কোপা হতাশ করল ‘ছোট জাদুকরকে’

0
54
Print Friendly, PDF & Email

মধ্য জুন৷ ইউরোপীয় ফুটবলে বেজেছে বিদায়ের রাগিণী৷ শোকাতুর ন্যু ক্যাম্প৷ একরাশ হতাশা, ক্ষোভ৷ অর্জনের খাতা প্রায় শূন্য৷ সম্ভাব্য আটটি ট্রফির মধ্যে মাত্র একটি ঘরে তুলতে পেরেছে বার্সা—স্প্যানিশ সুপার কাপ৷
চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে আগেই বিদায়৷ কোপা দেল রেও হাতছাড়া৷ আর লিগ? ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিরোপা দৌড়ে টিকে ছিল কাতালানরা৷ কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে জট পাকিয়ে ফেলল৷ একের পর এক হোঁচট৷ বিশেষ করে বেটিস ও এসপানিওলের কাছে পয়েন্ট খোয়ানোটা ছিল তীরে এসে তরি ডোবানো৷ অপ্রত্যাশিতভাবে লা লিগা জিতে নিল চিরশত্রু রিয়াল৷
যদিও মৌসুমজুড়েই মেসির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল চোখ ধঁাধানো৷ রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক৷ গেটাফের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক গোল৷ একক প্রচেষ্টায় চারজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অভাবনীয় ঢঙে লক্ষ্যভেদ৷ দুই মাসের মাথায় আবার বিশ্বকে ঝাঁকুনি৷ এবারের শিকার এসপানিওল৷ প্রায় একই কায়দায় গোল করে বিশ্বকে দিলেন এই বার্তা, ‘আমিই নাম্বার ওয়ান’৷ তবে দিন শেষে কোনো শিরোপা হাতে না ওঠায় হতাশ, ক্ষুব্ধ ছোট জাদুকর৷
কিন্তু ফুটবল থেমে থাকে না৷ জীবনের মতোই বহমান৷ ক্লাবের ব্যর্থতা জাতীয় দলের হয়ে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন হাতেনাতে৷ কোপা আমেরিকা, ২০০৭৷ আন্তমহাদেশীয় এই টুর্নামেন্টে কোচ আলফিও বাসিলের প্রধান অস্ত্র হলেন মেসি৷ সারা দুনিয়ার মানুষেরও বিশ্বাস, মেসিই হবেন টুর্নামেন্ট-সেরা৷
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের চার িদন আগে ২০তম জন্মদিন উদ্যাপন করলেন৷ গণমাধ্যমে চলল শুভকামনা, ‘কোপা আমেরিকা জেত, সর্বোচ্চ গোলদাতা হও৷’
১৯৯৩ সালের পর থেকে এই শিরোপার দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছে নীল-সাদারা৷ শিরোপা-খরা ঘোচাতে প্রত্যাশার চাপ তাই আকাশচুম্বী৷ জার্মানি বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন তরুণ৷ কিন্তু এই টুর্নামেন্টে মেসিই যেন কান্ডারি৷ চারদিকে ‘মেসি ম্যানিয়া’৷ মেসি বলতেই ভক্তরা উন্মাদ৷ শিশু থেকে প্রৌঢ়—সবাই যেন তাঁর নামে বুদ্৷
এই প্রেম অন্ধ, এই ভালোবাসা সীমাহীন, যা পেঁৗছেছে চূড়ায়৷ মেসি খেলা শেষে টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে যাচ্ছিলেন৷ কিছুটা ক্লান্ত, অবসন্ন৷ হঠাৎ একটি মেয়ে গ্যালারি থেকে মেসির গায়ের ওপর ঝাঁপ দিতে শুরু করল৷ হতবিহ্বল মেসি হাত উঁচিয়ে বললেন, ‘থাম, তুমি কী করছ…?’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? মেয়েটি ধপাস করে পড়ল৷ ভাগ্য ভালো, সে তার পায়ের ওপর ভর করে পড়ল৷ নিরাপত্তাকর্মীরা এসে দ্রুত তাকে সরিয়ে নিলেন৷ কিন্তু তার আগেই সে লাভ করল স্বর্গসুখ৷ স্বপ্নের নায়কের গালে এঁকে দিল চুম্বন৷ দুবার৷ মুহূর্তের ঘটনায় বাকরুদ্ধ মেসিও৷
পেরুর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে মাঠ ছাড়ার সময় এ কাণ্ড ঘটে৷ ৪-০ গোলের জয়ে মেসির ভূমিকাও ছিল দুর্দান্ত ৷ ৬১ মিনিটে অসাধারণ একটি গোল করলেন৷ এর আগে তিনটি ম্যাচ খেলেও কোনো গোল পাননি৷ তবে পরের ম্যাচেই দেখালেন ঝলক৷ মেক্সিকোর বিপক্ষে সেমিফাইনালে সব অপূর্ণতা যেন কড়ায়-গন্ডায় মিটিয়ে নিলেন৷ বিশ্ব দেখল তাঁর খেলা৷ গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে অবিশ্বাস্য ফিনিশিং, যা মেসির স্মরণীয় গোলগুলোর একটি৷
টুর্নামেন্টের শুরুতেই ফাইনালে ব্রাজিলকে চেয়েছিলেন মেসি৷ তাঁর সেই ডাক শুনেছেন ঈশ্বর৷ কিন্তু সেই চাওয়াটাই কাল হয়ে দাঁড়াল৷ যে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর কাছে আটকে যায়, সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে জয় ছাড়া অার কোনো জয়ই নেই যাদের; সেই ছন্নছাড়া দলটিই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন৷ ৩-০ গোলে জিতে দেশে ফেরে সেলেসাওরা৷
যে মেসিকে ভাবা হয়েছিল টুর্নামেন্ট-সেরা, সেই মেসিই টুর্নামেন্ট শেষে ম্লান৷ লজ্জাবনত৷ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হলেন রবিনহো, ৬ গোল করে৷ আর মেসি?
আকাশপানে শূন্য দৃষ্টি৷ বাবা, ফিজিও—সবাই মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন, কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই যেন যথেষ্ট হলো না৷ ভেতরের চাপা কষ্টটা কান্না হয়ে ঝরল দুচোখ বেয়ে৷ টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হলেন বটে, কিন্তু তা এতটুকু কষ্ট কমাতে পারল না৷
ক্লাবের হতাশার সঙ্গে যুক্ত হলো জাতীয় দলের কষ্টও৷ না-পাওয়ার বেদনা৷ যে বেদনার রং ‘হলুদ’৷
সূত্র: বিভিন্ন সময়ে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন, একাধিক ওয়েবসাইট ও লুকা কাইয়োলির বই মেসি৷

শেয়ার করুন