গ্যালারি থেকে মেসিকে উৎসাহ দেবে ম্যারাডোনা

0
38
Print Friendly, PDF & Email

বিশ্বকাপের সেরা দিকটি হলো এই কাপই লোককে মনে করিয়ে দেয় পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা মানুষটা আদতে কে এবং কেন তার গুরুত্ব৷তার মুখেই শোনা যাক।

স্বপ্ন দেখতাম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলব৷ আরও বড় স্বপ্ন ছিল কাপটা নিজের মাথার ওপর একদিন তুলব৷ দেখুন কী কপাল সত্যিই একদিন ওই কাপটা মাথায় তুললাম এবং দেশের অধিনায়ক হিসাবেই৷ মেক্সিকো তোমায় কোনো দিন ভুলব না৷ আজটেকা, আর্জেন্টিনা কোনো দিনও তোমায় ভুলবে না৷

১৯৭৮-এ সিজার লুই মেনোত্তি যখন তার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল গড়লেন, আমাকে নেননি৷ ওহ, সে রাত কখনও ভুলব না, বড় কষ্টের, বড় বেদনার৷ আমার বয়স তখন ১৭ এবং চাইছিলাম যেভাবেই হোক বিশ্বকাপের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে৷ ধাক্কা খেলাম প্রত্যাখ্যানে৷ ওই আমার জীবনের প্রথম শিক্ষা নিষ্ঠুরতার৷ সেদিনই বুঝলাম নিজের সেরাটা উজাড় করে দিলেও তুমি যা চাও, তা নাও পেতে পারো৷ সেদিন সারা রাত কেঁদেছিলাম৷ হ্যাঁ, সারা রাত৷ ১৯৯৪-তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্তারা জানাল যে হ্যাঁ, আমার দেহে মাদক মিলেছে তার চেয়েও তিক্ত, বিষন্ন ছিল প্রত্যাখ্যানের রাত৷ দুটিই বেদনাদায়ক, কিন্তু যে রাতে আমাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সে রাত ছিল অসহ্য৷ মনে হল আমার জগৎ বুঝি শেষ হয়ে গেল৷ মেনোত্তি সে রাতে কী কারণে বাদ দিয়েছিল তার ব্যাখ্যা যেমন বুঝিনি, তেমনই কোনও ইচ্ছাই ছিল না বোঝার৷

সেদিনই প্রতিজ্ঞা করলাম আমি খেলবই খেলব- অনেক অনেক বিশ্বকাপে৷ কথা রেখেছি৷ ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ ও ১৯৯৪– চার চারটে বিশ্বকাপে খেলেছি, একবার জিতেছি আর একবার হেরেছি ফাইনালে৷ শেষবার, যখন আর্জেন্টিনাকে আমি মরণপণ ঠেলে তুলতে ব্যস্ত, ব্লাটার আর হ্যাভেলাঞ্জরা তখন অন্য খেলায় ব্যস্ত৷ বিনা দোষে বিশ্বকাপ থেকে আমি বিতাড়িত হলাম৷ ওই কর্মকর্তাদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের ইতিহাস থেকে আমাকে মুছে ফেলতে পারেনি৷

মেনোত্তিকে কোনো দিনও ক্ষমা করিনি৷ একই নিশ্বাসে বলব ওকে কোনো দিন ঘেন্না করিনি৷ আমার খেলোয়াড়ি জীবনের কারিগর ছিলেন মানুষটি এবং ওর অধীনেই আমি আমার প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছি৷ স্পেন হতাশ করেছিল৷ আমাকে ওরা পাগলের মতো লাথি মেরেছে৷ মার খেতে খেতে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে না পেরে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে যেতে বাধ্য হলাম৷ ওই ঘটনাই চার বছর পর যখন মেক্সিকোয় পৌঁছলাম, আমাকে সঙ্কল্পে দৃঢ় ও অটল করে তুলল৷

কিন্তু যত সহজে এ কথা লিখছি সেদিন ব্যাপারটা তত সহজ ছিল না, বিশেষ করে ড্যানিয়েল পাসারেলা যখন একই দলে৷ ১৯৭৮-এর বিশ্বজয়ী দলের অধিনায়কের রাগের কারণ ছিল৷ নতুন কোচ কার্লোস বিলার্দো আমাকে ক্যাপ্টেন করে দিলেন৷ এটা সম্ভবত পাসারেলার পক্ষে হজম করা কঠিন ছিল৷ পাসারেলা দলের সঙ্গে মেক্সিকো গেল ঠিকই, কিন্তু না খেলেই ফিরে এলো৷ বাদ বাকি আমরা পরস্পরের সুবিধা অসুবিধা দেখতাম এবং এক মনপ্রাণ হয়ে খেলে বিশ্বকাপ জিতলাম৷ দলনেতা হিসাবে আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে পাঁচটা গোল করলাম– এর মধ্যে আত্মার তৃপ্তি হলো ইংল্যান্ডকে জোড়া গোল দিয়ে৷ আর ফাইনালে যখন দেখলাম বুরুচাগা দৌড়াতে শুরু করেছে তখন পাসটি বাড়িয়ে দিলাম তার জন্যেই৷

সেই ১৯৮৬ ইস্তক ফুটবলপ্রেমিকরা আর্জেন্টিনীয় প্রতিভায় আস্হাশীল৷ যদিও আর কখনও আমরা বিশ্বকাপ জিতিনি৷ ১৯৯০-তে খুব কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু ট্রফিটা রেফারি আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন৷ চার বছর বাদে যখন আমাকে খেলা থেকে বাদ দেওয়া হলো আমাদের দল তখন ওই সিদ্ধাম্তে বিপন্ন ও বিধ্বস্ত৷ আমরা আর লড়তে পারলাম না৷ আর পরের চারটি কাপে কপাল আমাদের সঙ্গে ছিল না৷

২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকায় আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলাম৷ কিন্তু জার্মানরা প্রায় খুঁতহীন ছিল সেদিন এবং আমাদের রক্ষণভাগ ওদের পাল্টা আক্রমণের সঠিক মোকাবিলা করতে পারেনি৷ কোচ হিসাবে আমাকেই হারের দায়িত্ব নিতে হবে৷ নিয়েছিও, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রতিভাশালী ছেলেদের নিয়ে আমি চলতে চেয়েছিলাম৷ গোড়ায় বলা হয়েছিল আমিই কোচ থাকব, কিন্তু পরে আর্জেন্টাইন ফেডারেশন আমাকে রাখতে চাইল না৷

যাই হোক আমার অন্তরের শুভেচ্ছা সর্বদাই ঘিরে রাখবে অ্যালবিসেলেস্তদের এবং আমি নিজের দেশকে সাপোর্ট করার জন্য থাকব মাঠে৷ আমি ব্রাজিলের স্ট্যান্ডে থাকব এবং মেসিকে উৎসাহ জোগাব৷ আলেজান্দ্রো সাবেয়া একটা অসামান্য দল পেয়েছে৷ গোড়া থেকে প্রায় নিখুঁত খেলে এগিয়ে এখন টেবিলের মাথায় উঠেছে৷ আমাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ থেকে বিশ্বকাপ জেতার চেয়ে আর কী কিছু বড় হতে পারে!– ওয়েবসাইট।

শেয়ার করুন