ফসলি জমিতে হচ্ছে ইটভাটা

0
113
Print Friendly, PDF & Email

পরিবেশ অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি ছাড়া সারা দেশে যত্রতত্র গড়ে উঠছে ইটভাটা। বিশেষ করে রাজধানীর আশপাশের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির পাশে ইটভাটা তৈরি হচ্ছে বেশি। সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা ভেবে অনেক দিন ধরে নতুন অনুমোদন না দিলেও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় অনেক ব্যবসায়ী ইটভাটা তৈরি করে যাচ্ছেন। পরিবেশ সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইটভাটাই দেশে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। আর এ কারণে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমির উর্বরতা। ইটভাটার দূষণের জন্য নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, হৃৎ, চর্মসহ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে অন্যান্য রোগে। তবে আশার কথা, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় চলতি মাসেই দেশের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোতে পরিবেশ দূষণকারী, অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ এবং অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে নিবন্ধিত ইটভাটার সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি। এ ছাড়া অবৈধভাবে দুই হাজারের বেশি ইটাভাটা রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সারা দেশে ইটভাটার সংখ্যা ২০ হাজারের মতো। আইনে জনবসতির ৩ কি.মি. এলাকার মধ্যে কোনো ইটভাটা তৈরি করা যাবে না এমন নির্দেশনা থাকলেও শুধু ঢাকা ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ইটভাটা। আর এসব ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের কয়লা, টায়ার, ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও রাবারের টুকরা। পরিবেশ সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যে, শুধু সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় প্রতিনিয়ত মারাত্দকভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ঢাকার কাছেই রায়েরবাজার বধ্যভূমি এলাকার অদূরে ওয়াসপুরে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলো ফসলি জমি ও মানুষের বাড়ির পাশে গড়ে তোলা হয়েছে। সে এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইটভাটার কারণে সেখানকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এর কারণে উৎপাদিত শাকসবজি নষ্ট হয়ে পড়ছে। গাছপালাসহ অন্যান্য উদ্ভিদের পাতা হলুদ হয়ে পড়ছে। অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। জানতে চাইলে এখানকার এক বাসিন্দা বলেন, ইটভাটাগুলোতে গাছ ও টায়ার পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হয়। এর ফলে সৃষ্ট কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এলাকার শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। একই দৃশ্য দেখা গেছে মিরপুর বেড়িবাঁধ হয়ে আশুলিয়া যাওয়ার পথে। এ এলাকায় তুরাগ নদ দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটভাটা। এতে বায়ুদূষণের সঙ্গে তুরাগ নদীও দূষণের কবলে পড়েছে। এ ছাড়া গাইবান্ধার মাঠের হাট, ঢোলভাঙা এলাকায় নিয়ম ভেঙেই ফসলি জমির পাশে ইটভাটা তৈরি করতে দেখা গিয়েছে। জেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ইটভাটার মালিকরা বেশি দামে আবাদি জমি থেকে দোঅাঁশ ও এঁটেল মাটি ক্রয় করে ইট তৈরি করছেন। এতে মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং জমি নিচু হওয়ার কারণে আবাদ নষ্ট হচ্ছে। জেলা প্রতিনিধিরা জানান, ইটভাটার আশপাশে সাধারণত ভালো ফসল হচ্ছে না। অন্যদিকে লাভজনক ও ইটের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণত নদীর তীর, নিচু জলাশয়, পরিত্যক্ত জমি ও কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাধারণত ইটভাটা গড়ে তোলার নিয়ম আছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আইন ভেঙে ফসলি জমি ও বসতিপূর্ণ এলাকার পাশেই গড়ে তুলছেন ইটভাটা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর পাশে গাবতলী, আমিনবাজার, ওয়াসপুর সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জসহ অন্য এলাকায় গড়ে উঠেছে হাজারের বেশি ইটভাটা। পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া তথ্যে, ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ঢাকার বাতাসে ভাসমান বস্তুকণা (এসপিএম)-এর পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। পরিবেশের জন্য সহনীয় পার্টিকুলেট ম্যাটার ১০-এর মাত্রা প্রতি ঘন মিটারে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম হলেও ঢাকার বাতাসে তা ২০০ থেকে ২৫০। এ ছাড়া ইটভাটার জন্য নির্ধারিত ১২০ ফুট চিমনিও অনেকে ব্যবহার করছেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে জানা যায়, দেশের বায়ুদূষণের শতকরা ৩০ ভাগ ইটভাটার জন্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আধুনিক পদ্ধতিতে মেশিন দিয়ে ইট তৈরি না করা, ইট পোড়ানোর কাঁচামাল হিসেবে গাছের কাঠ ও টায়ারের ব্যবহারের ফলে পরিবেশ মারাত্দক দূষিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসেছে। এ জন্য ১ জুলাই থেকে পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, দেশের সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ইটভাটা ৩০ জুনের মধ্যে বন্ধ বা অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। এবার সময়সীমা কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না। ইটভাটার দূষণ কমাতে উন্নত ও জিগজাগ পদ্ধতির পরিবেশবান্ধব ইটভাটা প্রস্তুতের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি জানান, উন্নত প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন ও রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানের জন্য তহবিল গঠন করেছে। সেখান থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব ইটভাটা তৈরি করতে পারবেন। ইটভাটায় কাজ করেন এমন শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ইটভাটাগুলোয় প্রতি মৌসুমে গড়ে ৪০০ থেকে ১২০০ মেট্রিক টন কয়লা এবং ২০০ থেকে চার হাজার মণ কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অন্যদিকে আগুনের অাঁচ বাড়াতে ও দীর্ঘক্ষণ আগুন জ্বালাতে ভাটাগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ টায়ার, প্লাস্টিক ও রাবারের টুকরো। এগুলো পোড়ানোর কারণে বাতাসে তীব্র ঝাঁজ ও দুর্গন্ধ তৈরি হয়। ফলে শ্রমিক ও আশপাশের বাসিন্দারা পড়েন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। আইনে ইটভাটায় কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু এক হিসাবে দেখা যায়, শতকরা ৩৩ ভাগ ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। অবৈধ ইটভাটাতে তো হচ্ছেই, বৈধ ভাটাগুলোও মানছে না এ নিয়ম। সাধারণত বছরের অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল এ কয় মাস ইটভাটাগুলোতে ইট পোড়ানো হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন, সালফার, নাইট্রোজেনসহ অন্য রাসায়নিক উপাদান মানবদেহের জন্য মারাত্দক ক্ষতিকর। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার বয়োবৃদ্ধরা জানান, ইটভাটার কারণে এর আশপাশ এলাকায় বৃষ্টিপাতের হারও কমে গিয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহাসচিব ড. মো. আবদুল মতিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের ইটভাটাগুলোতে ভারতের আমদানিকৃত নিম্নমানের কয়লা পোড়ানো হয়, যাতে সালফারের পরিমাণ ৭-১০ শতাংশ। অথচ সালফারের পরিবেশসম্মত সর্বোচ্চ সীমা ১ শতাংশ। তিনি পরিবেশদূষণ রোধে পুরনো ভাটা বন্ধ করে জিগজাগ ভাটা চালু এবং নিম্নমানের কয়লা আমদানি বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন।

শেয়ার করুন