আবার চাল আমদানি করছে বাংলাদেশ!

0
85
Print Friendly, PDF & Email

আবারও চাল আমদািন শুরু করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সরকার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি করলেও চলতি অর্থবছরে পৌনে চার লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছে৷ আরও আট লাখ ৩৫ হাজার টন চাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে৷ এর আগের অর্থবছরে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র ২৮ হাজার ৯৩০ টন৷
সরকারের খাদ্য বিভাগের ওয়েবসাইটে দৈনিক খাদ্যশস্যবিষয়ক প্রতিবেদনে চাল আমদানির এ তথ্য উল্লেখ করা আছে৷ ওয়েবসাইটটিতে ৪ জুন সন্নিবেশ করা তথ্যে দেখা যায়, এ আমদানির প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের৷
কিন্তু গতকাল কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তাতে লেখা হয়েছে, বর্তমান সরকারের আমলে চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে৷ সুগন্ধি চাল রপ্তানি হচ্ছে৷
বাংলাদেশ চাল আমদানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি টিপু সুলতান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে চালের ঘাটতি রয়েছে৷ তাই আমদািন বেড়ে গেছে৷’ তিনি ইতিমধ্যে তিন হাজার টন চাল আমদািন করেছেন এবং আগামী জুলাইয়ে ভারত থেকে আরও ২০ হাজার টন চাল আমদািনর প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানান৷ বাজারে চালের সংকট হতে পারে—এই আশঙ্কায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী আমদািন শুরু করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন৷
তবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের খাদ্যগুদামগুলোতে চালের মেয়াদ তিন বছর পার হলে তারা তা রপ্তানি করে দেয়৷ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গোখাদ্য হিসেবে তা আমদানি করছেন। দেশে চালের কোনো সংকট নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘চালের দাম বাড়লে তা কৃষকের জন্য ভালো৷’
গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদের যে বাজেট পেশ করেছেন, তাতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দুই লাখ টন চাল আমদানির জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন৷
জানতে চাইলে চালের অন্যতম আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেশির ভাগ চাল আসছে স্থলপথে ভারত থেকে৷ তবে আমরা সাধারণ বাজারে বিক্রির জন্য গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে জাহাজে করে পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে সাত হাজার টন আতপ চাল আমদানি করেছি৷’
২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত দেশে সামান্য কিছু সুগন্ধি চাল ছাড়া কোনো সাধারণ চাল আমদানি হয়নি। এতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছিল৷ পাশাপাশি চালের দামও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এ বছর আবারও চাল আমদািন বেড়ে যাওয়ায় চালের দরও বাড়ছে৷ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে মোটা চালের দর ১২ ও সরু চালের দর ১৭ শতাংশ বেড়েছে৷ চালের দাম বাড়লেও তার সুবিধা অবশ্য কৃষকের কাছে পেঁৗছায়নি।
তিন দফা সারের দাম কমানো, ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন, কৃষকের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা এবং আউশ ও আমনে প্রণোদনা দিয়ে কৃষি খাতে ব্যাপক সাফল্য এনেছিল বাংলাদেশ। ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ফসলের ভালো দাম কৃষককে বেশি জমিতে বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছিল। ফলে উৎপাদন বেড়েছিল রেকর্ড পরিমাণে।
কিন্তু গত দুই বছর প্রায় প্রতিটি ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষক ধান ও পাটের চাষ কমিয়ে দিয়েছেন৷ ফলে এ দুই বছরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার আগের বছরগুলোর তুলনায় কমেছে।
অর্থনীতিবিদেরা এর জন্য কৃষিপণ্যের সঠিক বাজারব্যবস্থা না থাকাকে দায়ী করেছেন৷ ‘ভালো দাম পাওয়ার পরবর্তী প্রভাব হিসেবে কৃষক উৎপাদন বাড়াবে’ অর্থনীতির এ ধ্রুপদি সূত্র জানার পরেও সরকারের তরফ থেকে কৃষকের উৎপাদিত ‘বাড়তি’ পণ্যের কোনো সুব্যবস্থা করা হয়নি।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আরও কমে আসবে। এতে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হারও ধরে রাখা কঠিন হবে। কৃষকের চেষ্টা ও সরকারি উদ্যোগের ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়ে বাংলাদেশ যে অগ্রগতির দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, তা-ও বাধাগ্রস্ত হবে।
কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা, সরকারি ত্রাণ ও উন্নয়নকাজে চাল বিতরণ বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ২০ লাখ টন করা, কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মৌসুম শুরুর আগেই সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়৷ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এ সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই নেয়নি সরকার৷ এবারও আমন ও বোরোতে সরকারি সংগ্রহের প্রায় পুরোটাই চালকলের মালিকদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে৷
আবার ধান সংগ্রহের মতো সরকারি গুদাম নেই—এ যুক্তিতে সরকার কৃষকের কাছ থেকে এখনো ধান কেনা শুরু করেনি। বিআইডিএসসহ বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কৃষকের কাছ থেকে চালকলগুলোকে রসিদের মাধ্যমে সরকারি দরে ধান কেনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ ধান সংগ্রহের গুদাম নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার কোনোটিই এখনো আলোর মুখ দেখেনি৷
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত ফেলো অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল দিক কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ৷ গত কয়েক বছরে চালের বাজার বড় চালকলগুলোর কর্তৃত্ব ও প্রভাব বেড়েছে৷ সরকার যদি নির্ধারিত মূল্যে ধান কেনার শর্তে চালকলগুলোর কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করত, তাহলে কৃষকের এ পরিণতি হতো না।

শেয়ার করুন