাকে। এখন সারাদিন মানুষের জমিতে কাজ করে যা আয় করি তাই দিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।

আশির উদ্দীন বলেন, আমার মতো এই এলাকার অনেকেই সব কিছু হারিয়ে এখন নি:স্ব। তারাও এখন চরের বাসিন্দা।

তিনি বলেন, সব কিছু হারিয়ে বড় চরে প্রায় ৫০টি পরিবার বসবাস শুরু করেছে। এখানে জমির পরিমাণ প্রায় দুইশ একর। দুই বছর আগে এই চরটি জেগে। যার বাড়ি ভাঙছে তারাই আসছে এ চরে।

তিনি আরও বলেন, আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে বড় হয়েছে কিন্তু স্কুলে যেতে পারছে না। কারণ চরের মধ্যে কোনো স্কুল নেই। চারপাশে শুধু পানি আর পানি। তাছাড়া নি:স্ব কারো নৌকাও নেই যে তাদের স্কুলের যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

নি:স্ব হয়ে যাওয়া এই মানুষটি বলেন, এখানকার শিশুরা বাবা-মার সঙ্গে মাঠে কৃষি কাজ করে সময় কাটান। নাগরিক সুবিধার কোনো ছোঁয়া পৌঁছাইনি চরগুলোতে। নেই স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, হাট-বাজার। খুব কষ্ট করে চলতে হয় আমাদের। বিকেল হলেই চরের চারপাশে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘাটে কোনো মাঝি থাকে না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাতে কোনো অসুস্থ মানুষকে ঘাটে আনার পর সারারাত নৌকার অপেক্ষায় থাকতে হয় আমাদের। কিছুদিন আগে ঘাটে নৌকার জন্য অপেক্ষায় থাকার সময় চিকিৎসার অভাবে দুইজন গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হয়েছে। অনেকে সন্তানও প্রসব করেছে ঘাটে।

তিনি বলেন, ভাই আমরা যে এভাবে থাকি সরকারের কাছে কি আমাদের খবর পৌঁছায় না?

অনেকক্ষণ চরে হাঁটার পর খুঁজে পাওয়া গেল আরেকটি বাড়ি। এ বাড়িতে থাকেন এক বৃদ্ধা। নাম বাসাতুন খাতুন। তবে তার চরে আসার ঘটনাটা ভিন্ন।

তিনি হাজীপাড়া এলাকায় তার ভাইয়ের বাড়িতে থাকতেন। ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হওয়ায় তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন তার ভাই। তাই তিনি মনের কষ্টে চরে এসে বাসা বেঁধেছেন।

বাসাতুন খাতুনের দুই ছেলে। ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। মাসে সামান্য টাকা দেন মাকে তাই দিয়ে চলে যায় তার।

বাসাতুন খাতুন বাংলানিউজকে বলেন, চরে যেসব মানুষ বাস করে তাদের সবার শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসটা কষ্টের। প্রতিটি চরের নাম হওয়া দরকার কষ্টের চর। আল্লাহর দুনিয়ায় এটা আরেকটা দুনিয়া যেখানে কষ্টই একমাত্র সম্বল।

তিনি বলেন, এমনিতে তো থাকি কষ্টের মধ্যে তাও আবার মাঝে মধ্যে চোর এসে যা পায় তাই নিয়ে যায়। মাঝে মধ্যে মনে হয় মরে থাকি। এত কষ্ট আর ভালো লাগে না।

এ ব্যাপারে রাজীবপুর উপজেলার রাজীবপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য জিয়াউর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, বড় চরের বাসিন্দারা আমার এলাকার ভোটার। সরকারিভাবে তাদের সহযোগিতা করার জন্য তেমন কিছুই বরাদ্দ নেই। তারপরও মাঝে মধ্যে যেসব সুযোগ-সুবিধা আছে সেগুলো দেওয়া হয় তাদের। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য এসব বরাদ্দ।

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান সফিউল আলম বাংলানিউজকে বলেন, চরের মানুষের আসলেই খুব কষ্ট। নদী ভাঙন এলাকার মানুষ আমরা। নদীই আমাদের সব কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কুলিয়ে উঠতে পারছি না।

তিনি বলেন, সবার আগে প্রয়োজন চরের মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম নিশ্চিত করা। তাদের ব্যাপারে ভাবতে হবে বলে তিনি জানান। –

শেয়ার করুন